বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে থেকেও বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতি ভালোবাসায় আবারও একত্রিত হলেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। ‘জন্মভূমির স্পর্শ, হৃদয়ের বাসভূমে’ প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের ওয়ারেন সিটির সিটি স্কয়ারে অনুষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব মিশিগান (বাম) আয়োজিত ১৭তম বাংলাদেশ–আমেরিকান ফেস্টিভ্যাল।
গত ২৫ ও ২৬ জুলাই অনুষ্ঠিত দুই দিনব্যাপী এ উৎসবে মিশিগানের পাশাপাশি নিউইয়র্ক, ওহাইও, ইন্ডিয়ানা, ইলিনয় এবং কানাডার টরন্টোসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হাজারো বাংলাদেশি পরিবার অংশ নেয়। আয়োজকদের মতে, এটি শুধু একটি সাংস্কৃতিক উৎসব নয়; বরং প্রবাসে বাংলাদেশি পরিচয়, ঐক্য, সম্প্রীতি এবং নতুন প্রজন্মের কাছে শেকড়ের বন্ধন পৌঁছে দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন।
উৎসবজুড়ে ছিল গ্রামীণ বাংলার আবহ। দেশীয় খাবার, শাড়ি, থ্রি-পিস, হস্তশিল্প, গহনা, শিশুদের খেলনা এবং বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের ৬০টিরও বেশি স্টল দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখর ছিল। সন্ধ্যার পর খাবারের স্টলগুলোতে ছিল উপচে পড়া ভিড়। নিরাপত্তা, পর্যাপ্ত পার্কিং, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও ভ্রাম্যমাণ টয়লেটের ব্যবস্থাও দর্শকদের প্রশংসা কুড়ায়।
সাংস্কৃতিক আয়োজন ছিল উৎসবের মূল আকর্ষণ। লোকসংগীত, আধুনিক গান, নৃত্য এবং বাংলা ও পাশ্চাত্য ধারার সংগীতের সমন্বয়ে পরিবেশিত হয় বর্ণিল অনুষ্ঠান। ঐতিহ্যবাহী কলসি নৃত্য, লোকজ পরিবেশনা এবং শিশু-কিশোরদের অংশগ্রহণ দর্শকদের মুগ্ধ করে। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সুমন কবির ও শারমিন তানিম।
প্রথম দিনের অনুষ্ঠানে বাউল শিল্পী কালা মিয়া ও কণ্ঠশিল্পী রেশমি মির্জা পরিবেশনা করেন। দ্বিতীয় দিনের মূল আকর্ষণ ছিলেন বাংলাদেশের জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী দিলশাদ নাহার কনা এবং তরুণ শিল্পী মুজা ও অনিক রাজ। কনার জনপ্রিয় গান এবং মুজার দর্শকদের মাঝে নেমে পরিবেশনা উৎসবকে প্রাণবন্ত করে তোলে। স্থানীয় শিল্পী ও ব্যান্ডগুলোর পরিবেশনাও দর্শকদের প্রশংসা পায়।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব মিশিগান (বাম) দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে কাজ করে যাচ্ছে। প্রতিবছরের বাংলাদেশ–আমেরিকান ফেস্টিভ্যাল এখন প্রবাসী বাংলাদেশিদের অন্যতম বৃহৎ সাংস্কৃতিক মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।
উৎসবে ভিডিও বার্তা দেন মিশিগানের সেক্রেটারি অব স্টেট জোসেলিন বেনসন। উপস্থিত ছিলেন মিশিগানের লেফটেন্যান্ট গভর্নর গারলিন গিলক্রিস্ট, ওয়ারেন সিটির মেয়র লরি স্টোন, সিটি কাউন্সিলের সদস্য এবং অন্যান্য জনপ্রতিনিধিরা।
বক্তারা বাংলাদেশি–আমেরিকান কমিউনিটির অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অবদানের প্রশংসা করেন। তাঁদের বক্তব্যে ক্ষুদ্র ব্যবসা, স্বাস্থ্যসেবা, প্রকৌশল, তথ্যপ্রযুক্তি, শিক্ষা ও উদ্যোক্তা খাতে বাংলাদেশিদের সাফল্যের কথা তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে বহুসাংস্কৃতিক আমেরিকায় সম্প্রীতি ও পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধিতে এ ধরনের উৎসবের গুরুত্বও উল্লেখ করা হয়।
উৎসবজুড়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে অংশ নেন নানা বয়সী প্রবাসীরা। শিশুদের আনন্দ, তরুণদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ, প্রবীণদের আবেগঘন উপস্থিতি এবং র্যাফেল ড্র আয়োজন উৎসবে বাড়তি মাত্রা যোগ করে।
বামের সভাপতি জাবেদ চৌধুরী বলেন, ১৭তম বাংলাদেশ–আমেরিকান ফেস্টিভ্যাল সফল করতে সংগঠনের নেতা-কর্মী, সদস্য, স্পন্সর, ভেন্ডর, গণমাধ্যমকর্মী, মূলধারার রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন কমিউনিটির প্রতিনিধি এবং হাজারো দর্শনার্থীর সহযোগিতা ছিল অনন্য। তাঁদের ভালোবাসা ও সমর্থন ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে বাংলাদেশের সংস্কৃতি বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতে অনুপ্রেরণা জোগাবে।
দুই দিনের আয়োজন শেষ হলেও প্রবাসীদের হৃদয়ে রয়ে গেছে উৎসবের আবেগ। বাংলা গান, দেশীয় খাবারের ঘ্রাণ, রঙিন পোশাক এবং আন্তরিক মিলনমেলায় ওয়ারেন সিটির সিটি স্কয়ার যেন সাময়িক সময়ের জন্য রূপ নিয়েছিল এক টুকরো বাংলাদেশে।
আজকালের খবর/এমকে