ইউরোপের দেশ গ্রিসে প্রবাসী বাংলাদেশিদের একটি বড় অংশ কাজ করেন গার্মেন্টস খাতে। জীবিকার তাগিদে পরিবার-পরিজন ছেড়ে বছরের পর বছর কাটাচ্ছেন প্রবাস জীবন। তাদেরই একজন শহিদুল ইসলাম। পবিত্র ঈদুল আযহা চলে গেল। অথচ উৎসবের এই সময়েও মন ভালো নেই তাঁর। কাজের ফাঁকে দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি বলেন, ‘পরিবার ছাড়া এখানে কোনো কাজেই মন বসছে না। কাগজপত্রের জটিলতার কারণে দেশেও যেতে পারছি না। পরিবার যদি পাশে থাকতো, তাহলে হয়তো আনন্দে ঈদ উদযাপন করতে পারতাম।’
শুধু শহিদুল নয়, হাজরো গ্রিস প্রবাসীর মনে একই কষ্ট। বিশ্বজুড়ে বর্তমানে প্রায় দেড় কোটিরও বেশি বাংলাদেশি প্রবাসে জীবনযাপন করছেন। জীবিকার তাগিদে একটু ভালো ভবিষ্যতের আশায় তাঁরা দেশ ছেড়ে পাড়ি জমিয়েছেন বিদেশে। কিন্তু সেই স্বপ্নের আড়ালেই লুকিয়ে আছে দীর্ঘ অপেক্ষা, একাকীত্ব আর পরিবারহীন জীবনের কষ্ট।
ইউরোপের অনেক দেশে পরিবার আনার প্রক্রিয়া তুলনামূলক সহজ হলেও গ্রিসে পারিবারিক ভিসা যেন প্রবাসীদের জন্য বড় এক চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশে গ্রিসের কোনো দূতাবাস না থাকায় ভিসা সংক্রান্ত সব কাজ করতে হয় ভারতে গিয়ে। আর সেখান থেকেই শুরু হয় ভোগান্তির নতুন অধ্যায়।
গ্রিস প্রবাসী বাংলাদেশিদের অভিযোগ, ভারতের গ্রিক দূতাবাসকে ঘিরে একটি দালাল চক্র সক্রিয় রয়েছে। নির্দিষ্ট দালাল ছাড়া আবেদন এগোয় না। অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়া থেকে শুরু করে নথি সত্যায়ন - সবকিছুতেই এক অঘোষিত বাধা। ফলে অনেককেই লাখ লাখ টাকা খরচ করেও খালি হাতে ফিরতে হয়।
গ্রিসের বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে এখন পরিবার বিচ্ছেদের গল্পই বেশি শোনা যায়। কেউ কেউ ২০ থেকে ২৫ বছর ধরে গ্রিসে বৈধভাবে বসবাস করছেন। এমনকি স্থায়ী রেসিডেন্সিও পেয়েছেন। তারপরও স্ত্রী-সন্তানদের কাছে নিতে পারছেন না। গার্মেন্টস, রেস্টুরেন্ট ও কৃষি খাতে কর্মরত এসব প্রবাসীর জীবনে অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা এলেও পারিবারিক সুখ অধরাই থেকে গেছে।
গ্রিস প্রবাসী রফিকুল ইসলাম জানান, মাসে দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা আয় করলেও তাঁর জীবনে আনন্দ নেই। দীর্ঘদিন ধরে পরিবার ছাড়া কাটানো দিনগুলো তাঁকে মানসিকভাবে ভেঙে দিচ্ছে। অন্যদিকে, প্রায় দুই যুগ ধরে গ্রিসে বসবাসরত আবদুল মালেক বলেন, পরিবারের জন্য বহুবার চেষ্টা করেছেন। স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে ভারতের উদ্দেশে কাগজপত্র পাঠিয়েছেন। কিন্তু সেখানে দুই মাস অবস্থান করেও ভিসার কোনো অগ্রগতি হয়নি।
বাংলাদেশ কমিউনিটি ইন গ্রিসের সাধারণ সম্পাদক এইচ এম জাহিদ ইসলাম বলেন, ‘ঢাকায় গ্রিসের স্থায়ী দূতাবাস চালুর দাবিতে আমরা দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করছি। এ বিষয়ে গণস্বাক্ষর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি দেওয়ার প্রস্তুতিও চলছে। প্রবাসীদের দুর্ভোগ কমাতে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার জন্য আমরা সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।’
বর্তমানে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ হাজার প্রবাসী বাংলাদেশি গ্রিসে বসবাস করছেন। বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখছেন তাঁরা। গ্রিসের আইন অনুযায়ী, বৈধ অভিবাসীরা পারিবারিক পুনর্মিলন ভিসায় স্ত্রী ও সন্তানদের নেওয়ার অধিকার রাখেন। তবে বাস্তবে সেই প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল। সব শর্ত পূরণ করেও মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হচ্ছে প্রবাসীদের। অনেক প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীও এই জটিলতা কাটিয়ে উঠতে পারছেন না।
বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, প্রথমে সব নথি সত্যায়ন করে ঢাকার ভিএফএস অফিসে জমা দিতে হয়। এরপর সেই ফাইল পাঠানো হয় ভারতের নয়াদিল্লিতে অবস্থিত গ্রিক দূতাবাসে। সেখান থেকে গ্রিসের অভিবাসন মন্ত্রণালয়ের যাচাই-বাছাই শেষে সিদ্ধান্ত আসে। এই ত্রিমুখী প্রক্রিয়ায় দীর্ঘ সময় লাগায় বাড়ছে দুর্ভোগ। প্রবাসীদের দাবি, এই জটিলতার সুযোগ নিয়েই সক্রিয় রয়েছে দালাল সিন্ডিকেট।
বাংলাদেশে গ্রিসের দূতাবাস চালু করা এবং পারিবারিক ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করতে দ্রুত কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়ার পাশাপাশি প্রবাসীদের প্রতি আরও মানবিক ও আন্তরিক হওয়ার প্রত্যাশা জানিয়েছেন গ্রিস প্রবাসী বাংলাদেশিরা।
আজকালের খবর/কবির