‘যে পিতা সন্তানের লাশ শনাক্ত করতে ভয় পায়/আমি তাকে ঘৃণা করি/যে ভাই এখনো নির্লজ্জ স্বাভাবিক হয়ে আছে/আমি তাকে ঘৃণা করি/যে শিক্ষক বুদ্ধিজীবী কবি ও কেরানি/প্রকাশ্য পথে এই হত্যার প্রতিশোধ চায় না/আমি তাকে ঘৃণা করি... কবিতার এই লাইন কয়েকটি বিদ্রোহী চেতনা ধারণকারী একথা স্বীকার করে নিতে দ্বিধা নেই এবং এই স্পষ্ট উচ্চারণ সাহিত্যে খুব বেশি আসে না। যাই হোক এই দৃঢ় চেতনার লাইলগুলো কবি নবারুণ ভট্রাচার্যের ‘এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না’ কবিতার। বিশাল আকারের এই কবিতার প্রতিটি লাইনেই এক একটি বারুদ। এ রকম বারুদ তার লেখনীতে আরো আছে। কিন্তু এই একটি কবিতায় তাকে অনেক বেশি চেনা যায়, জানা যায়। একজন কবিকে চিনতে বা কবির কবিত্বকে জানতে পাঠকের খুব বেশি কবিতার প্রয়োজন হয় না। হৃদয় ছোঁয়া একটি, দুটি অথবা কয়েকটি কবিতাই যথেষ্ট। পাঠক যুগ যুগ ধরে সেই কবিতা পাঠ করে এবং তার বিশ্লেষণ হয়। ক্ষেত্রবিশেষে কোনো একটি বিশেষ কবিতাই হয়ে ওঠে কবির পরিচয়। এ রকম ঘটনা সাহিত্য জগতে বহু ঘটেছে। তবে সেটি কোন কবিতা তা নির্ণয়ের দায়িত্ব পাঠকের হাতে থাকে। সময়ের স্রোত ভেদ করে তা হয়ে ওঠে কালজয়ী। নরারুণ ভট্টাচার্য একজন কবি হিসেবে পরিচিত হলেও তিনি একজন কথাসাহিত্যিকও। তিনি ১৯৪৮ সালের ২৩ জুন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বহরমপুর জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বিখ্যাত নাট্যকার বিজন ভট্টাচার্য এবং হাজার চুরাশি’র মা খ্যাত প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক মহাশ্বেতা দেবীর একমাত্র পুত্র। তিনি বালিগঞ্জ উচ্চবিদ্যালয় থেকে স্কুল জীবন সমাপ্ত করেন এবং পরবর্তীতে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথমে ভূতত্ত্ব ও পরবর্তীতে ইংরেজি বিষয়ে পড়ালেখা করেন। পুরোপুরিভাবে লেখালেখিতে আসার আগে তিনি প্রথমে একটি বিদেশি সংস্থায় যোগ দেন। তিনি প্রথমে সাহিত্যপত্র নামে একটি পত্রিকার সম্পাদনা করেন। ১৯৭২ সালে তার প্রথম কবিতার বই ‘এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না’ প্রকাশিত হয় এবং এর পরেই তার কবিতার খ্যাতি ছড়িয়ে পরে। ‘এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না’ এই একটি কবিতা ছাড়া অন্য কয়েকটি কবিতা বিশ্লেষণ করলেও কবিতার ভাব ও শব্দ চয়ন দক্ষতার গভীরতার পরিচয় মেলে। কবির ‘আমাকে দেখা যাক বা না যাক’ কবিতায় লিখেছেন- কে আমার হৃপিন্ডের