বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের সহযোগী ও সহকারী অধ্যাপক পদে শিগগিরই বড় ধরনের পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) পদোন্নতিযোগ্য কর্মকর্তাদের তালিকা প্রস্তুত করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে। তালিকা অনুযায়ী সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দিতে আগামীকাল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিবের সভাপতিত্বে ‘বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটি’র (ডিপিসি) সভা অনুষ্ঠিত হবে। ঈদের আগেই তাদের পদোন্নতির ঘোষণা দেওয়া হতে পারে। আর ঈদের পর সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দিতে ডিপিসি সভা বসবে। ২২ থেকে ২৬তম ব্যাচের তিন হাজার ২৫৪ জনকে সহযোগী অধ্যাপক আর ২৭ থেকে ৩৩তম ব্যাচের দুই হাজার ৫২৮ জন সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
জানতে চাইলে মাউশির মহাপরিচালক প্রফেসর ড. সৈয়দ গোলাম ফারুক আজকালের খবরকে বলেন, রবিবার ডিপিসি সভা হবে। কতজনকে পদোন্নতি দেওয়া হবে সভার আগে বলা যাচ্ছে না। আর্থিক সংশ্লেষ না থাকায় আমরা ২৬ ব্যাচ পর্যন্ত সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির প্রস্তাব করেছি। ঈদের আগেই এ পদোন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন।
পদোন্নতির সকল শর্ত পূরণ করেও বছরের পর বছর পদোন্নতি বঞ্চিত শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারা। এর মধ্যে কোনো কোনো ব্যাচের কর্মকর্তারা দেড় যুগ ধরে একই পদে কর্মরত আছেন। দীর্ঘদিন একই পদে কর্মরত থাকায় শিক্ষা ক্যাডারের মূল পদ সরকারি কলেজের শিক্ষকরা হতাশ হয়ে পড়েছেন। সামাজিকভাবেও বিব্রত হচ্ছেন। শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বৈশ্বিক মহামারি করোনার মধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ সহকারী অধ্যপকদের পদোন্নতির উদ্যোগ নিয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে আগামীকাল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে বেলা ১১টায় ডিপিসি সভা অনুষ্ঠিত হবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মাউশির কর্মকর্তারা বলছেন, অন্য ক্যাডারে ব্যাচভিত্তিক পদোন্নতি দেওয়া হলেও শিক্ষা ক্যাডারে বিষয়ভিত্তিক পদোন্নতি দেওয়া হয়। বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস জ্যেষ্ঠতা বিধিমালা ১৯৮৩ অনুসারে সহকারী অধ্যাপক থেকে সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতিযোগ্য সহযোগী অধ্যাপকদের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। সহযোগী অধ্যাপকদের বিষয়ভিত্তিক শূন্য পদের বিপরীতে পদোন্নতির জন্য সরকারি কলেজ ও সরকারি শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজের সহকারী অধ্যাপকের তিন হাজার ৩০৩ জন কর্মকর্তার তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। এরমধ্যে তিন হাজার ২৫৪ জন পদোন্নতিযোগ্য। পদোন্নতি দিতে আদালতের কোনো বিধি-নিষেধ নেই। সহকারী অধ্যাপক থেকে সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতিযোগ্য শিক্ষকের মধ্যে ৯৫ জন বেসরকারি থেকে আত্তীকৃত। আর বাকিরা সরাসরি বিসিএসের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত।
সূত্র জানায়, ২২ থেকে ২৬তম বিসিএস পর্যন্ত শিক্ষা ক্যাডারের সহকারী অধ্যাপক সবাইকে পদোন্নতির প্রস্তাব করেছে মাউশি। ২৬তম ব্যাচ পর্যন্ত সবাইকে পদোন্নতি দিতে সরকারকে অতিরিক্ত অর্থ গুনতে হবে না। জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ অনুযায়ী প্রতি বছর পাঁচ শতাংশ ইনক্রিমেন্ট পেয়ে বর্তমানে পঞ্চম গ্রেডে বেতন পাচ্ছেন তারা। এই সংখ্যা প্রায় আড়াই হাজারের মতো। সর্বশেষ ২০১৮ সালে সহকারী অধ্যাপক থেকে সহযোগী অধ্যাপক পদে ৬৩৪ জনকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছিল। এরপর এ পদে আর কোনো পদোন্নতি দেওয়া হয়নি। তবে গত বছরের ৩০ জুলাই ৬০৯ জনকে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছিল।
