মঙ্গলবার ২৬ মে ২০২৬
মুরাদনগরে কাঠ-বাঁশের সাঁকোয় ঝুঁকিতে পথ পাড়ি দিচ্ছে ছয় গ্রামের মানুষ
প্রকাশ: রোববার, ৮ মার্চ, ২০২৬, ৪:০৪ পিএম   (ভিজিট : ৬৮৯)
স্বাধীনতার অর্ধশত বছর পেরিয়ে গেলেও কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলার ১৯ নং দারোরা ইউনিয়নের কাজিয়াতল গ্রামের মানুষের কপালে জোটেনি একটি পাকা সেতু। প্রতিশ্রুতি এসেছে, অনুমোদনও মিলেছে, কিন্তু বাস্তবতা এখনো বাঁশের নড়বড়ে সাঁকো। ফলে প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ওই সাঁকো দিয়েই চলাচল করতে হচ্ছে অন্তত ছয়টি গ্রামের হাজার হাজার মানুষকে।

কাজিয়াতল গ্রামের “হরিবট গাছতলা মেলা” খালের উপর সেতু, কাজিয়াতল ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসার সামনে খালের উপর সেতু এবং কাজিয়াতল পূর্বপাড়া প্রদীপ বিশ্বাসের বাড়ির দক্ষিণ পাশের খালের উপর সেতু। এই তিনটি সেতুর দাবিতে যুগের পর যুগ ধরে অপেক্ষা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। কিন্তু অর্ধশত বছর পেরিয়ে গেলেও সেই অপেক্ষার অবসান হয়নি।

একই খালের উত্তর প্রান্তে রয়েছে কেমতলী-দারোরা এবং দক্ষিণ-পূর্ব দিকে মুহসাইর, সরমা কান্দা, শুরানন্দী ও কৃষ্ণপুর-সিদ্ধেস্বরী গ্রাম। এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষের যাতায়াতের অন্যতম ভরসা এখনো বাঁশের সাঁকো।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ২০২০ সালে প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস (পিআইও) থেকে হরিবটগাছতলা মেলা ও প্রদীপ বিশ্বাসের বাড়ির দক্ষিণ পাশের সেতুর জন্য প্রায় ৬০ লাখ টাকা করে দুটি সেতু অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তৎকালীন সংসদ সদস্যের পছন্দের ঠিকাদার কাজ না পাওয়ায় নানা জটিলতায় সেই প্রকল্পের কাজ আর শুরুই হয়নি। দীর্ঘদিন ঝুলে থাকার পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শুরু না হওয়ায় প্রকল্পগুলো স্থগিত হয়ে যায়। ফলে নতুন করে আবারও অনিশ্চয়তায় পড়ে যায় এলাকাবাসীর বহুদিনের স্বপ্ন।

কাজিয়াতল ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসার শিক্ষার্থী জায়িদা বেগম বলেন, বৃষ্টির সময় খুব ভয় লাগে। হাতে ছাতা ধরব, না বই ধরব, না কি বাঁশের সাঁকো ধরে খাল পার হব। বুঝতে পারি না। অনেক সময় পড়ে যাওয়ার ভয় থাকে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, স্বাধীনতার পর থেকেই এই তিনটি স্থানে মানুষের চলাচলের একমাত্র ভরসা ছিল বাঁশের সাঁকো ও নৌকা। বর্তমানে শুষ্ক মৌসুমে নৌকা চলাচলও সম্ভব হয় না। ফলে এলাকাবাসী নিজেরাই স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁশ ও কাঠ দিয়ে সাঁকোগুলো মেরামত করে চলাচলের ব্যবস্থা রাখেন। কিন্তু বর্ষা মৌসুমে পানি বাড়লে সাঁকোগুলো প্রায়ই তলিয়ে যায়, তখন ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়।

এ গ্রামের বাসিন্দা সিনিয়র সাংবাদিক শরিফুল আলম চৌধুরী বলেন, বছরের পর বছর ধরে আমরা বিভিন্ন সরকারি দপ্তর ও জনপ্রতিনিধিদের কাছে আবেদন করেছি। কিন্তু এখনো সেতু নির্মাণের কোনো বাস্তব উদ্যোগ দেখা যায়নি। প্রতিদিন শিক্ষার্থী, রোগী ও সাধারণ মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই সাঁকো পার হচ্ছে। অথচ দুটি সেতু অনুমোদন হওয়ার পরও রাজনৈতিক কারণে কাজ বাস্তবায়ন হয়নি। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক।

সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা গেছে, কাজিয়াতল ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসার সামনে বাঁশ ও কাঠের সাঁকোটির দৈর্ঘ্য প্রায় ২০ মিটার। নড়বড়ে এ সাঁকো পার হতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন বৃদ্ধ, নারী ও শিশুরা। একইভাবে প্রদীপ বিশ্বাসের বাড়ির কাছে “ভোরের ঘাট” নামে পরিচিত সাঁকোটির দৈর্ঘ্য প্রায় ২৫ মিটার এবং হরিবটগাছতলা মেলার সামনের সাঁকোটির দৈর্ঘ্যও প্রায় ২৫-২৬ মিটার।

এই সাঁকোগুলোর ওপর নির্ভর করেই চলাচল করছে আশপাশের বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। এর মধ্যে রয়েছে কাজিয়াতল ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসা, কাজিয়াতল রহিম রহমান মোল্লা উচ্চ বিদ্যালয়, কাজিয়াতল দক্ষিণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ফয়জুল উলুম মাদ্রাসা, রহমানিয়া এতিমখানা, মুন্সী বাড়ি হযরত আবু বক্কর মাদ্রাসা-মসজিদ কমপ্লেক্স ও বেপারী বাড়ি কারিমুল কুরআন মাদ্রাসাসহ আরও কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। প্রায়ই এখানে ছোটখাটো দুর্ঘটনা ঘটে বলে স্থানীয়রা জানান।

কাজিয়াতল গ্রামের ব্যবসায়ী ইউনুছ ভূঁইয়া, আবুল হাশেম মল্লিক, গোলাম মোস্তফা, সাবেক মহিলা মেম্বার রেহেনা বেগম ও এবাদুল্লাহ ভূঁইয়া বলেন, প্রায় দশ হাজার মানুষ নিয়মিত এই তিনটি সাঁকো ব্যবহার করেন। সাঁকোগুলো ব্যবহার না করলে উপজেলা সদরে যেতে হলে তিন থেকে চার কিলোমিটার ঘুরে যেতে হয়। সেতু নির্মাণ হলে এই দুর্ভোগের অবসান হবে এবং মানুষের যাতায়াত অনেক সহজ হবে।

স্থানীয় সমাজসেবক মো. জামাল মুন্সী ও মোস্তফা মুন্সী বলেন, “দলমত নির্বিশেষে জনস্বার্থে এই তিনটি সেতু দ্রুত নির্মাণ করা অত্যন্ত জরুরি। এতে হাজার হাজার মানুষের দীর্ঘদিনের কষ্ট লাঘব হবে।”

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের মুরাদনগর উপজেলা প্রকৌশলী কাজী ফয়সাল বারী পূর্ণ বলেন, “মুরাদনগরের যেসব স্থানে সেতু নির্মাণ গুরুত্বপূর্ণ, সেগুলোর তালিকা আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠাচ্ছি। ওই সেতুগুলোর প্রস্তাব বর্তমানে কোন অবস্থায় আছে তা খোঁজ নিয়ে দেখা হবে। দ্রুত সেতু নির্মাণের জন্য আমরা চেষ্টা করছি।”

এদিকে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও সরকারের ধর্মমন্ত্রীর ছোট ভাই, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব কেএম মুজিবুল হক বলেন, “এ সেতুগুলো দ্রুত নির্মাণের জন্য বিষয়টি লিপিবদ্ধ করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হবে। জনস্বার্থের এ ধরনের কাজ অবশ্যই সম্পন্ন করতে আমরা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেব।”

তবে এলাকাবাসীর প্রশ্ন একটাই—প্রতিশ্রুতি আর কাগজের অনুমোদন নয়, কবে বাস্তবে গড়ে উঠবে সেই তিনটি সেতু, যেগুলোর জন্য প্রজন্মের পর প্রজন্ম অপেক্ষা করছে? যতদিন সেই সেতু না হচ্ছে, ততদিন হয়তো হাজারো মানুষের পথচলা চলতেই থাকবে নড়বড়ে বাঁশের সাঁকোর ওপর দিয়ে—ভয় আর অনিশ্চয়তাকে সঙ্গী করে।

আজকালের খবর/আরএম









Advertisement
Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রাপা প্লাজা( ৭ম তলা), রোড-২৭ (পুরাতন) ১৬ (নতুন), ধানমন্ডি, ঢাকা -১২০৯।
ফোন: ৪১০২১৯১৫-৬, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor@gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor@gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft