হিমালয়ের কোলে, গ্যাঙটক শহরের নির্মল বাতাসে জন্ম নেওয়া এক ছেলের নাম ছিল ত্সেরিং ফিন্টসো ডেনজংপা। পরে আমরা যাকে চিনি এক নামে—ড্যানি ডেনজংপা। কিন্তু তাঁর গল্পের শুরুটা সিনেমার অন্ধকার ভিলেনের হাসি দিয়ে নয়; বরং শুরুটা ছিল সামরিক বুটের শব্দে।
তাঁর স্বপ্ন ছিল ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া। তিনি ছিলেন দক্ষ অশ্বারোহী, এনসিসির সজ্জিত ক্যাডেট, এমনকি আর্মড ফোর্সেস মেডিকেল কলেজেও যোগ্যতা অর্জন করেছিলেন। জীবন যেন তাঁকে ইউনিফর্ম পরানোর জন্যই প্রস্তুত হচ্ছিল। অথচ শেষ মুহূর্তে তিনি বাঁক নিলেন শিল্পের পথে—যেন নিয়তি ফিসফিস করে বলেছিল, ‘তোমার যুদ্ধটা অন্য ময়দানে।’
পথ বদলে তিনি ভর্তি হলেন পুনের ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশিন ইন্সটিটিউটে। সেখানে সহপাঠী ছিলেন জয়া বচ্চন। শেরিং ফিন্টসো ডেনজংপা নামটি অনেকের জিভে জড়তা আনত—কাস্টিং ডিরেক্টর থেকে সহপাঠী, সবার কাছেই উচ্চারণটা কঠিন। জয়া-ই মৃদু হাসিতে বলেছিলেন, ‘তোমার একটা সহজ নাম দরকার।’ সেখান থেকেই জন্ম নিল ‘ড্যানি’। নাম বদলাল, কিন্তু ভেতরের শৃঙ্খলা আর সংযম বদলাল না।
মজার ব্যাপার, বলিউডে তাঁর প্রথম প্রেম অভিনয় ছিল না—ছিল গান। প্রশিক্ষিত কণ্ঠ, গভীর সুর; নেপালি ভাষায় একাধিক জনপ্রিয় গান রেকর্ড করেছিলেন তিনি। কাজ করেছেন আশা ভোসলে ও মোহাম্মদ রাফি-এর মতো কিংবদন্তিদের সঙ্গে।
তিনি ভেবেছিলেন, অভিনয় হয়তো ব্যাকআপ—একটা বিকল্প রাস্তা। কিন্তু পর্দা তাঁকে অন্যভাবে চিনে ফেলল। তাঁর তীক্ষ্ণ মুখাবয়ব, স্থির দৃষ্টি আর নিয়ন্ত্রিত শরীরী ভাষা খুব দ্রুতই প্রমাণ করল, এই মানুষটির উপস্থিতি ক্যামেরা এড়িয়ে যেতে পারে না।
১৯৭১ সালে ‘জারুরাত’ দিয়ে অভিষেক হলেও, তাঁকে সত্যিকারের আলাদা করে চিহ্নিত করল ভিলেনের চরিত্রগুলো। তবে তিনি ছিলেন না চিৎকারে-ভরা, অতিনাটকীয় খলনায়ক। তিনি তৈরি করলেন ‘জেন্টলম্যান ভিলেন’-এর এক নতুন ছাঁচ—শান্ত, হিসেবি, পরিশীলিত অথচ শীতল। অগ্নিপথ-এ কাঞ্চা চীনার ভূমিকায় তাঁর ঠাণ্ডা দৃষ্টি আজও দর্শকের মনে কাঁপন তোলে। ধার্মাত্মা কিংবা হাম—প্রতিটি ছবিতে তিনি দেখিয়েছেন, ভয় দেখাতে গলা চড়াতে হয় না; নীরবতাও যথেষ্ট।
একটা ইতিহাসের ‘যদি’ আজও আলোচনায় আসে। শোলে’র গাব্বার সিং চরিত্রটি তাঁর হাতে যেতে পারত। কিন্তু সময়ের টানাপোড়েনে, ফিরোজ খানের ধার্মাত্মা-র শুটিং সূচির সঙ্গে দ্বন্দ্বে পড়ে সেই সুযোগ হাতছাড়া হয়। ইতিহাস অন্য পথে হাঁটে। তবু ড্যানি প্রমাণ করেন, একটি চরিত্র না করলেও কিংবদন্তি হওয়া যায়।
পর্দার বাইরের জীবনেও তিনি বেছে নিয়েছেন সংযমের পথ। ১৯৯০ সালে তিনি বিয়ে করেন সিকিমের রাজপরিবারের কন্যা গাওয়া ডেনজঙপা-কে। মুম্বাইয়ের ঝলমলে আলো থেকে খানিক দূরে, তাঁরা গড়ে তুলেছেন এক শান্ত সংসার। দুই সন্তান—রিনজিং ও পেমা—কে বড় করেছেন এমন এক ভারসাম্যে, যেখানে বলিউডের চাকচিক্য আর হিমালয়ের শিকড় পাশাপাশি থাকে।
ড্যানি ডেনজংপা আসলে এক বৈপরীত্যের নাম। সেনাবাহিনীর স্বপ্ন থেকে সিনেমার অন্ধকার জগৎ, গানের মায়া থেকে অভিনয়ের তীক্ষ্ণতা—সবকিছুকে তিনি বহন করেছেন এক ধরনের মর্যাদাপূর্ণ স্থিরতায়। তাঁর ভিলেনগিরি কখনও কদর্য হয়নি; বরং হয়ে উঠেছে বুদ্ধিদীপ্ত, রুচিশীল, নিয়ন্ত্রিত। যেন তিনি আমাদের শিখিয়েছেন—অন্ধকারও ভদ্র হতে পারে, আর ভয়ও হতে পারে নীরব।
বলিউডে যখন নায়কদের একচেটিয়া রাজত্ব, তখন নিজের তীক্ষ্ণ চাহনি, গম্ভীর কণ্ঠস্বর আর অসাধারণ অভিনয় দক্ষতা দিয়ে খলনায়ক থেকে পার্শ্বচরিত্র—সবক্ষেত্রেই নিজেকে অপরিহার্য করে তুলেছিলেন ড্যানি। ১৯৪৮ সালে সিকিমের এক নেপালিভাষী ভুটিয়া পরিবারে তাঁর জন্ম।
◾তাঁর কেরিয়ার এর কিছু বিশেষ চরিত্র
▪️কাঞ্চা চীনা (অগ্নিপথ): অমিতাভ বচ্চনের বিপরীতে তাঁর এই খলনায়ক চরিত্রটি আজও আইকনিক।
▪️বখতাবার (হাম), ▪️খুদা বখশ (খুদা গাওয়া), ▪️কাতিয়া (ঘাতক): এই ছবিগুলো তাঁকে সেরার শিরোপা এনে দেয়।
◾আন্তর্জাতিক খ্যাতি: ব্র্যাড পিটের সঙ্গে 'সেভেন ইয়ার্স ইন টিবেট' ছবিতে অভিনয় করে তিনি আন্তর্জাতিক স্তরেও ভারতের নাম উজ্জ্বল করেন।

◾বাংলা সিনেমার সাথে ড্যানির যোগ
ড্যানি কেবল হিন্দি বা নেপালি ছবিতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না, বাংলা সিনেমার সাথেও তাঁর গভীর যোগাযোগ রয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী গল্প অবলম্বনে তৈরি 'বায়োস্কোপওয়ালা' (প্রেক্ষাপট বাংলা )(২০১৮) ছবিতে রহমত খাঁ-র চরিত্রে তাঁর অভিনয় দর্শকদের চোখে জল এনে দিয়েছিল। এছাড়া তিনি বেশ কিছু বাংলা প্রজেক্টেও কাজ করেছেন, তারমধ্যে অন্যতম, প্রহরী, তিনমূর্তি, লালকুঠি, বাহাদুর বন্ধু ইত্যাদি । তাঁর অভিনয় জীবনের বহুমুখিতা প্রমাণ করে যে তিনি ভাষার সীমানা ছাড়িয়ে একজন প্রকৃত শিল্পী।
◾খুব কম মানুষই জানেন ড্যানি একজন চমৎকার গায়ক। কিশোর কুমার, লতা মঙ্গেশকর, মহম্মদ রফি এবং আশা ভোঁসলের মতো কিংবদন্তিদের সঙ্গে তিনি প্লে-ব্যাক করেছেন। 'কালা সোনা' ছবিতে আশা ভোঁসলের সঙ্গে তাঁর ডুয়েট "সুনো সুনো কসম সে" আজও জনপ্রিয়। শচীন দেব বর্মন ও রাহুল দেব বর্মনের সুরে তাঁর গাওয়া গানগুলো আজও সংগীতপ্রেমীদের সংগ্রহে আছে।
◾পরিবার: ১৯৭৩ সালে তিনি গাওয়া ডেনজংপা-কে বিয়ে করেন। তাঁদের দুই সন্তান—রিঞ্জিং এবং পেমা।
▪️পদ্মশ্রী: শিল্পকলায় তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য ২০০৩ সালে ভারত সরকার তাঁকে দেশের চতুর্থ সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান 'পদ্মশ্রী' প্রদান করে।
▪️অন্যান্য গুণ: অভিনয় ছাড়াও ঘোড়সওয়ারি, পেন্টিং, লেখালেখি এবং ভাস্কর্য তৈরিতে তাঁর বিশেষ উৎসাহ রয়েছে। তিনি একজন বেবসায়ীও।
আজকালের খবর/আতে