বিসিএস সাধারণ শিক্ষা সমিতির সাবেক সদস্য সচিব ও মাউশির পরিচালক (কলেজ ও প্রশাসন) শাহেদুল খবির বলেন, মানসস্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হলে শিক্ষকদের দাবিগুলো সময়মতো পূরণ করতে হবে। শিক্ষা ক্যাডার শিক্ষকদের বিষয়ভিত্তিক নয়, ব্যাচভিত্তিক পদোন্নতির ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি তাদের বেতন স্কেল আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছাতে হবে। অন্যথায় মানসম্মত শিক্ষাদান সম্ভব নয়।
জানা গেছে, ২২তম ব্যাচের শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারা ১৭ বছর, ২৩ থেকে ২৬তম ব্যাচের কর্মকর্তারা দীর্ঘ ১৫ বছর চাকরি করে মাত্র একবার পদোন্নতি পেয়েছেন। অথচ ২২ থেকে ২৬তম ব্যাচেরর কর্মকর্তাদের ফিডার পূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও তারা পদোন্নতি পাচ্ছেন না। এরই মধ্যে ২৬ ব্যাচের কর্মকর্তারা পঞ্চম গ্রেডের সমান স্কেলে বেতন ভাতা পাচ্ছেন। যে কারণে তাদের পদোন্নতি দিলেও সরকারকে অতিরিক্ত অর্থ ব্যায় করতে হবে না। শুধু শিক্ষকদের পদমর্যাদা বাড়বে।
২০০৮ সালে ২৭তম বিসিএসের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা উপসচিব (পঞ্চম গ্রেড) পদে পদোন্নতি পেয়েছেন। অন্য ক্যাডারের কর্মকর্তারাও নিয়মিত পদোন্নতি পেয়েছেন। অথচ একই ব্যাচের শিক্ষা ক্যাডারে নিয়োগপ্রাপ্তরা এখনো প্রভাষক। তারা ১৩ বছর ধরে একই পদে কর্মরত আছেন। অন্য ক্যাডারে ব্যাচভিত্তিক পদোন্নতি দেওয়া হলেও শিক্ষা ক্যাডারে বিষয়ভিত্তিক পদোন্নতি দেওয়া হয়। এ ছাড়া নিয়মিত পদোন্নতি দেওয়া হয় না। যে কারণে তারা বঞ্চিত হয়েছেন। নিয়মিত পদোন্নতি না হওয়ার কারণে পদোন্নতির জট সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষকদের মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে। সরকারি কলেজের শিক্ষকদের দাবি ব্যাচভিত্তিক ও নিয়মতি পদোন্নতির।
মাউশি সূত্র জানিয়েছে, প্রভাষকদের পদোন্নতির তালিকা করে মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে। ২৭ থেকে ৩৩তম ব্যাচ পর্যন্ত দুই হাজার ৫২৮ জন প্রভাষককে পদোন্নতি দিতে মাউশি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছে। এর মধ্যে সরাসরি ক্যাডার সার্ভিসে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক হলেন দুই হাজার ৪৩৭ আর আত্তীকৃত ৯১ জন।
পদোন্নতির বিষয়ে জানতে চাইলে ২৪তম বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের সভাপতি ও এনসিটিবির উপসচিব (কমন) সৈয়দ মোস্তাফিজুর রহমান লিখন আজকালের খবরকে বলেন, ২০১২ সালে সহকারী অধ্যাপক হয়েছি। চাকরি বিধি অনুযায়ী তিন বছর ফিডার সার্ভিস পূরণ করে ১৫ সালে সহযোগী অধ্যাপক হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করলেও পদোন্নতি হয়নি। ২৪তম বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে আমরা ২২শ জন নিয়োগ পেয়েছি। তাদের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে বিষয়ভিত্তিক ১৫০ জনের পদোন্নতি হয়েছে। ছয় বছর আগে পদোন্নতির যোগ্য হলেও বাকি ১৯৫০ জনের পদোন্নতি হয়নি। বিগত দিনে বিভিন্ন কারণে আমাদের পদোন্নতি হয়নি। বর্তমান সরকার এসে আমাদের পদোন্নতি দেওয়ার চেষ্টা করেছে। করোনার কারণে সকল কার্যক্রম স্থবির। তার মধ্যে পদোন্নতির উদ্যোগ নেওয়ায় সরকারকে অভিনন্দন জানাই। তিনি আরো বলেন, বর্তমানে আমরা পঞ্চম গ্রেডে বেতন পাই। আমাদের পদোন্নতি দিলে সরকারকে এক টাকাও বেতন বাড়াতে হবে না। মুজিববর্ষ উপলক্ষে পুরো ব্যাচের পদোন্নতি দাবি করেন তিনি।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও মাউশি সূত্রে জানা গেছে, বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের সহযোগী অধ্যাপক ও সমমানের পদে (জাতীয় বেতন স্কেল, ২০১৫ অনুযায়ী ৪৩,০০০/--৬৯,৮৫০/) যথাক্রমে মাউশি অধিদপ্তরে নয়টি, বিষয়ভিত্তিক দুই হাজার ২৬০টি, অধ্যক্ষ/উপাধ্যক্ষ ৭১টিসহ মোট দুই হাজার ৩৪০টি পদ রয়েছে। বর্তমানে উল্লেখিত পদসমূহের মধ্যে প্রশাসনিক, অধ্যক্ষ/উপাধ্যক্ষ ও বিষয়ভিত্তিক পদসহ মোট দুই হাজার ৩৪০টি পদ পূরণকৃত। বাকি ৩৬৪টি শূন্যপদ রয়েছে। এছাড়া আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত আরো ২০ জন পিআরএলে যাবেন। এসব পদ শুন্য ধরে ও অধ্যাপক পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত ৬০৯টি পদ শূন্যসহ মোট ৯৯৩টি পদ শূন্য রয়েছে। সহযোগী অধ্যাপক/সমমানের উক্ত ২২৬০টি পদের ১০ শতাংশ হিসেবে ২২৬টি রিজার্ভ পদের মধ্যে ১২৮টি শূন্য রিজার্ভ পদের বিপরীতেও পদোন্নতি প্রদানের সুযোগ রয়েছে। বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের প্রস্তাবিত সমন্বিত পদ সৃজনের ১২ হাজার ৪৭৯টি পদের মধ্যে সহযোগী অধ্যাপক পদ রয়েছে তিন হাজার ৩০৮টি। সব মিলিয়ে মাউশির প্রস্তাব অনুযায়ী সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দিতে কোনো সমস্যা নেই।
সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির যোগ্যতা: চারভাবে শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারা নিয়োগ পান। সরাসরি বিসিএস পরীক্ষার মাধ্যমে, বেসরকারি কলেজ থেকে আত্তীকরণ, প্রদর্শক থেকে পদোন্নতি পেয়ে এবং রাষ্ট্রপতির ১০ শতাংশ কোটায়। এই ক্যাডারের কর্মকর্তারা সরকারি কলেজে সরাসরি শিক্ষকতার সঙ্গে জড়িত। বাংলাদেশ সার্ভিস রুল ১৯৮১-এর ৫, ৬ ও ৭ বিধি অনুযায়ী, শিক্ষা ক্যাডারের প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক পদোন্নতির জন্য পাঁচ বছর, সহযোগী অধ্যাপকের জন্য তিন বছর এবং অধ্যাপক পদের জন্য দুই বছর অর্থাৎ ফিডার পদে ১০ বছর থাকতে হবে। ফিডার সার্ভিস বলতে শিক্ষা ক্যাডারের মূল পদ সরকারি কলেজে কর্মরত থাকতে হবে। এর বাইরে এসিআর প্রতিবেদনে প্রমিতমানে উত্তীর্ণ এবং বিরূপ মন্তব্য না থাকা। এ ছাড়াও সব ক্যাডার পদে নিয়োগপ্রাপ্তদের শুরুতে বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ, বিভাগীয় পরীক্ষায় পাস ও শিক্ষানবিশকাল শেষ করে চাকরি স্থায়ীকরণ বাধ্যতামূলক। পদোন্নতির জন্য বিভাগীয় পরীক্ষায় পাসও বাধ্যতামূলক।
যারা এসব যোগ্যতা অর্জনে ব্যর্থ হবেন, বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (পদোন্নতি পরীক্ষা) বিধিমালা-২০১৭ অনুযায়ী তাদের চাকরির মেয়াদ ১৫ বছর পূর্ণ হলে পরীক্ষা প্রমার্জন সাপেক্ষে সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত হবেন। সহকারী অধ্যাপক হিসেবে পাঁচ বছর ফিডার পদ পূর্ণ হলে সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতির যোগ্য হবেন। তবে এরপর তিনি আর কোনো পদোন্নতি পাবেন না। কিন্তু এসব আইন ভঙ্গ করে ২০০৬ সাল থেকে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে। এতে শিক্ষা ক্যাডারে চরম অসন্তোষ ও বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে। আদালতে মামলা পর্যন্ত হয়েছে।
বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস জ্যেষ্ঠতা বিধিমালা ১৯৮৩ অনুযায়ী সহকারী অধ্যাপক থেকে সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতিযোগ্য সহযোগী অধ্যাপকগণের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে বলে মাউশির কর্মকর্তারা দাবি করেছেন। সহযোগী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি প্রদানের লক্ষ্যে গত বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি জ্যেষ্ঠতার খসড়া তালিকা মাউশির ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়। প্রাপ্ত তালিকায় আপত্তিগুলো বিবেচনায় নিয়ে তথ্য সংশোধন করে গত বছরের ১৪ অক্টোবর দ্বিতীয় তালিকা প্রকাশ করা হয়। পরবর্তী সময়ে প্রাপ্ত আপত্তিগুলো সংশোধন করে জ্যেষ্ঠতা তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে।