
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একের পর এক উত্তপ্ত পরিস্থিতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং স্বাধীনতার দাবিতে জনতার প্রতিবাদ অব্যাহত থাকার মধ্যে গতকাল শুক্রবার একটি মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। গণ অধিকার পরিষদের আহ্বায়ক এবং সাবেক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিপি নুরুল হক নূরের ওপর যৌথ বাহিনীর হামলায় তিনি রক্তাক্ত হয়েছেন। এ হামলা দেশের গণতান্ত্রিক পরিবেশের প্রতি এক বিশাল আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাংলাদেশের গণতন্ত্রের কণ্ঠস্বর নুরুল হক নূর যিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সর্বোচ্চ আস্থাভাজন এক নেতা, দীর্ঘ বছর ধরে দেশের গণতন্ত্র ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম করে আসছেন। বাংলাদেশে যখন একনায়কতন্ত্র এবং স্বৈরাচারী শাসন চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তখন নুরুল হক নূর ছিলেন একমাত্র প্রতিবাদী কণ্ঠ, যিনি জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার এবং বাক স্বাধীনতার জন্য রাজপথে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। তার নেতৃত্বে বহুবার দেশের স্বৈরাচারী শাসকদের বিরুদ্ধে গণতান্ত্রিক আন্দোলন সংগঠিত হয়েছে।
তবে গতকাল নুরুল হক নূরের ওপর হামলা দেশের মানুষের জন্য এক অশুভ সংকেত। গণতন্ত্রের মূল চরিত্র-জনগণের স্বাধীনতা, বাক স্বাধীনতা এবং সভা-সমাবেশের অধিকার-এটি এ হামলায় আক্রান্ত হয়েছে। বাংলাদেশে, বিশেষত রাজনৈতিক অঙ্গনে, যখনই গণতান্ত্রিক অধিকার ও স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা হয়, তখন নুরুল হক নূরের নাম অপরিহার্যভাবে উচ্চারিত হয়। তার বিরুদ্ধে এ হামলা শুধু তারই বিরুদ্ধে নয়, বরং বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের বিরুদ্ধে একটি আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নুরুল হক নূরের ওপর হামলা এমন সময় হয়েছে, যখন দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী একাধিকবার অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের জন্য সমালোচিত হয়েছে। চলতি বছরের জুলাইয়ে ঘটে যাওয়া গণ অভ্যুত্থানের পর থেকে দেশজুড়ে ছাত্রদের ওপর পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ উঠেছিল। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষার্থীদের ওপরও একই ধরনের হামলা চালানো হয়, যেখানে টিয়ার গ্যাস, সাউন্ড গ্রেনেড এবং পিলেট বুলেট ব্যবহার করা হয়েছিল।
এই ধরনের অত্যাচার এবং অমানবিক আচরণ দেশবাসীর কাছে একটি ভয়াবহ সংকেত দেয়। নুরুল হক নূরের ওপর হামলার ঘটনা সে সংকেতেরই একটি শাখা। সরকারের পক্ষ থেকে হামলার ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করা হলেও, এর পরবর্তী পদক্ষেপ এখনও অপ্রতুল।
এ ঘটনায় ৪৬ জন নাগরিক, যাদের মধ্যে বহু বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, লেখক, গবেষক এবং অধিকারকর্মী রয়েছেন, এক বিবৃতিতে দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনিকে গণতান্ত্রিক আচরণের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের মতে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জনগণের প্রতি দয়ালু এবং মানবিক আচরণ প্রদর্শন করতে হবে। অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ এবং নিরস্ত্র ছাত্রদের ওপর হামলা অবশ্যই বন্ধ হওয়া উচিত।
বিবৃতিতে আরো বলা হয়েছে, গণতান্ত্রিক সমাজে সভা-সমাবেশ, মিছিল এবং প্রতিবাদ আইনগত অধিকার। এই অধিকারকে লঙ্ঘন করার কোনো অধিকার কারও নেই। আমাদের দাবি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের দায়িত্ব পালন করার সময় মানুষের অধিকার এবং নিরাপত্তার প্রতি সজাগ থাকবে।
নুরুল হক নূরের ওপর হামলার ঘটনায় দেশের জনগণ সমস্বরে বিচার এবং জবাবদিহিতার দাবি জানিয়েছে। নাগরিক সমাজ এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই হামলা বাংলাদেশের গণতন্ত্রের পক্ষে বিপদজনক এক পদক্ষেপ। এটি জনগণের বিরুদ্ধে এক ধরনের প্রতিশোধমূলক আচরণ, যা দেশের ভবিষ্যত রাজনৈতিক পরিবেশকে সংকটময় করে তুলবে। সেই সাথে, যেসব পুলিশ সদস্য ও রাজনৈতিক কর্মীরা এসব হামলার পেছনে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে। সরকার ও পুলিশ কর্মকর্তারা যদি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নেন, তবে এর পরিণতি আরও ভয়াবহ হতে পারে, এমন আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।
বাংলাদেশের জনগণ একটি নতুন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য হাজার হাজার প্রাণ এবং রক্ত বিসর্জন দিয়েছে। এই ধরনের হামলা সেই ঐতিহাসিক লড়াইয়ের অবমাননা হিসেবে দেখছেন তারা। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়, তার মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণ তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় দৃঢ় সংকল্প প্রকাশ করেছে। এই আন্দোলন যে শুধু রাজনৈতিক নয়, এটি একটি মানবাধিকার আন্দোলন ছিল, যেখানে মানুষ তাদের মৌলিক অধিকার দাবি করেছে।
এখন, দেশের ভবিষ্যতের দিকে তাকালে, সবার প্রথমেই সরকার এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছ থেকে একটি গণতান্ত্রিক এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রত্যাশিত।
নুরুল হক নূরের ওপর হামলা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক মারাত্মক অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হবে। এটি কেবল তার বিরুদ্ধে এক আঘাত নয়, বরং বাংলাদেশের গণতন্ত্র, জনগণের বাক স্বাধীনতা এবং মানবাধিকারকে লঙ্ঘন করার একটি চেষ্টার প্রতীক। বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশের সুরক্ষায় এখন সরকারের এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষে সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
আজকালের খবর/ওআর