ফরেনসিক অডিট আতঙ্কে তোলপাড় শুরু হয়েছে গাজীপুর জেলা পরিষদে। আতঙ্কে আছেন অতি সম্প্রতি বদলি করা ৯ জন কর্মকর্তা ও কর্মচারীও।
জানা গেছে , গাজীপুর জেলা পরিষদের ৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে অতি সম্প্রতি বদলি করা হয়। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ২ জনকে এবং ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার অফিস ৭ জনকে বদলি করেন। সরকারি নিয়ম ভেঙ্গে দীর্ঘ ৬ বছর থেকে ৩৪ বছর ধরে একই কর্মস্থলে চাকরি করছিলেন বদলিকৃত কর্মচারী।
প্রশাসনিক কার্যক্রমে গতিশীলতা আনা এবং দাপ্তরিক দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বদলির কথা বলা হলেও দীর্ঘদিন এক কর্মস্থলে থাকায় তারা সেখানে নিজস্ব একটি বলয় গড়ে তুলেছিলেন। অনিয়মকে নিয়মে পরিণত করে জেলা পরিষদকে দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত করেছিলেন। তাদের কথামতো কাজ না করায় পরপর এই প্রতিষ্ঠানের ৪ জন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে অপ্রীতিকর অবস্থায় বিদায় নিতে হয়েছিলো। প্রায় ৪ মাস আগে যোগদান করা প্রতিষ্ঠানের বর্তমান প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) নজরুল ইসলামকে জড়িয়ে ঢাকার একটি দৈনিকে সম্প্রতি একটি নেতিবাচক নিউজ প্রকাশের পর প্রতিষ্ঠানকে ফরেনসিক অডিট করানোর উদ্যোগ নেয়া হয়। এই ৯ কর্মকর্তা কর্মচারী বদলির আদেশ অমান্য করে গাজীপুরেই অবস্থান করছেন। তাদের এমন কর্মকাণ্ড নিয়ে নানা ডালপালা মেলেছে। অনেকেই বলছেন কি আছে গাজীপুর জেলা পরিষদে? যেকারণে বদলির আদেশকেও বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো হচ্ছে।
দীর্ঘদিনের অনিয়ম, দুর্নীতি, টেন্ডার বাণিজ্য, জমি লিজে অনিয়ম এবং প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ঘিরে প্রতিষ্ঠানটিতে ব্যাপক প্রশাসনিক কড়াকড়ি দেখা দিয়েছে। সম্ভাব্য ফরেনসিক অডিটকে কেন্দ্র করে জেলা পরিষদজুড়ে তৈরি হয়েছে উদ্বেগ, অস্থিরতা ও চাঞ্চল্য। এরই ধারাবাহিকতায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ও বিভাগীয় কমিশনারের নির্দেশে পৃথক আদেশে ৯ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বদলি করা হয়েছে। প্রশাসনিক সূত্র জানায়, দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনের সুযোগে জেলা পরিষদে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে, যারা প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, জমি লিজ বন্দোবস্ত, কমিশন বাণিজ্য এবং উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ফরেনসিক অডিটের সম্ভাব্য উদ্যোগ সামনে আসতেই সংশ্লিষ্টদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
বদলিকৃতদের মধ্যে প্রশাসনিক কর্মকর্তা আশরাফ হোসেন প্রায় ৩৪ বছর একই প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়ভাবে কাপাসিয়ায় জমি, গাজীপুরে বহুতল ভবন এবং রাজধানীর উত্তরায় ফ্ল্যাট থাকার আলোচনা দীর্ঘদিনের। বদলির আদেশের বিরুদ্ধে তিনি আদালতে রিট আবেদন করেছেন বলেও জানা গেছে।
শর্ট লিপিকার প্লাবন আলী প্রায় ১৭ বছর একই কর্মস্থলে ছিলেন, তার বিরুদ্ধেও অনিয়ম ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। সার্ভেয়ার রেজওয়ানুল হকের বিরুদ্ধে জমি লিজ বন্দোবস্তে অনিয়ম ও আর্থিক সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ উঠেছে। উপসহকারী প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম ও সহকারী প্রকৌশলী মনির হোসেনের বিরুদ্ধেও উন্নয়ন প্রকল্পে ঠিকাদারদের বিশেষ সুবিধা দিয়ে কমিশন গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া মেশিন অপারেটর খোকন মিয়া, নিম্নমান সহকারী হারুন অর রশিদ, পিয়ন সোনিয়া আক্তার এবং ড্রাইভার মাহমুদুল হাসানকেও বিভিন্ন অভিযোগে বদলি করা হয়েছে।
জেলা পরিষদের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকা কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলে একটি শক্তিশালী বলয় তৈরি করেছিলেন, যাদের অঘোষিত নিয়ন্ত্রণ ছিল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও টেন্ডার কার্যক্রমে। সাম্প্রতিক বদলি ও সম্ভাব্য ফরেনসিক অডিটের কারণে সেই বলয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। তবে অভিযুক্ত কয়েকজন কর্মচারী অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।
সূত্র আরও জানায়, বদলিকৃতদের একটি অংশ প্রশাসনিক পদক্ষেপের পর বর্তমান সিইও নজরুল ইসলামকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে অপতৎপরতায় জড়িয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। একটি জাতীয় দৈনিকের সাংবাদিককে ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর সংবাদ প্রকাশের অভিযোগও করা হয়েছে, যা নিয়ে গাজীপুরে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। সম্প্রতি কাপাসিয়ার টুঁকে এলাকায় জেলা পরিষদের ডাকবাংলো লিজ নিয়ে সিইওর বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হলেও জেলা পরিষদ সূত্র বলছে, ওই স্থাপনা দীর্ঘদিন ধরে পরিত্যক্ত এবং সেখানে কার্যকর লিজযোগ্য কোনো সম্পত্তি নেই।
এ বিষয়ে সিইও নজরুল ইসলাম বলেন, কোনো জমি লিজ দিতে হলে নির্ধারিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয় এবং তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তিনি আরও জানান, টুঁকে এলাকায় কোনো লেনদেন বা আলোচনার সঙ্গে তিনি জড়িত নন।
জেলা পরিষদের প্রশাসক চৌধুরী ইশরাক আহমেদ সিদ্দিকী জানান, দায়িত্ব নেওয়ার পর নতুন কোনো লিজ দেওয়া হয়নি এবং অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে কয়েকজনকে বদলি করা হয়েছে। প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনে তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে, যা আগামী ৩০ এপ্রিলের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেবে। তিনি আরও বলেন, জেলা পরিষদের অনেক সম্পত্তি বেদখলে রয়েছে, সেগুলো উদ্ধারে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে এবং প্রতিষ্ঠানটিকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হিসেবে গড়ে তোলাই লক্ষ্য।
অনুসন্ধানে টুকে এলাকার জমি লিজ সংক্রান্ত কোনো বিজ্ঞপ্তি বা প্রক্রিয়ার তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে কালিয়াকৈর উপজেলার টাংলাবাড়ি মৌজায় প্রায় এক কিলোমিটার রোডসাইড জমি উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে, যেখানে ৩০ থেকে ৩৫টি অবৈধ স্থাপনা ও বহুতল ভবন চিহ্নিত করে উচ্ছেদ নোটিশ দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন বেদখলে থাকা এসব সম্পত্তি উদ্ধারের উদ্যোগ স্থানীয়ভাবে প্রশংসিত হলেও, সংশ্লিষ্টদের দাবি একটি মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছে।
আজকালের খবর/ এমকে