ওপরে মাথা রেখে ঘুমোয়/কে আমাকে দুধ ও ভাতের গন্ধ দিয়ে আড়াল করে/কে আমার মাটি যেখানে আমি বৃষ্টির মতো শুষে যাই/আমি যখন দূষিত আকাশে হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে উড়ি/পালকে ছাই জমে জমে ধূসর হয়ে ওঠে কে/কে আমাকে চোখের পাতা বন্ধ করে আড়াল করে/কে আমাকে আগুন দিয়ে মশালের মতো জ্বালায়/কে আমার পৃথিবী যার ভেতরে আমি লাভার মতো ফুটতে থাকি।
এই যে কবি বারবার প্রশ্ন করে একজন ‘কে’ আনছেন সেখানে এই ‘কে’ এর পরিচয় কী? কবির ভেতরের কেউ একজন এই ‘কে’, কবির অস্তিত্ত্ব, কবির বিবেক, কবির কবিত্ব অথবা মনুষ্যত্ব। এই ‘কে’ কবিকে বিপদে আশ্রয় দেয়, প্রশ্রয় দেয় এবং সাহস যোগায়। সেকারণেই কবি লিখেছেন, ‘আমি যখন পথ থেকে গলিতে তাড়া খেতে খেতে দৌড়াই/আমার পায়ের তলায় হাইওয়ে, আলপথ সব ফুরিয়ে যায়/তখন আমার সামনে আশ্রয় হয়ে ওঠে কে/এইসব প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে/আমার ওপরে অনেক অত্যাচার করতে হবে/এত অত্যাচার করার ক্ষমতা, দুর্ভাগ্যবশত/কোনো শোষক, নিপীড়ক বা রাষ্ট্রমেশিন এখনও জানে না।
কবিতার প্রথম অংশে যখন কবি একটি প্রশ্নের অর্থাৎ তার ভেতরের একজনকে খুঁজতে ব্যস্ত ছিলেন, তাকে তিনি আবিষ্কার করেন, তার মতো করে কিন্তু বাইরের কেউ সহজে তা খুঁজে পেতে পারে না। সেই কবি অথবা কবির সত্ত্বা। এখানে কবি আবার বিদ্রোহী হয়ে ওঠেন, তার চেতনাবোধের মশাল জাগ্রত হয়ে ওঠে, তিনি নিজেকে ভিন্নরূপে আবিষ্কার করেন। তিনিই হয়তো সেই কবি যার কাঁধের উপর সূর্য ডুবে যাওয়ার সাহস রাখে। কবি তার ‘আমার খবর’ কবিতায় লিখেছেন, ‘আমি সেই মানুষ/যার কাঁধের ওপর সূর্য ডুবে যাবে/বুকের বোতামগুলো নেই বহুরাত/কলারটা তোলা ধুলো ফ্যা ফ্যা আস্তিন/হাওয়াতে চুল উড়িয়ে/পকেট থেকে আধখানা সিগারেট/বার করে বলব/দাদা একটু ম্যাচিসটা দেবেন?
এখানে কবিকে একটু বাউল মনে হয়। একটু যেন ভুলোমনা, উদাস ধরনের। কবিরা তো সেটি হবেনই। গতানুগতির জীবনে কবির যেন কোথাও ক্ষোভ ছিল, উত্তাপ ছিল বা অভিমান ছিল। কোথাও কি কবি চেয়েছিলেন একটু পরিবর্তন হোক? হয়তো তাই। চেয়েছিলেন বলেই ‘একটা ফুলকির জন্যে’ কবিতায় লিখেছিলেন- ‘একটা কথায় ফুলকি উড়ে শুকনো ঘাসে পড়বে কবে/সারা শহর উথাল, পাথাল, ভীষণ রাগে যুদ্ধ হবে...