আর্জেন্টিনার গর্ব লিওনেল মেসি। পর্তুগালের 'সোনার ছেলে' ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। ফ্রান্সের 'রত্ন' কিলিয়ান এমবাপে। এই থ্রি মাস্কেটিয়ার্সদের সঙ্গে একই বন্ধনীতে বসতেই পারেন নরওয়ের প্রাণভোমরা আর্লিং হালান্ড। নরওয়ের মানুষ এখন গর্ব করে বলতেই পারেন, 'আমাদেরও একজন হালান্ড আছেন।' যিনি একাই একটা মহাশক্তিধর দেশের স্বপ্ন ভেঙে চুরমার করে দিতে পারেন। যাঁর পায়ের ছোঁয়ায় জেগে উঠতে পারে একটা জাতি। সেই আর্লিং হালান্ডের জোড়া গোলে নেইমারের চোখে জলের ধারা।
হালান্ডের হাসি ভীষণ ছোঁয়াচে। গ্যালারিতেও তা ছড়িয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, রেফারির শেষ বাঁশির পরে কান্নায় ভেঙে পড়লেন নেইমার। বিশ্বকাপ এমনই এক মঞ্চ। হর্ষ-বিষাদ, হাসি-কান্নার এক মহাযজ্ঞ।
মেসি, রোনালদো ও নেইমার - ফুটবলের তিন সেরা খেলোয়াড়ের এবারই শেষ বিশ্বকাপ। নেইমারকে কাঁদতে কাঁদতে চলে যেতে হলো। পেলের দেশের কোচ কার্লো আনচেলোত্তি সর্বহারার প্রতিভূ হয়ে বসে রইলেন ডাগ আউটে। তাঁর পাশে কেউ নেই। এরকমই হয় জীবন। সাফল্যে ভাগ বসায় সবাই। হেরে যাওয়ার ব্যর্থতায় পাশে থাকে না কেউ। সব দায় একজনের। আনচেলোত্তির চোখে শূন্যতা। কী যে হয়ে গেল হঠাৎ! বিশ্বাস করতে পারছেন না।
নরওয়ের ফুটবলে নতুন ভোর। তাদের 'সূর্য' হালান্ড মধ্যগগনে আলো-দীপ্তি-তেজ ছড়াচ্ছেন। মাঠে ড্রাম বাজাচ্ছেন এই ম্যাচের নায়ক। গ্যালারিতে চলছে ভাইকিং ক্ল্যাপ। চারদিকে লাল রঙের উজ্জ্বল উপস্থিতি। বিশ্বকাপে নরওয়ে লিখে দিল নিজেদের গৌরবগাঁথা। এই মহাম্যাচের আগে চারবার মুখোমুখি হয়েছিল ব্রাজিল ও নরওয়ে। এই চারবারের সাক্ষাতে একবারও জয়ের মুখ দেখেনি পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। নরওয়ে জিতেছিল দু'বার। বাকি দু'বার ড্র।
এদিন নরওয়ে ২-১ গোলে ব্রাজিলকে বিদায় করে পৌঁছে গেল কোয়ার্টার ফাইনালে। নতুন পরিসংখ্যান বলছে, পাঁচবারের দেখায় নরওয়ে তিনবার জিতল। বাকি দু'টি ম্যাচ ড্র। জোড়া গোলে হালান্ড নায়ক হলে, গোটা ব্রাজিল দলটাই হয়তো খলনায়ক। শুরুতে পেনাল্টি নষ্ট করা, বড়লোকের বাউন্ডুলে ছেলের মতো গোল নষ্ট করার খেসারত দিতে হল শেষ পর্যন্ত। নরওয়ের বারের নীচে তাদের দীঘল চেহারার গোলকিপার অরইয়ান নাইল্যান্ডের ছায়া দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে ধরা দিল।
নরওয়ে অপেক্ষার খেলা খেলছিল। অতিরিক্ত পাস খেলে খেলার গতি কমিয়ে দিচ্ছিল তারা। একবার স্ক্রিনে ফুটে ওঠা পাসের হিসেবে দেখা গেল ব্রাজিল যেখানে দুশোর সামান্য বেশি পাস খেলেছে, সেখানে নরওয়ের পাসের সংখ্যা পাঁচশো ছাড়িয়েছে। নরওয়ে পাস খেলে খেলে ব্রাজিলের রক্ষণ ভাঙার চেষ্টা করছিল। আবার হালান্ডকে উদ্দেশ্য করে নরওয়ের গোলকিপারের লম্বা বল অনেক সময়ই ব্রাজিলের রক্ষণে কম্পন ধরাচ্ছিল।
