
সিলেট সিটি কর্পোরেশনের অনিয়ম ও দুর্নীতি এখন অনেকটাই অপেন সিক্রেট। বিগত সময়ে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের প্রভাব খাটিয়ে এখানকার কর্মকর্তা কর্মচারীরা বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন। আলাদিনের চেরাগের ছুয়ায় অনেকেই এখন বাড়ি গাড়ির মালিক। পরিচ্ছন্নকর্মী থেকে গাড়ি চালকরা পর্যন্ত গড়ে তুলেছেন সম্পদের পাহাড়। ফ্যাসিবাদের পতনের পর বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দুর্নীতির বিষয়ে জিরো ট্রলারেন্সে অবস্থান নিলেও সিসিকের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এখনো বেপরোয়া রয়েছেন।
তেমনই একজন সিসিকের পরিচ্ছন্ন শাখার কর্মচারী গোয়াইনঘাট উপজেলার আলীরগাও ইউনিয়নের রাউতগ্রামের শফিকুর রহমান পুত্র ফারুক আহমদ। ২০০৬ সালে অস্থায়ী ভিত্তিতে সিসিকের যোগদানের পর ২০১৩ সালে আদালতের একটি রায়ে সুপারভাইজার পদে তার চাকরি স্থায়ী হয় । এর পর তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। রাতারাতি ভাগ্য পরিবতর্ন হয়ে গেছে।
সিসিকের তার নিয়ন্ত্রিত সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিজের ভাই, ভাগ্নে, শ্যালক ও আত্নীয় স্বজনসহ অন্তত দেড়শতাধিক ব্যাক্তিকে চাকরি দিয়েছেন, করেছেন মোটা অংকের বাণিজ্য। নামে বেনামে গড়ে তুলেছেন কোটি কোটি টাকার সম্পদ। কোথাও নিজের নামে আবার কোথাও আত্মীয় স্বজনের নামে। আশ্চর্যের বিষয় হলো সিসিকের এই কর্মচারীর সম্পদ প্রকাশ্যে আসার ভয়ে গত বছর পর্যন্ত টিআইএন এর অন্তর্ভূক্ত হয়ননি। কারন ট্যাক্স রিটার্নে তার আয়ের সঙ্গে অর্জিত সম্পদের মিল থাকবে না। আর তখন জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ নিয়ে বিপাকে পড়তে হবে।
বর্তমানে শহরতলীর বটেশ্বর চুয়াবহর এলাকায় ৫ তলা বাড়ির কাজ চলছে দ্রুত গতিতে। এছাড়াও আলমপুর আবাসিক এলাকায় হাফিজি মাদ্রাসার পাশে ১২ ডিসিমেলের (পিচ্চি বাবুলের বাসার পাশে) প্লট ও পাসপোর্ট অফিসের বিপরীত পাশে তার ৮ ডিসিমেলের প্লট রয়েছে। গোয়াইনঘাট উপজেলার ইউনিয়ন অফিসের সাথে বাইপাস এলাকায় রয়েছে ৮ বিঘা জমি যার মূল্য প্রায় ৩ কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সিলেট সিটি করপোরেশনের বর্জ্য বিভাগ একটি অলৌকিক কর্মস্থল। এখানে যারাই কর্ম করেন তারা বেশিরভাগই মহা ভাগ্যবান। তাদের জীবনে কোনো অসুস্থতা নেই। বছরের ৩৬৫ দিনই সুস্থ থাকেন তারা। হাজিরার বহি অনুযায়ী খাতা কলমে উঠে এসেছে ওইসব তথ্য। ওই অলৌকিক ঘটনার মূল কারিগর বর্জ বিভাগের কর্মচারী ফারুক আহমদ। ফারুকের এই সিন্ডিকেটে রয়েছেন ড্রাইভার পিচ্চি