বুধবার ২২ এপ্রিল ২০২৬
ইরান কেন বাংলাদেশের জাহাজকে হরমুজ প্রণালি পার হতে দিচ্ছে না
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল, ২০২৬, ১১:৪৬ পিএম   (ভিজিট : ১৪৯)
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধের জেরে হরমুজ প্রণালি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে ইরান। দেশটির ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড কোরের (আইআরজিসি) অনুমতি না পেয়ে জলপথটি অতিক্রম করতে পারছে না বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজ ‘বাংলার জয়যাত্রা’।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান রোববার রাতে তুরস্কে এক বৈঠকে ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাঈদ খাতিবজাদহকে জাহাজটির হরমুজ প্রণালি নিরাপদে পার হতে সহায়তার অনুরোধ করেন বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।

এদিকে ক্যামেন আইল্যান্ডের পতাকাবাহী একটি জাহাজ সৌদি আরবের জুয়াইমাহ টার্মিনাল থেকে অ্যারাবিয়ান লাইট ক্রুড ওয়েল নিয়ে চট্টগ্রামে আসার কথা থাকলেও ইরানের অনুমতি না পাওয়ায় সেটিও আসতে পারেনি বলে জানা গেছে।

যদিও গত ১ এপ্রিল ঢাকায় ইরানের রাষ্ট্রদূত হরমুজ প্রণালি পার হতে অনুমতির অপেক্ষায় থাকা বাংলাদেশি জাহাজকে সহায়তার কথা বলেছিলেন। এর আগে মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, বাংলাদেশসহ ছয়টি দেশের জাহাজ চলাচল করতে পারবে।

এরপর দুই দফায় চেষ্টা করেও হরমুজ পার হতে ইরানি নৌবাহিনী ও আইআরজিসির অনুমতি না পেয়ে ৩৭ হাজার টন সারসহ এখন সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি বন্দরের কাছে অবস্থান করছে বাংলার জয়যাত্রা।

বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন বা বিএসসির মালিকানায় থাকা এই জাহাজটি সিঙ্গাপুরভিত্তিক একটি প্রতিষ্ঠান ভাড়ায় নিয়ে পরিচালনা করছে। তবে এর নাবিকদের সবাই বাংলাদেশি। জাহাজটি হরমুজ প্রণালি পার হয়ে সার নিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউন ও ডারবানে যাওয়ার কথা ছিল।

বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক অবশ্য বিবিসি বাংলাকে বলেন, জাহাজটিকে হরমুজ পার করানোর জন্য ইরানের অনুমোদন পেতে কূটনৈতিক চ্যানেলে জোর তৎপরতা চলছে।

কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সঙ্গে ইরানের ঐতিহাসিক সহযোগিতামূলক সম্পর্ক থাকার পরেও বাংলাদেশি জাহাজকে হরমুজ পার হতে ইরান বাধা দিচ্ছে কেন।

এমন এক প্রশ্নের জবাবে সাবেক কূটনীতিক হুমায়ুন কবির বলেন, কোনো দেশে আক্রমণ বাংলাদেশ সমর্থন করে না- এই নীতিই বাংলাদেশ সবসময় অনুসরণ করে আসছিল। কিন্তু এবার সেভাবে হয়নি বলেই হয়তো বিভ্রান্তির অবকাশ তৈরি হয়েছে।
জয়যাত্রাকে বাধা দিচ্ছে কেন ইরান

ঢাকায় কূটনৈতিক সূত্রগুলোর ধারণা, ইরানে হামলার ঘটনা ও আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর বাংলাদেশ সরকারের বিবৃতি তেহরানকে ক্ষুব্ধ করেছে, যা ঢাকায় ইরানের রাষ্ট্রদূত নিজেও বলেন। মূলত এ কারণেই ইরানের নৌবাহিনী হরমুজ পার হতে বাংলাদেশি জাহাজকে অনুমতি দিচ্ছে না বলে মনে করা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে ইরানে আক্রমণ করে এবং এতে নিহত হন দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। এই হামলায় ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী, সশস্ত্র বাহিনীর প্রধানসহ উচ্চ পর্যায়ের বেশ কয়েকজন নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করে ইরান।