একটা কুঁড়ি বারুদগন্ধে মাতাল করে ফুটবে কবে/সারা শহর উথাল পাথাল ভীষণ রাগে যুদ্ধ হবে। এই কবিতার পুরো অংশে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে আছে। সেটি হলো পরিবর্তন। প্রতিবাদ উপজীব্য করে যখন কবিতার প্রকাশ ঘটে তখন শান্ত নদীও হয়ে ওঠে ক্ষ্যাপা। কোথাও পাড় ভাঙে তো কোথাও ভাসিয়ে নেয়। কবির মনও তো এক নদী। কবিরও ঔদ্ধত্য কখনো কখনো সীমা ছাড়ায়। তখনই তিনি লিখেন, গাঢ় আঁধার দুমড়ে ভেঙে কোথায় চলেছিস/আগুন খেতে যাচ্ছি আমি, তোদের বাবার কী/এই দেশেতে কবির জন্ম দগ্ধ অভিশাপ/মাকড়কূলে সিংহ হেন, ভস্মে ঢালায় ঘি/যাবজ্জীবন হেলায় থাকি, প্রসাদ করে তুচ্ছ/জিভের ওপর গনগনে আঁচ কয়লা রেখে দি/মূষিক কবি, শৃগাল কবি ওড়ায় ন্যাড়া পুচ্ছ/আগুন ক্ষেতের শস্য দেহ ভস্মে সপে দি।
কবি নবারুণ ভট্টাচার্য কোথাও না কোথাও অন্য সমসাময়িক কবিদের থেকে আলাদা ছিলেন। কোথায় যেন তিনি তার কলমে আগুনের দীক্ষা নিয়েছিলেন। তার কলমে যেন অগ্নি ঝরে। পুড়ে যায় যত অন্যায়, অবিচার। তিনি পুড়তে দেখেন সবকিছু। যা আমরা দেখি না আবার দেখলেও জল ঢেলে ঠাণ্ডা হওয়া দেখি। কবির ‘কিছু একটা পুড়ছে’ কবিতায় দেখি, ‘কিছু একটা পুড়ছে/আড়ালে, বেরেতে, তোশকের তলায়, শ্মশানে/কিছু একটা পুড়েছেই/আমি ধোঁয়ার গন্ধ পাচ্ছি/বিড়ি ধরিয়েছে কেউ/কেউ উবু হয়ে ফুঁ দিচ্ছে উনুনে/কেউ চিতায় তুলে দিয়েছে/আন্ত্রিক রোগে মৃত শীর্ণতম শিশু/ওলট পালট খাচ্ছে জ্বলন্ত পাখি...।
কবি নরারুণ ভট্টাচার্যের দৃষ্টিভঙ্গি যেন একটু আলাদাই ছিল। অন্তত কাব্যের স্বাচ্ছন্দ্য গতিময়তায় অনায়াসে বিদ্রোহের চেতনাগুলো ঢুকিয়ে দিতে সিদ্ধহস্ত। আমরা অনেক বিপ্লবী ধাঁচের কবিকে চিনি এবং জানি। কিন্তু যখন দেখি একজন কবি লিখছেন- ‘বাতাসে টাকা উড়ছে/তুমি ভাবলে প্রজাপতি/এবং লিখে ফেললে/একটি হালকা রঙিন কবিতা/আকাশে উড়ছে যুদ্ধবিমান/তুমি ভাবলে পাখির ঝাঁক/এবং সেই লিখে ফেললে/একাধিক ডানাওলা কবিতা/এইভাবেই/তুমি বুলেটকে ভেবেছ লিপস্টিক/বোমার ধোঁয়াতে ভেবেছ মেঘ...। এটিই কবি নবারুণ ভট্টাচার্য। তার এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না, পুলিশ করে মানুষ শিকার, রাতের সার্কাস ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ রয়েছে। তার ছোট গল্পের মধ্যে রয়েছে হালাল ঝাণ্ডা, নবারুন ভট্টাচার্যের ছোটগল্প, নবারুন ভট্টাচার্যের শ্রেষ্ঠ গল্প, ফ্যাতাড়ুও কুম্ভীপাক, ফ্যাতাড়ুর বোম্বাচাক, হারবার্ট, যুদ্ধ পরিস্থিতি, অটো ও ভোগী, কাঙাল মালসাট ইত্যাদি। এ কথা স্বীকার্য যে তার কবিতার শব্দ ছিল বলিষ্ঠ ও প্রতিবাদী। ২০১৪ সালের ৩১ জুলাই অগ্নাশ্যয়ের ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান।
আজকালের খবর/আরইউ