
কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) নিখোঁজ হওয়া দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের শিক্ষার্থী ওয়ালিউল্লাহ এবং আল ফিকহ অ্যান্ড ল’ বিভাগের শিক্ষার্থী আল মুকাদ্দাসের সন্ধানের দাবিতে মানববন্ধন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ইসলামি ছাত্রশিবির। এসময় বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষের নিকট গুম হওয়া কারণ উদ্ঘাটনে তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি জানিয়েছে তারা।
শনিবার (৩০ আগস্ট) দুপুর দেড়টায় ‘আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস’ উপলক্ষে ঘুম হওয়া শিক্ষার্থীদের ফিরে পেতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ভবনের সামনে মানববন্ধন করেন তারা। যথাযথ পদক্ষেপ না নিলে পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয় অচল করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
এসময় শিক্ষার্থীদের ‘ওলালিউল্লাহ ভাইয়ের খোঁজ নাই, প্রশাসনের লজ্জা নাই; প্রশাসনের নিরবতা মানি না মানবো না; আমার ভাই আয়না ঘরে প্রশাসন কী করে; ওলি মুকাদ্দাস ভাইকে ফেরত চাই দিতে হবে দিতেই হবে; আওয়ামী লীগের ঠিকানা এই ক্যাম্পাসে হবে না’ ইত্যাদি স্লোগান দিতে দেখা যায়।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, আওয়ামী শাসনামলে ঢাকা থেকে ক্যাম্পাসে ফেরার পথে ওয়ালিউল্লাহ এবং আল মুকাদ্দাসকে গুম করা হয়। দীর্ঘ ১৩ বছর বিগত সরকার তাদেরকে ফিরিয়ে দেয়নি। সরকার পতনের পর গুম হওয়া অনেকে ফিরে এলেও ইবির এই দুই শিক্ষার্থীর সন্ধান মেলেনি। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ১ বছর হয়ে গেছে তাও সুরাহা নাই।
তারা আরও বলেন, আমাদের দুই ভাই কী কারণে এবং কোথায় গুম করা হয়েছে সব কিছু উদ্ঘাটন করতে বর্তমান সরকারের প্রতি জোর দাবি জানাচ্ছি। পাশাপাশি বিগত ১৫ বছরের ফ্যাসিস্ট সরকারের অধীনে যারা গুম হয়েছে তাদের ব্যাপারে বর্তমান সরকার যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে আহ্বান জানাই। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কর্তৃক তদন্ত করে যারা এর সঙ্গে জড়িত তাদের শাস্তির দাবি জানাই।
এসময় মানববন্ধনে অংশগ্রহণ করেন নিখোঁজ হওয়া শিক্ষার্থী ওয়ালীউল্লাহ'র বড় ভাই খালিদ সাইফুল্লাহ। আবেগ জড়িত কণ্ঠে তিনি জানান, ওয়ালীউল্লাহ ও মুকাদ্দাসের স্মৃতিবিজড়িত এই ক্যাম্পাসে যখন আসি তখন আমার পা চলে না।আমার পা কাঁপে, আমি অস্থির হয়ে উঠি। আমি যার সাথেই কথা বলি আমার কণ্ঠ কেঁপে উঠে। আমার হৃদয় কেঁপে উঠে। ক্যাম্পাসে আসার সময় আমি আমার মা-বাবার সাথে দেখা করে আসতে পারি না। কারণ তাদের চোখের দিকে তাকিয়ে কখনো এ কথা বলতে পারি না, যে আমি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচ্ছি।
তিনি জানান, কোনো শত্রুরও এরকম অবস্থা হোক এটা কামনা করা উচিত নয়। কেউ যদি কোন অপরাধের সাথে জড়িতও থেকে থাকে তাকে আইনি প্রক্রিয়া বিচার হওয়া উচিত। কিন্তু এ ধরনের গুম হত্যা একটি জাতিকে ডুবিয়ে দেয়। একটি জাতির ঐতিহ্য ও সমৃদ্ধকে বাধাগ্রস্ত করে। সুতরাং যখন যারা দেশ পরিচালনা করুক তারা যেন মনে না করে, এই ঘটনা তাদের সাথে ঘটবে না।
তিনি দাবি জানান, আমার বাবা বার বার বলেন— ‘তারা বেঁচে আছেন না মারা গেছেন’। যদি তারা মারা যায় তাহলে আমাদেরকে তাদের কবর দেখিয়ে দিক যাতে আমরা দোয়া করতে পারি। তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় ও স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতা ছাড়া এমন ঘটনা ঘটতে পারে না। বর্তমান প্রশাসনের কাছে আবেদন আপনারা এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেন।