জবাবে পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ইরান সৌদি আরব, কাতার ও কুয়েতসহ উপসাগরীয় দেশগুলোতে ‘মার্কিন স্বার্থ’ লক্ষ্য করে হামলা চালায়।

এ অবস্থার মধ্যেই ১ মার্চ রোববার বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতি দেয়, যেখানে ইরানের পাল্টা হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের ‘কয়েকটি দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে’ দাবি করে এর নিন্দা জানায় বাংলাদেশ সরকার।

কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের ওই বিবৃতিতে কোথাও যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের নাম উল্লেখ করা হয়নি। সেই সঙ্গে ইরানে হামলার ঘটনায়ও কোনো নিন্দা জানানো হয়নি।

এ নিয়ে দেশের ভেতরে তীব্র সমালোচনা দেখা দিলে ২ মার্চ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পাঁচ লাইনের আরেকটি বিবৃতি দিয়ে আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন উল্লেখ করে ইরানের ‘ভ্রাতৃপ্রতিম’ জনগণের প্রতি শোক প্রকাশ করে।

ঢাকায় কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের খামেনির মৃত্যুর বিষয়ে যথাযথ শোক না জানানো ও দূতাবাসে শোক বইতে কোনো কর্মকর্তা গিয়ে স্বাক্ষর না করার ঘটনা ইরানিদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।

ঢাকায় ইরানের রাষ্ট্রদূত জালিল রাহিমী জাহানাবাদী বেসরকারি একটি টেলিভিশনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে নিজেই এ তথ্য জানিয়ে উষ্মা প্রকাশ করে বলেন, বাংলাদেশের বিবৃতিতে তেহরান সন্তুষ্ট নয়।

এছাড়া ১ এপ্রিল দূতাবাসে এক সংবাদ সম্মেলনে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের হামলার পর বাংলাদেশের দুই বিবৃতি নিয়ে ইরানের মনোকষ্টের বিষয়টি প্রকাশ্যেই তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ যে বিবৃতি দিয়েছে তাতে বাংলাদেশের অবস্থান স্পষ্ট করা হয়নি। এ সময় তিনি স্পেনের মতো ইউরোপীয় দেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে জনগণের যুদ্ধবিরোধী মিছিল ও সমালোচনার উদাহরণ দেন। সে আলোকে তিনি বাংলাদেশও সুস্পষ্ট অবস্থান নেবে বলে আশাপ্রকাশ করেন।

রাষ্ট্রদূত অবশ্য তখনো জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশের জ্বালানিবাহী ছয়টি জাহাজকে হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার অনুমতি দিয়েছে তেহরান।

জালিল রাহিমী জাহানাবাদী বলেন, বাংলাদেশ জাতিসংঘ ও ওআইসির সদস্যরাষ্ট্র হিসেবে ইরানে আগ্রাসী শক্তির বিরুদ্ধে নিন্দা জানাতে পারত।

এরপর পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান গত ৫ এপ্রিল ঢাকায় ইরানের রাষ্ট্রদূত জালিল রাহিমী জাহানাবাদীর সঙ্গে বৈঠক করে বাংলার জয়যাত্রাসহ আরেকটি বাংলাদেশগামী অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজের নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করতে সহায়তা চান। রাষ্ট্রদূত জানান, এ বিষয়ে যথাযথ পর্যায়ে ইরানি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে।

কিন্তু এর পরেও দুই দফায় চেষ্টা করে হরমুজ পার হতে পারেনি বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজটি। ফলে রোববার তুরস্কে ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে আবারও বিষয়টি উত্থাপন করলেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলো বলছে, মূলত যুদ্ধকেন্দ্রিক বাংলাদেশের অবস্থানটিই ইরানকে ক্ষুব্ধ করেছে, যা এখন সামাল দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে।

