গাজীপুরে একটি ব্যতিক্রমধর্মী মানবিক উদ্যোগ সমাজজুড়ে প্রশংসার ঝড় তুলেছে। হরিজন (সুইপার) সম্প্রদায়ের এক মা-হারা কন্যার বিয়েতে উপস্থিত হয়ে গাজীপুরের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া প্রমাণ করলেন-পদমর্যাদা নয়, মানবিকতাই মানুষের আসল পরিচয়।
জানা যায়, মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) সন্ধ্যায় গাজীপুর মহানগরীর ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম বিলাশপুর এলাকার পরিচ্ছন্নতাকর্মী রতন বাসফোরের কন্যা প্রীতি রানী বাসফোরের বিয়েতে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে যোগ দেন জেলা প্রশাসক। প্রীতি রানী একজন কলেজ শিক্ষার্থী এবং ছোটবেলাতেই মাতৃহারা হন। তার মা সীমা রানি বাসফোরও জীবদ্দশায় পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
সাধারণত সমাজের প্রান্তিক ও অবহেলিত হিসেবে পরিচিত হরিজন সম্প্রদায়ের কোনো পারিবারিক অনুষ্ঠানে উচ্চপর্যায়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তার উপস্থিতি বিরল। সে জায়গায় জেলা প্রশাসকের এই অংশগ্রহণ এলাকাবাসীর কাছে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসকের পাশাপাশি অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সোহেল রানা, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) শাহরিয়ার নজির এবং সহকারী কমিশনার মো. মাশরাফিকুর রহমান আবরারও উপস্থিত ছিলেন। তাদের উপস্থিতিতে পুরো এলাকায় উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয় এবং হরিজন সম্প্রদায়ের মানুষের মাঝে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়।
এলাকাবাসী জানান, এমন মানবিক উদ্যোগ সমাজে বিদ্যমান শ্রেণিভেদ ও পেশাভিত্তিক বৈষম্য দূর করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। অনেকেই এটিকে সামাজিক সম্প্রীতি ও অন্তর্ভুক্তিমূলক মানসিকতার এক উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মো. নূরুল করিম ভূঁইয়া বলেন, বাংলাদেশে ধর্ম, বর্ণ, গোষ্ঠী বা পেশাভেদে সবাই সমান মর্যাদার অধিকারী। কোনো পেশাই ছোট নয়। আমরা চাই সব শ্রেণির মানুষকে সঙ্গে নিয়ে একটি সমতা ও ঐক্যের সমাজ গড়ে তুলতে।
গাজীপুর অঞ্চলে প্রায় ৩০০-এর বেশি হরিজন পরিবার বসবাস করে, যাদের অধিকাংশই পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করেন। দীর্ঘদিন ধরে তারা সামাজিকভাবে নানা বৈষম্যের শিকার হলেও এমন উদ্যোগ তাদের আত্মমর্যাদা ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে সহায়ক হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায়ের কোনো কর্মকর্তা যখন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়ান, তখন তা কেবল একটি ব্যক্তিগত অংশগ্রহণ নয়—বরং একটি শক্তিশালী সামাজিক বার্তা। গাজীপুরের এই ঘটনা তাই কেবল একটি বিয়ের আয়োজন নয়, বরং সমতা, মানবিকতা ও সামাজিক অন্তর্ভুক্তির এক বাস্তব উদাহরণ হয়ে থাকল।
আজকালের খবর/ এমকে