বাবুল ও সাদিক, ইকবাল, মামুন, শাহ আলম, নাঈমরা। সিলেট সিটি কর্পোরেশনের ৪২টি ওয়ার্ডে পরিচ্ছন্নকর্মী আছেন চার শতাধিক। অস্থায়ী বা দিনমজুর হিসেবে এসব কর্মী দুই শিফটে নগরীর পরিচ্ছন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করেন। বর্জ্য অপসারণের জন্যে প্রতিটি ট্রাকে পরিচ্ছন্ন কর্মী থাকেন ৪ জন করে। যাদের সবাই অস্থায়ী কর্মী।
সূত্র জানায়, ওইসব কর্মীর হাজিরা খাতায় কোনো অনুপস্থিত নেই। মাসের ত্রিশ দিনই তারা হাজিরা দিয়ে থাকেন। পরিচ্ছন্ন কর্মীরা মাস শেষে ত্রিশ দিনের হাজিরা পেয়ে থাকেন এমন তথ্য রয়েছে কাগজে কলমে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। বিশাল একটি অংশ চলে যায় দায়িত্বশীলদের পকেটে।
সূত্র জানায়, প্রকৃতপক্ষে পরিচ্ছন্ন কর্মীরা যে কয়দিন হাজির থাকেন সেই কয়দিনের মজুরি পেয়ে থাকেন। আর বাকি টাকা ভাগবাটোয়ারা হয়ে যায়। আর বাস্তবতা হচ্ছে, প্রত্যেক কর্মীই মাসে কমপক্ষে ৪ দিন অনুপস্থিত থাকেন। কিন্তু হাজিরা খাতায় দেখানো হয় ৩০ দিনের হাজিরা। অনেক কর্মী আবার মাসে ৮-১০ দিনও অনুপস্থিত থাকেন। তাদেরকেও ৩০ দিন উপস্থিত দেখানো হয়। হাজিরা খাতার ওই উপস্থিত কারসাজির মাধ্যমে প্রতি মাসে কমপক্ষে ৫ লাখ টাকা অনৈতিকভাবে হাতিয়ে নেয় ফারুক সিন্ডিকেট।
এই ফারুক নিজের আত্মীয়স্বজন নিয়ে শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। তার সিন্ডিকেটের অন্যান্য সক্রিয় সদস্যরা হলেন- ড্রাইভার সাদিক, মামুন, মাসুক, শাহ আলম, নাইম ও ফেরদৌস। এরা ফারুক সিন্ডিকেটের সদস্য হওয়ার কারনে সিসিকের বর্জ্য শাখার ভালো মানের গাড়িগুলি তাদেরকে দেয়া হয়, আর অন্যদেরকে দেয়া হয় তুলনামূলক নিম্নমানের গাড়ি। এই চক্রটি সিসিকের গাড়ি দিয়ে তার বিভিন্ন এলাকা মাটি বিক্রির ব্যবসাও সক্রিয় রয়েছে। এছাড়াও এই চক্রটি প্রতিদিন গাড়ির তেল চুরি করে বাহিরে বিক্রি করে। এরা সবাই এক সময় হেল্পার ছিল, কিন্তু ফারুকের আলাদিনের প্রদীপের ছুয়ায় তারা হেলপার থেকে ড্রাইভার বনে যায়। হেলপার থেকে ড্রাইভার হওয়ার ফলশ্রুতিতে এই চক্রের সদস্যরা নিয়মিতই ছোটখাটো দুর্ঘটনা ঘটনায়। তবে ফারুকের আশীর্বাদে কখনোই শাস্তির মুখোমুখি হয়ে হয়নি তাদের।
এই চক্রের মধ্যে সব চেয়ে বেপরোয়া ফারুকের শ্যালক সাদিক। পরিচ্ছন্ন শাখা কর্মচারী হলেও হাকিয়ে বেড়ান আরওয়ান-৫ মোটরবাইক। প্রায় নিয়মিতই ঘুরতে যান বিদেশে। অভিযোগ রয়েছে সিসিক থেকে ফারুকের অবৈধভাবে উপার্জিত এই অর্থ ইউরোপে পাচার করতেই শ্যালক সাদিককে নিয়মিত বিদেশ ট্যুর করে পাসপোর্ট ভারি করাচ্ছেন। খুব সহসাই সাদিকে ইউরোপে স্যাটেল্ড করে সেখানে অর্থপাচারের পায়তারা শুরু করেছেন ফারুক।
ফারুকের এসব অপকর্ম এখন নগর ভবনের প্রত্যেক মুখে মুখে। তবে তার চক্রের ভয়ে কেউ মুখ খুলতে রাজি হচ্ছেন না। ফারুককে টাকা দিয়ে চাকরি নেয়া একাধিক ব্যক্তি জানান, স্থায়ী চাকরির সুযোগ দেয়ার নাম করে আমাদের কাছে থেকে টাকা নেয়া হয়েছিল। কিন্ত আজ এতো বছরেও আমরা স্থায়ী হতে পারিনি। এসব বিষয় নিয়ে ফারুকের সাথে কথা বললে তিনি আমাদেরকে হুমকি ধমকি দেন। ২০২৪ সালে চাকরি স্থায়ী করার দাবি নিয়ে আমরা তার সাথে একাধিকবার বসে কথা বলার চেষ্টা করেছি। কিন্তু তিনি তৎক্ষালীন মেয়র (বর্তমানে পলাতক) আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরীর কথা বলে ভয় দেখাতেন। আর গণঅভ্যুত্থানে আনোয়ার পালিয়ে যাওয়ার পর এখন তিনি নিজেকে জামায়াত ও বিএনপির ঘনিষ্ঠজন বলে পরিচয় দেয়া শুরু করেছেন। সব মিলিয়ে আমরা এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, সিসিকে চাকরির বদৌলতে সম্পদের পাহাড় গড়লেও ধরা পড়ার ভয়ে এখন পর্যন্ত সরকারকে কোন আয়কর দেননি তিনি, দেননি ট্যাক্সের রিটার্নও। তাই তিনি চলতি অর্থবছরে আয়কর ও রিটার্ন জমা দিয়ে নিজের জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সকল সম্পদকে বৈধ করার চেষ্টা করছেন। এছাড়াও তার অধিকাংশ স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি শ্বশুড়বাড়ির দিকে আত্মীয়স্বজনের নামে করেছেন বলে শোনা যাচ্ছে।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে সিসিকের পরিচ্ছন্ন শাখার কর্মচারী ফারুক আহমদ বলেন, আমার আলমপুরের বাসা কতদিন আগে বিক্রি করে দিয়েছি। আর আমার এতো সম্পদ নেই, এটি মিথ্যা। আমি চাকুরি করি, কিছু টাকা আয় করে পরিবার নিয়ে আছি।
গাড়ি থেকে তেলে চুরি করে বিক্রয়ের বিষয়য়ে তিনি বলেন, অফিস থেকে যেভাবে আমাকে নির্দেশ দেয়া হয় আমি এইভাবেই কাজ করি, এখান থেকে চুরির কিছুই নাই। এটি এক ধরণের মিথ্যা অভিযোগ।
উৎকোচ নিয়ে চাকরি দেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, চাকরি আমি কিভাবে দিব। আমি নিজেই চাকরি করে চলি। আমার বিষয়ে অনেকে এ ধরনের নিয়মিত অভিযোগ করে আসছে আসলে আমি নিজেই বুঝে পাচ্ছি না।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে সিসিকের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তার মোহাম্মদ একলিম আবদীন বলেন, আগে কি করেছে সেটি আমার জানা নেই, বিগত ২ বছরে সে কোন দুর্নীতি করেছে বলে আমার জানা নেই।
সিসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রেজাই রাফিন সরকার বলেন, আপনি অফিসে আসেন, আমি বিষয়টি ভালোভাবে যেনে বলবো।
আজকালের খবর/