সাবেক কূটনীতিক হুমায়ুন কবির বলেন, পররাষ্ট্রনীতির একটা নৈতিক ভিত্তি থাকতে হয় এবং কোনো দেশ আক্রান্ত হোক বা আক্রমণের মুখে পড়লে সেটা বাংলাদেশ সমর্থন করে না।

‘বাংলাদেশের কোনো বিষয়ে অবস্থান প্রকাশের ক্ষেত্রে এ দুটো বিষয় মনে রাখা জরুরি। এর ব্যত্যয় হলেই বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠে। সব রাষ্ট্রেরই সার্বভৌমত্ব ও পারস্পারিক সম্মানকে গুরুত্ব দিতে হয়। এবার সেভাবে হয়নি বলেই হয়তো প্রশ্নটি উঠেছে,’ বলেন তিনি।

‘বাংলার জয়যাত্রা’ জাহাজটি মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় প্রবেশ করে গত ২৬ জানুয়ারি। এরপর মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন বন্দরে পণ্য নিয়ে যায় জাহাজটি। পরে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি কাতারের একটি বন্দর থেকে প্রায় ৩৯ হাজার মেট্রিক টন স্টিল কয়েল নিয়ে দুবাইয়ের জেবেল আলী বন্দরে গিয়েছিল এমভি বাংলার জয়যাত্রা।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা শুরুর পর ওই বন্দরে জাহাজটির ২০০ মিটারের মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়। এর মধ্যেও সেখানে পণ্য খালাস শেষে জাহাজটির পরবর্তী গন্তব্য ভারতের মুম্বাই বন্দর ঠিক হলেও আরব আমিরাতের কোস্ট গার্ড নিরাপত্তার কথা জানিয়ে বাধা দিলে জাহাজটি গভীর জলসীমায় অবস্থান নেয়।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধবিরতি শুরু হলে ৮ এপ্রিল হরমুজ প্রণালি পার হতে সৌদি আরবের রাস আল খাইর বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করেছিল জাহাজটি। কিন্তু ইরানি কর্তৃপক্ষের অনুমতি না পাওয়ায় তখন জাহাজটি হরমুজ প্রণালি পার হতে পারেনি।

পরে ইরান আবার হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে দেওয়ার ঘোষণা দিলে বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজটি হরমুজের দিকে রওয়ানা হয়।

কিন্তু প্রণালির ২০ নটিক্যাল মাইলের মধ্যে যাওয়ার পর ইরানের নৌবাহিনী জাহাজটির হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের আবেদন প্রত্যাখ্যান করে ফিরে যাওয়ার নির্দেশ দেয়।

এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সময় গত শুক্রবার রাত দেড়টার দিকে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম না করে জাহাজটি আবার আগের অবস্থানের দিকে ফিরে যায়।

বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক বলেন, যেভাবে সরকার কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে তাতে আমরা আশা করি দ্রুতই হরমুজ পার হতে জাহাজটি ইরানি কর্তৃপক্ষের অনুমতি পাবে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

আজকালের খবর/ এমকে









Advertisement
সর্বশেষ সংবাদ
আলোচনায় বসা ছাড়া ‘বিকল্প নেই’ ইরানের : ট্রাম্প
জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব এত কম যে খাদ্যমূল্যের ওপর পড়বে না: বাণিজ্যমন্ত্রী
ইরান কেন বাংলাদেশের জাহাজকে হরমুজ প্রণালি পার হতে দিচ্ছে না
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ক্লাস করলেন এমপি মনিরুল!
ইস্ট লন্ডনে গ্রিন পার্টির কাউন্সিলর প্রার্থী শেখ ফারুক আহমদ
সিরাজগঞ্জে হাম রুবেলা টিাকাদান কর্মসূচির উদ্বোধন করেন-স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রাপা প্লাজা( ৭ম তলা), রোড-২৭ (পুরাতন) ১৬ (নতুন), ধানমন্ডি, ঢাকা -১২০৯।
ফোন: বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor@gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor@gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft