শনিবার ১৬ মে ২০২৬
বাঁশের সাঁকোয় অনিশ্চিত যাত্রা
প্রকাশ: শনিবার, ১৬ মে, ২০২৬, ৪:৫৩ পিএম   (ভিজিট : ১)
দুপুরের তপ্ত রোদ তখনো পুরোপুরি নরম হয়নি। বইখাতা কাঁধে নিয়ে বাঁশের নড়বড়ে সাঁকোর ওপর ধীরে ধীরে পা ফেলছিল চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী রিয়াদ। এক হাতে বই, অন্য হাতে বাঁশের হাতল শক্ত করে ধরে এগিয়ে যাচ্ছে সে। নিচে বয়ে চলা বুড়াইল নদীর দিকে তাকালেই মনে জাগে ভয়। তবুও এ পথই তার প্রতিদিনের যাত্রা, স্কুলে যাওয়া আসার একমাত্র ভরসা।

স্থায়ী সেতু না থাকায় প্রতিনিয়ত ঝুঁকি নিয়ে পার হতে হয় এই নদী। সামান্য অসতর্কতাই ডেকে আনতে পারে বড় দুর্ঘটনা। তবুও বাধ্য হয়েই এই অনিশ্চিত পথ ধরে চলছে চরাঞ্চলের মানুষ।

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার তারাপুর ইউনিয়নের চর খোর্দ্দা, নিজাম খা ও লাটশালা গ্রামের মানুষের চলাচলের একমাত্র ভরসা এখনো বাঁশের তৈরি সাঁকো। বুড়াইল নদীর ওপর স্থায়ী কোনো সেতু না থাকায় এই সাতটি ঝুঁকিপূর্ণ বাঁশের সাঁকো দিয়েই প্রতিদিন পারাপার করেন কয়েক হাজার মানুষ। বছরের পর বছর ধরে একটি স্থায়ী সেতুর দাবি উঠলেও বাস্তবে মেলেনি কোনো সমাধান।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, তারাপুর ইউনিয়নের চরখোর্দ্দা গ্রামে শতাধিক পরিবারের চলাচলের একমাত্র ভরসা একটি বাঁশের সাঁকো। সেই সাঁকো বেয়ে উঠতে হচ্ছে শিশু-কিশোর, নারী-পুরুষ ও বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের। সাঁকোর অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। অনেক বাঁশ পচে গেছে, বিভিন্ন জায়গার পাটাতন উঠে গিয়ে বড় বড় ফাঁকা তৈরি হয়েছে। কোথাও কোথাও দড়ি দিয়ে বাঁশ বেঁধে কোনোভাবে টিকিয়ে রাখা হয়েছে কাঠামো। একসঙ্গে দুইজন মানুষ উঠলেই দুলতে শুরু করে পুরো সাঁকো।

শুধু চর খোর্দ্দা গ্রাম নয়, এমন জরাজীর্ণ বাঁশের সাঁকোয় ভরসা আরও দুই গ্রামের। চরখোর্দ্দা, লাটশালা ও নিজাম খা গ্রামের প্রায় ২০ হাজার মানুষের চলাচলের একমাত্র ভরসা এসব সাঁকো। তিনগ্রামে বুড়াইল নদীর উপর নির্মিত সাতটি সাঁকো দিয়ে প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে প্রায় ৫শ পরিবারের ২০ হাজার মানুষকে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রায় ৪০ বছর ধরে তারা একটি স্থায়ী সেতুর দাবি জানিয়ে আসছেন। নির্বাচন এলেই জনপ্রতিনিধিদের প্রতিশ্রুতি মিললেও পরে আর কোনো অগ্রগতি দেখা যায় না। ফলে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।

সম্প্রতি, কয়েকটি সাঁকোর অবস্থা আরও খারাপ হয়ে গেলে স্থানীয় চেয়ারম্যান উদ্যোগ নিয়ে কিছু সংস্কার কাজ করেন। নতুন বাঁশ বসিয়ে আপাতত চলাচলের উপযোগী করা হলেও সেটিকে সাময়িক সমাধান হিসেবেই দেখছেন এলাকাবাসী। তবে বর্ষা এলেই আবারও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে এই সাঁকো।

চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী রিয়াদ জানালেন, ভাঙাচোরা চরাট দিয়ে প্রতিদিন স্কুলে যেতে হচ্ছে। এক হাতে বই আরেক হাত দিয়ে চরাটের বাঁশ ধরে ধীরে ধীরে চলতে হয়। প্রতিদিন এই পথ পার হতে তার খুব ভয় লাগে, তবে বিকল্প কোনো রাস্তা না থাকায় বাধ্য হয়েই এই ঝুঁকিপূর্ণ পথ ব্যবহার করতে হয়। পাকা সেতু থাকলে তার মতো শিক্ষার্থীদের কষ্ট অনেকটাই কমে যেত বলে সে মনে করে।

স্থানীয় কৃষক আব্দুল হাকিম প্রতিদিন নদীর ওপারে জমিতে কাজ করতে যান। হাতে কৃষি সরঞ্জাম আর কাঁধে ফসলের বোঝা নিয়ে এই সাঁকো পার হতে হয় তাকে। তিনি বলেন, ভয় তো সবসময়ই লাগে। কিন্তু উপায় কী? এই সাঁকো ছাড়া অন্য রাস্তা নাই। বর্ষাকালে আরও ভয়ংকর অবস্থা হয়।

শুধু যাতায়াত নয়, যোগাযোগ ব্যবস্থার দুরবস্থা এখন প্রভাব ফেলছে সামাজিক জীবনেও। এলাকাবাসী জানান, সেতু ও পাকা সড়কের অভাবে সন্তানের বিয়েশাদি দিতেও সমস্যায় পড়তে হচ্ছে তাদের। অনেক পরিবার যোগাযোগের দুর্ভোগের কথা শুনে বিয়ের প্রস্তাব ফিরিয়ে দেয়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় ৪০ বছর ধরে তারা একটি স্থায়ী সেতুর দাবি জানিয়ে আসছেন। নির্বাচন এলেই জনপ্রতিনিধিদের প্রতিশ্রুতি মিললেও পরে আর কোনো অগ্রগতি দেখা যায় না। ফলে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।

তবে, সম্প্রতি কয়েকটি সাঁকোর অবস্থা আরও খারাপ হয়ে গেলে স্থানীয় চেয়ারম্যান উদ্যোগ নিয়ে কিছু সংস্কার কাজ করেন। নতুন বাঁশ বসিয়ে আপাতত চলাচলের উপযোগী করা হলেও সেটিকে সাময়িক সমাধান হিসেবেই দেখছেন এলাকাবাসী। কারণ বর্ষা এলেই আবারও ঝুঁকি বেড়ে যাবে।

চর খোর্দ্দা গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল জলিল বলেন, মেয়ের বিয়ের কথা বলতে গেলে প্রথমেই রাস্তার কথা জিজ্ঞেস করে। যখন শুনে বাঁশের সাঁকো পার হয়ে যেতে হয়, তখন অনেকে আর আগ্রহ দেখায় না।

নিজাম খা গ্রামের গৃহিণী রহিমা বেগম বলেন, বরযাত্রী আনা-নেওয়া নিয়েও অনেক সমস্যা হয়। বর্ষাকালে মানুষ আসতেই চায় না। যোগাযোগ ভালো না থাকায় আমাদের সামাজিকভাবেও ভোগান্তি পোহাতে হয়।


স্থানীয় ব্যবসায়ী নুর ইসলাম ভাষ্য, একটি পাকা সেতু নির্মিত হলে পুরো এলাকার জীবনযাত্রা ও অর্থনীতির চেহারা বদলে যেত। বর্তমানে যোগাযোগব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় কৃষিপণ্য পরিবহন থেকে শুরু করে দৈনন্দিন ব্যবসায়িক কার্যক্রমে তাদের নানা ধরনের সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে।

তারাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আমিনুল ইসলাম লেবু জানালেন, জরাজীর্ণ সাতটি বাঁশের সাঁকো নিজ উদ্যোগে সংস্কারের কাজ চলছে। ঝুঁকিপূর্ণ অংশগুলো নতুন বাঁশ দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে, পাশাপাশি যেসব জায়গায় পাটাতন উঠে গেছে সেগুলোও পুনরায় মেরামত করা হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, স্থানীয় মানুষের চলাচল স্বাভাবিক রাখতে আপাতত জরুরি ভিত্তিতে এই সংস্কার করা হচ্ছে। তবে বুড়াইল নদীর ওপর একটি পাকা সেতু নির্মাণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে এবং বিষয়টি বাস্তবায়নের জন্য ধারাবাহিকভাবে যোগাযোগ করা হচ্ছে।

আজকালের খবর/কাওছার আল হাবীব







আরও খবর


Advertisement
Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রাপা প্লাজা( ৭ম তলা), রোড-২৭ (পুরাতন) ১৬ (নতুন), ধানমন্ডি, ঢাকা -১২০৯।
ফোন: ৪১০২১৯১৫-৬, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor@gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor@gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft