মাদকের ভয়াবহ বিস্তারের মধ্যে কক্সবাজারে মাদকাসক্তদের সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে ‘ফিউচার লাইফ’ মাদকাসক্তি পুনর্বাসন কেন্দ্র। প্রতিষ্ঠার পর থেকে শত শত মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে চিকিৎসা ও কাউন্সেলিং সেবা দিয়ে ইতিমধ্যে সুনাম কুড়িয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
সংশ্লিষ্টরা জানান, কক্সবাজারে সামাজিক নানা প্রেক্ষাপটে তরুণদের একটি বড় অংশ মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। এ বাস্তবতায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, কাউন্সেলর ও প্রশিক্ষকদের সমন্বয়ে ‘ফিউচার লাইফ’ আসক্ত ব্যক্তিদের সুস্থ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার কাজ করছে।
প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা গেছে, এ পর্যন্ত প্রায় ৫০০ জন মাদকাসক্ত ব্যক্তি এখানে চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সেবা নিয়েছেন। তাদের মধ্যে অন্তত ৩৫০ জন সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছেন।
সরকারিভাবে কেন্দ্রটির অনুমোদিত ধারণক্ষমতা ১০ জন হলেও বর্তমানে সেখানে ২০ জন সেবাগ্রহীতা চিকিৎসাধীন রয়েছেন। আসনসংকটের কারণে অনেক আগ্রহী রোগীকে ফিরিয়েও দিতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কর্তৃপক্ষ।

কক্সবাজার পৌরসভার টেকপাড়া এলাকার বাসিন্দা মামুনুর রশীদ (৩৬) একসময় দীর্ঘ পাঁচ বছর ইয়াবা আসক্তিতে বিপর্যস্ত ছিলেন। ‘ফিউচার লাইফ’-এ চিকিৎসা নেওয়ার পর তিনি এখন স্বাভাবিক জীবনে ফিরে সফল পোল্ট্রি খামারি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
মামুনুর রশীদ বলেন, “আমি প্রায় পাঁচ বছর ইয়াবায় আসক্ত ছিলাম। ফিউচার লাইফ আমার জীবন বদলে দিয়েছে। পরিবারের অবাধ্য বখাটে থেকে আজ আমি একজন সফল ব্যবসায়ী। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে এখন সুখে সংসার করছি।”
একই অভিজ্ঞতার কথা জানান বাপ্পি নামের আরেক সাবেক সেবাগ্রহীতার মা আনোয়ারা বেগম। তিনি বলেন, “আমার ছেলে দীর্ঘদিন ইয়াবায় আসক্ত ছিল। ফিউচার লাইফে চিকিৎসা নেওয়ার তিন মাসের মধ্যে সে সুস্থ হয়ে ওঠে। এখন সে নিজে ব্যবসা করছে।”
বর্তমানে চিকিৎসাধীন কলাতলী এলাকার ফরহাদ উদ্দিন জানান, গত দুই মাস ১৩ দিন ধরে তিনি এখানে চিকিৎসা নিচ্ছেন। এখন আগের মতো নেশার তাড়না আর অনুভব করেন না।
ফরহাদ বলেন, “এখানকার সুস্থ ও সুন্দর পরিবেশ আমার জীবন বদলে দিয়েছে। এখন নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছি।”
ফিউচার লাইফ মাদকাসক্তি পুনর্বাসন কেন্দ্রের পরিচালক (প্রশাসন) জসিম উদ্দিন কাজল বলেন, “আমাদের মূল লক্ষ্য সমাজের মানুষকে মাদকের ভয়াল থাবা থেকে মুক্ত করে সুস্থ, সুন্দর জীবনে ফিরিয়ে আনা। অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের মাধ্যমে আমরা রোগীদের সেবা দিচ্ছি।”
তিনি আরও বলেন, “কক্সবাজার পর্যটন রাজধানী হলেও মাদকের আগ্রাসন এখানে উদ্বেগজনক। আমার মনে হয়, জেলায় একটি-দুটি নয়, আরও চার থেকে ছয়টি মানসম্মত পুনর্বাসন কেন্দ্র প্রয়োজন। আমাদের কাছে নিয়মিত রোগী আসছেন, কিন্তু আসনস্বল্পতার কারণে অনেককে ভর্তি নিতে পারি না।”
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর কক্সবাজার অঞ্চলের উপপরিচালক সোমেন মণ্ডল বলেন, “মাদকাসক্ত ব্যক্তির সুস্থতা ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে একটি ভালো নিরাময় কেন্দ্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সরকারের নিয়মনীতি অনুসরণ করে এ ধরনের সেবা আরও বিস্তৃত হওয়া প্রয়োজন।”
উল্লেখ্য, ‘ফিউচার লাইফ’ মাদকাসক্তি পুনর্বাসন কেন্দ্র ২০১২ সালের ১ ডিসেম্বর যাত্রা শুরু করে। পরে ২০১৬ সালের ১৮ জুলাই মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের লাইসেন্স লাভ করে। প্রতিষ্ঠান চালু হওয়ার পর সরকারের পক্ষ থেকে তিনবার অনুদান দেয়া হয়। যা রোগীদের কল্যাণে ব্যয় করা হয়েছে।
আজকালের খবর/ এমকে