বাংলাদেশে ঋণ খেলাপি শব্দটির মতো সামাজিকভাবে কলঙ্কজনক অভিধা খুব কমই আছে। সংবাদমাধ্যম, গণ আলোচনা ও রাজনৈতিক বিতর্কে এটি এত বেশি ব্যবহৃত হয় যে অনেকেই এখন এটিকে চূড়ান্ত নৈতিক বিচার হিসেবে ধরে নেয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো প্রতিটি শ্রেণিভুক্ত ঋণগ্রহীতা কি সত্যিই মূল ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ? নাকি অনেক ক্ষেত্রে বিষয়টি মূলত জমে থাকা সুদ, নীতিগত বিলম্ব, কাঠামোগত দুর্বলতা এবং দীর্ঘমেয়াদি শিল্পায়ন সহায়ক নয় এমন একটি ব্যাংকিং ব্যবস্থার ফল?
এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বাংলাদেশের বেসরকারি শিল্পখাত জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। কারখানা, মিল, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান, টেক্সটাইল ইউনিট, স্টিল প্ল্যান্ট, প্লাস্টিক শিল্প, লজিস্টিকস প্রতিষ্ঠান এবং হাজার হাজার এসএমই কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে, রপ্তানি বাড়িয়েছে, পরিবারগুলোকে সহায়তা করেছে এবং অর্থনীতিকে প্রসারিত করেছে। তবুও, অনেক সময় শিল্পখাতের সংকটকে একটি মাত্র স্লোগানে সীমাবদ্ধ করা হয়।
মূলধন ও সুদের পার্থক্য:
প্রতিটি ঋণের দুটি প্রধান অংশ থাকে: ১. মূলধন, ঋণ নেওয়া আসল টাকা ২. সুদ ও অন্যান্য চার্জ, ঋণের খরচ, জরিমানা, বকেয়া সুদ, চক্রবৃদ্ধি সুদ, আইনি খরচ, পুনঃতফসিল ফি ইত্যাদি। অনেক সংকটাপন্ন শিল্পঋণের ক্ষেত্রে ঋণগ্রহীতাদের দাবি, তারা ইতোমধ্যে মূলধনের বড় অংশ, কখনো কখনো মূল ঋণের চেয়েও বেশি অর্থ পরিশোধ করেছেন। তবুও জমে থাকা সুদ ও জরিমানার কারণে তারা আইনি দৃষ্টিতে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত থাকেন। ফলে জনগণ জানেন ঋণ খেলাপি, আর ঋণগ্রহীতার বক্তব্য হয়- তারা ঋণের বেশিরভাগই পরিশোধ করেছেন। তারা কেবল সুদের ফাঁদে আটকে আছে। এই পার্থক্যটি সততার সাথে জাতীয়ভাবে আলোচনার দাবি রাখে।
অনেক শিল্পঋণ কেন সংকটে পড়ে:
সব খেলাপি নির্দোষ নয়। প্রতারণা, অর্থ আত্মসাৎ, সম্পদ গোপন বা ইচ্ছাকৃত ঋণ না দেওয়ার ঘটনা অবশ্যই কঠোরভাবে আইনের আওতায় আনতে হবে। তবে অনেক শিল্পঋণ শুধুমাত্র অনিচ্ছার কারণে নয়, বরং অন্যান্য কারণে সংকটে পড়ে। যেমন-
প্রকল্প প্রস্তুতিতে বিলম্বঃ অনেক সময় ঋণ দেওয়া হয়, কিন্তু প্রয়োজনীয় সহায়ক অবকাঠামো তখনো প্রস্তুত থাকে না। এর মধ্যে জমি ক্লিয়ারেন্স, পরিবেশগত অনুমোদন, গ্যাস সংযোগ, বিদ্যুৎ সংযোগ, বন্ড লাইসেন্স, আমদানি অনুমতি, বন্দর সহায়তা ইত্যাদি। উৎপাদন শুরু হওয়ার আগেই যদি ঋণ পরিশোধ শুরু করতে হয়, তাহলে প্রকল্প শুরু থেকেই দুর্বল হয়ে পড়ে।
সময়মতো কার্যকরী মূলধনের অভাব: অনেক উদ্যোক্তা কারখানা গড়ে তুললেও পরে কার্যকরী মূলধনের ঘাটতিতে পড়েন। যন্ত্রপাতি বসানো, শ্রমিক নিয়োগ ও ক্রেতা প্রস্তুত থাকলেও সময়মতো এলসি, আমদানি অর্থায়ন বা বেতন প্রদানের অর্থ না থাকলে উৎপাদন ব্যাহত হয়।
উচ্চ সুদের হার ও চক্রবৃদ্ধিঃ বাংলাদেশে শিল্পঋণের সুদের হার তুলনামূলকভাবে বেশি। এর সাথে বকেয়া সুদ, জরিমানা ও চক্রবৃদ্ধি যুক্ত হলে অনেক ঋণ গাণিতিকভাবে পরিশোধযোগ্য থাকে না।
বাহ্যিক ধাক্কাঃ
শিল্পখাত বারবার বৈশ্বিক ধাক্কার সম্মুখীন হয়েছে: এর মধ্যে কোভিড-১৯, বৈশ্বিক পরিবহন খরচ বৃদ্ধি, অর্থের বিনিময় হার চাপ, জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি, যুদ্ধজনিত সরবরাহ সংকট, অভ্যন্তরীণ অনিশ্চয়তা, মূল্যস্ফীতি ও মজুরি চাপ উল্লেখযোগ্য।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সমস্যাঃ
কারখানার জন্য নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অপরিহার্য। সরবরাহে বিঘ্ন উৎপাদন কমিয়ে দেয় এবং ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা দ্রুত হ্রাস পায়।
শিল্প মানে শুধু ব্যক্তিগত সম্পদ নয়ঃ একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান সংকটে পড়লে বিষয়টি শুধু মালিক বা ব্যাংকের নয়। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে অনেক ইস্যু। এরমধ্যে কিছু বিষয় হলো- হাজারো শ্রমিকের কর্মসংস্থান, সরবরাহকারী ও পরিবহন খাত, রপ্তানি আয়, কর রাজস্ব, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, আঞ্চলিক উন্নয়ন। তবে মনে রাখতে হবে অপ্রয়োজনীয়ভাবে শিল্প ধ্বংস হলে জাতীয় সম্পদ নষ্ট হয়।
বাণিজ্যিক ব্যাংক বনাম শিল্প ব্যাংকঃ
বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং শিল্প অর্থায়ন প্রতিষ্ঠানগুলো ভিন্ন ভিন্ন উদ্দেশ্য পূরণ করে। বাণিজ্যিক ব্যাংক সাধারণত পছন্দ করে- স্বল্পমেয়াদি ঋণ, কার্যকরী মূলধন, দ্রুত ঘূর্ণনশীল ঋণ। অন্যদিকে শিল্পখাতের প্রয়োজন-দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন, গ্রেস পিরিয়ড, যন্ত্রপাতি বিনিয়োগ, অবকাঠামো নির্ভর পরিশোধ কাঠামো, পুনর্গঠন সুবিধা। একটি কারখানাকে ট্রেডিং ব্যবসার মতো অর্থায়ন করা যায় না। তাই একটি আধুনিক, দক্ষ শিল্প উন্নয়ন ব্যাংক গঠন বা শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
মুনাফাভিত্তিক বনাম প্রভাবভিত্তিক ব্যাংকিংঃ
ব্যাংকের লাভ গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু শুধুমাত্র মুনাফা দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। সাধারণত একটি সুস্থ ব্যাংকিং ব্যবস্থা বিবেচনা করে- কত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলো, কত রপ্তানি হলো, কত কারখানা পুনরুজ্জীবিত হলো, কোন খাত শক্তিশালী হলো। ব্যাংক শুধু দাতব্য প্রতিষ্ঠান নয়, এটি জনগণের আস্থার প্রতিষ্ঠান।
স্বচ্ছ শ্রেণিবিন্যাস প্রয়োজনঃ স্বচ্ছ শ্রেণিবিন্যাস করতে পারলে বাংলাদেশ উপকৃত হবে, যা নিম্নলিখিত বিষয়গুলোকে স্পষ্টভাবে আলাদা করতে হবে। যেমন- মূলধন বকেয়া, সুদ বকেয়া, জরিমানা, পুনঃতফসিল ঋণ, প্রতারণামূলক ঋণ, পুনরুজ্জীবনযোগ্য শিল্পঋণ।
স্বাধীন পর্যালোচনার প্রয়োজনঃ
সরকার গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর বিষয়ে ব্যাংক, ঋণগ্রহীতা, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, শ্রমিক এবং অর্থনীতিবিদদের মতামত গ্রহণের জন্য একটি স্বাধীন সংসদীয় বা বিশেষজ্ঞ পর্যালোচনা প্রক্রিয়া বিবেচনা করতে পারে। যেখানে দেখা হবে- কতটা প্রতারণা, কতটা বাস্তব সংকট, কতগুলো ঋণ সুদের ফাঁদে আটকে, কত শিল্প পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব, নীতিগত বিলম্বের ভূমিকা কী।
ওয়ান-স্টপ সেবা বাস্তবায়ন করতে হবেঃ আর একটি বিষয়, সেটি হলো- বিনিয়োগকারীদের জন্য একাধিক দপ্তরে ঘুরতে হয়। এ কারণে একটি কার্যকর ওয়ান-স্টপ সেবা দরকার যেখানে থাকবে, নির্দিষ্ট সময়সীমা, ডিজিটাল স্বচ্ছতা, সমন্বিত অনুমোদন।
সমস্যা উত্তরণের মাধ্যমঃ ১. প্রতারণার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা ২. সম্ভাবনাময় শিল্প পুনর্গঠন ৩. দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন ৪. স্বচ্ছতা বৃদ্ধি ৫. শিল্প উন্নয়ন ব্যাংক ৬. কার্যকর ওয়ান-স্টপ সেবা ৭. অপ্রয়োজনীয় লিকুইডেশন বন্ধ।
পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের উন্নয়ন শুধু সংখ্যার ওপর দাঁড়ায়নি, এটি দাঁড়িয়েছে শ্রমিক, উদ্যোক্তা ও উৎপাদনশীল মানুষের ওপর ভিত্তি করে। ফলে সব ঋণগ্রহীতাকে খলনায়ক ভাবলে আমরা দেশের উন্নয়নকেই বাধাগ্রস্ত করব। ফলে দেশের সকল ব্যবসায়ীকে আমাদের সম্মানের চোখে দেখা উচিৎ। জাতীয় স্বার্থে তাদেরকে ব্যবসার সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেওয়া দরকার।
আজকালের খবর/বিএস