গাজীপুর সিটি করপোরেশনের এক কর্মকর্তার অফিসকক্ষে এক ব্যক্তির কাছ থেকে টাকা গ্রহণের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর ‘ঘুষ লেনদেনের’ অভিযোগে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।
তবে ভিডিওতে টাকা গ্রহণকারী কর্মকর্তা আশরাফুল আলম দাবি করেছেন, তিনি কোনো ঘুষ নেননি। ঠিকাদারি লাইসেন্স নবায়ন ফি, ফরমের মূল্য ও পূর্বের বকেয়া বাবদ ওই টাকা গ্রহণ করা হয়েছে। নিজের দাবির সমর্থনে তিনি টাকা গ্রহণের রসিদও দেখিয়েছেন। টাকা প্রদানকারী ঠিকাদারও একই বক্তব্য দিয়েছেন।
ভাইরাল ভিডিওতে টাকা গ্রহণের দৃশ্য দেখা গেলেও ওই অর্থ ঘুষ নাকি বৈধ সরকারি ফি-ভিডিওটি এককভাবে তার প্রমাণ দেয় না। ফলে ঘটনার প্রকৃত সত্য জানতে এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে টাকা গ্রহণের রসিদ, সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নবায়নের নথি, বকেয়া ফি এবং সিটি করপোরেশনের হিসাবের রেকর্ড।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, সিটি করপোরেশনের একটি অফিসকক্ষে কর্মকর্তা আশরাফুল আলমের সামনে এক ব্যক্তি টাকা দিচ্ছেন। পরে ভিডিওটি ‘ঘুষ লেনদেনের’ দৃশ্য হিসেবে প্রচার হলে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।
অভিযোগের বিষয়ে কর্মকর্তা আশরাফুল আলম বলেন, বর্তমানে সিটি করপোরেশনের ঠিকাদারি লাইসেন্স নবায়নের কার্যক্রম চলছে। বিভিন্ন ঠিকাদার লাইসেন্স নবায়ন ফি ও বকেয়া পরিশোধ করছেন। ভিডিওতে যে টাকা গ্রহণ করতে দেখা যাচ্ছে, সেটিও ওই প্রক্রিয়ার অংশ।
তিনি বলেন, আমি কোনো ঘুষ নিইনি। নিয়ম অনুযায়ী রসিদের মাধ্যমে টাকা গ্রহণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার ছয়টি ফরম নিয়েছেন, প্রতিটি ফরমের মূল্য এক হাজার টাকা। এর সঙ্গে বকেয়া টাকাও পরিশোধ করেছেন। ১৮ হাজার ৪০০ টাকা নেওয়া হয়েছে।
কর্মকর্তা আশরাফুল আলম এ লেনদেনের বিপরীতে রসিদ দেখিয়ে দাবি করেন, টাকা গ্রহণটি ঠিকাদারি লাইসেন্স নবায়ন ও বকেয়া ফি বাবদ হয়েছে। তার ভাষ্য, বিষয়টি না বুঝে কেউ ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে তাকে অপপ্রচারের শিকার করেছেন।
তিনি আরও জানান, ঘটনাটি নিয়ে সৃষ্ট বিভ্রান্তির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার আগামীকাল সংবাদ সম্মেলন করে বিস্তারিত বক্তব্য দেবেন।
টাকা প্রদানকারী নাইম এন্টারপ্রাইজের প্রোপ্রাইটর আবু নাইম বলেন, ‘আমি ওই কর্মকর্তাকে কোনো ঘুষ দিইনি। আমার প্রতিষ্ঠানের ঠিকাদারি লাইসেন্স নবায়ন এবং বকেয়া ফি পরিশোধের জন্যই টাকা দিয়েছি।’
তিনি জানান, প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স সংক্রান্ত নিয়মিত ফি ও বকেয়া পরিশোধের অংশ হিসেবেই ওই অর্থ দেওয়া হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওটি ঘিরে যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে, সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তিনি তা পরিষ্কার করবেন।
এ বিষয়ে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত হয়েছেন। প্রাথমিকভাবে তিনি জানতে পেরেছেন, লাইসেন্স নবায়ন ও বকেয়া ফি বাবদ টাকা নেওয়ার বিষয় রয়েছে। তবে প্রকৃতপক্ষে কী হয়েছে, তা যাচাই না করে চূড়ান্ত মন্তব্য করা ঠিক হবে না।
তিনি বলেন, বিষয়টি আমি খতিয়ে দেখব। আসলেই লাইসেন্স নবায়ন ও বকেয়া ফি নেওয়া হয়েছে, নাকি অন্য কোনো বিষয় রয়েছে-তা যাচাই করে দেখা হবে।
সিটি করপোরেশনের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীও দাবি করেছেন, ভাইরাল ভিডিওতে যে অর্থ গ্রহণের দৃশ্য দেখা যাচ্ছে, তা ঠিকাদারি লাইসেন্স নবায়ন ও বকেয়া ফি পরিশোধের সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুষের অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন বলে তারাও মনে করছেন।
রসিদ ও হিসাবের নথিতেই মিলবে প্রকৃত সত্য-
ঘটনাটির প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে রসিদ ও হিসাবের নথি। কর্মকর্তা আশরাফুল আলম যে রসিদ দেখিয়েছেন, সেটির তথ্য সিটি করপোরেশনের হিসাব বিভাগের রেকর্ডের সঙ্গে মেলে কি না, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নবায়নের আবেদন ও ছয়টি ফরমের হিসাবের সঙ্গে তা সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না—এসব যাচাই করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে নির্ধারিত নবায়ন ফি, পূর্বের বকেয়া, সব মিলিয়ে মোট ২৭ হাজার টাকার হিসাব এবং ওই অর্থ সিটি করপোরেশনের সরকারি হিসাবে জমা হয়েছে কি না, তাও যাচাইয়ের বিষয়।
এ অবস্থায় ভাইরাল ভিডিও ঘিরে ওঠা ‘ঘুষ’ অভিযোগের সত্যতা নাকি নিয়মিত লাইসেন্স নবায়ন ও বকেয়া ফি-তার উত্তর মিলবে নথিপত্র, রসিদ ও হিসাব যাচাইয়ে। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের আগামীকালের সংবাদ সম্মেলন এবং সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষের যাচাই-বাছাইয়ের পর ঘটনাটির প্রকৃত চিত্র আরও পরিষ্কার হতে পারে।
আজকালের খবর/বিএস