এসময় ইবি শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি মুহা. মাহমুদুল হাসান বলেন, আমার ভাইদের খুঁজে পাওয়ার জন্য আমরা সকল চেষ্টা করেছি, কিন্তু আপনাদের জায়গা থেকে কতটুকু চেষ্টা করা হয়েছে আমার মনে হয় সেটা শিক্ষার্থীদের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ। আপনারা এখনো যথোপযুক্ত পদক্ষেপ নিতে পারেনি। শুধুমাত্র গুম কমিশন গঠন করেছেন। যেটা এখন পর্যন্ত কোনো প্রতিবেদন দিতে পারেনি। কেন পারেনি এটা খতিয়ে দেখা দরকার। এই সরকার ফ্যাসিবাদকে প্রশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে। গতকাল নূরের ওপর হামলার ঘটনায় এটা প্রতিয়মান হয়েছে। ফ্যাসিবাদকে প্রতিষ্ঠিত করতে তারা নূরের ওপর হামলা করেছে। আপনারা ক্ষমতা ছাড়লে আপনাদের উপরও এরকম আক্রমণ হবে।
তিনি আরও বলেন, তাদের সন্ধ্যান না দিতে পারার দায় আপনাদের। দ্রুত গুম কমিশনের রিপোর্ট জাতির সামনে প্রকাশ করুন। তাদের পরিবারের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করুন। তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, উপ উপাচার্য, প্রক্টর, হল প্রভোস্ট ইত্যাদি দায়িত্বে যারা ছিল তাদের ধরুন। তৎকালীন সময়ে ছাত্রলীগের সভাপতি, সেক্রেটারিকে ধরুন। নিঃসন্দেহে ভাইদের সন্ধ্যান পাওয়া যাবে। আপনারা কেন তাদের ধরেছেন না। আপনারা তাদের সাথে জড়িত কি না আমার প্রশ্ন তৈরি হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে ইঙ্গিত করে বলেন, আমাদের সুশীল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন মফিজ লেক উদ্বোধন করতে যায়, পুকুরে মাছ ছাড়তে যায়, গাছ লাগাতে যায়, পানির ট্যাংক উদ্বোধন করতে যায়, পান থেকে চুন খসলেই তারা যায় অথচ জুলাই বিপ্লবের এক বছর পার হয়ে গেলেও বিপ্লবের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে তারা ওয়ালীউল্লাহ, আল মুকাদ্দাস ভাইয়ের সন্ধান দিতে পারে নাই। আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে এখনো এবিষয়ে কোনো জড়ালো পদক্ষেপ নিতে দেখি নাই। প্রশাসন এর দায় এড়াতে পারে না।
তিনি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ওয়ালীউল্লাহ ও আল মুকাদ্দাসের ব্যাপারে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিন। নয়তো বিশ্ববিদ্যালয়কে অচল করে দেওয়া হবে। আপনারা শিক্ষার্থীদের রক্তের ওপর দিয়ে দায়িত্বে এসেছেন, শিক্ষার্থীদের জন্য কথা বলতে লজ্জা কিসের? আপনারা যদি ভাইদের সন্ধান দিতে না পারেন তাহলে আমরা বোল্ড স্টেপ নিবো। তখন আপনারা এখান থেকে পালাতে বাধ্য হবেন।
ক্যাম্পাস সূত্রে জানা যায়, তারা একসাথে ২০১২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি রাতে ঢাকা থেকে কুষ্টিয়াগামী (হানিফ এন্টারপ্রাইজের ৩৭৫০ নম্বর) বাসে যাওয়ার পথে নিখোঁজ হয়েছিলেন। সূত্র মতে বাসটি সাভারের নবীনগর এলাকায় পৌঁছালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে ৮ থেকে ১০ জন আল মুকাদ্দাস ও ওয়ালিউল্লাহকে নামিয়ে নিয়ে যান। মুকাদ্দাস ও ওয়ালিউল্লাহ ক্যাম্পাসে না ফেরায় তাঁদের বন্ধুরা পরিবারকে জানান। এরপর অনেক খোঁজাখুঁজির করেও তাঁদের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। তারা ক্যাম্পাসে ছাত্রশিবিরের সঙ্গে জড়িত ছিল বলে জানা গেছে।
আজকালের খবর/ওআর