৭৯ মিনিটে অপেক্ষার অবসান ঘটান হালান্ড। এই ম্যাচের বল গড়ানোর আগে থেকে অনেকে বলছিলেন, এই লড়াই কেবল ব্রাজিল বনাম নরওয়ের নয়। এই দ্বৈরথ গ্যাব্রিয়েল বনাম হালান্ডেরও। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ এই দুই তারকার ডুয়েল অতীতে দেখেছে। তাঁদের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি হয়েছে, কথা কাটাকাটি হয়েছে। কেউ কাউকে ছাড়তে নারাজ।
আন্দ্রিয়াসের সেন্টার যখন ব্রাজিলের বক্সে ভাসছে, তখন হালান্ডের শরীরে লেগেছিলেন গ্যাব্রিয়েল। শক্তিশালী নরওয়ের স্ট্রাইকার লাফালেন শূন্যে। বিপদের গন্ধ পেয়ে গ্যাব্রিয়েলও স্পট জাম্প দিলেন। হেডে বিষ ঢাললেন হালান্ড। নরওয়ের স্ট্রাইকারের ছায়াসঙ্গী গ্যাব্রিয়েল ছিটকে পড়লেন মাটিতে। অ্যালিসন শরীর ছুড়েও পারলেন না সেই হেড থামাতে। বল জালে জড়িয়ে গেল। নরওয়ে এগিয়ে গেল ১-০-এ।
গোল হজম করা ব্রাজিল সবসময়তেই ভয়ঙ্কর। তার উপর এমন এক সময়ে গোল খেতে হয়েছে যে ম্যাচে ফিরে আসার সময়ও নেই। নেইমারের সেই সর্পিল দৌড় আর দেখা যাচ্ছে না। বয়স তাঁর শরীরে থাবা বসিয়েছে। তার উপর চোট নেইমারের সেরাটা কেড়ে নিয়েছে। ভিনিসিয়ুস জুনিয়রও বোধহয় ততক্ষণে বুঝে ফেলেছেন ছুটি হয়ে গেল এবার বিশ্বকাপ থেকে। বাকিদের মধ্যে ইচ্ছাশক্তির অভাব। আগের ম্যাচেই পিছিয়ে থেকেও জাপানকে হারিয়েছিল ব্রাজিল। কিন্তু মনে রাখতে হবে জাপান আর এই নরওয়ে এক দল নয়। ম্যাচ তাদের মুঠোয়।
হালান্ড কী ভাবলেন কে জানে! আবার বিস্ফোরণ ঘটালেন তিনি। গর্জে উঠল তাঁর বাঁ পা। অ্যালিসন ভূপতিত। বল জালে। দেয়াল লিখন পড়ে ফেলেছেন সবাই। ব্রাজিল সমর্থকরা ভেঙে পড়েছেন। দেশের অসম্মান দেখে ছোট্ট এক ব্রাজিল সমর্থক কেঁদেই চলেছে। ঠিক সেই সময়ে নরওয়ের বক্সের ভিতরে কাসিমেরোর মুখে কনুই চালানোর অপরাধে পেনাল্টি পেল ব্রাজিল।
নেইমার পেনাল্টি নিতে এগিয়ে এলেন। তাঁর সঙ্গে নাইল্যান্ডের তর্ক হল। এই পড়ন্ত বেলার নেইমার নরওয়ের গোলকিপারকে বোকা বানিয়ে গোল করলেন। ছুটে গিয়ে নেইমার হয়তো তাঁকে বলার চেষ্টা করলেন, 'ওহে গোলকিপার, আমি নেইমার। মনে রেখো আমার নাম।'
নেইমার গোল করলেন, ব্যবধান কমালেন ঠিকই, কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়েছে। রেফারির শেষ বাঁশির পরে সেই নেইমারই জার্সিতে মুখ ঢেকে কাঁদলেন। এটাই তাঁর শেষ বিশ্বকাপ। চলে যাওয়ার আগে রাঙিয়ে দিয়ে যেতে পারতেন। কিন্তু দিনের শেষে নেইমার ট্র্যাজিক নায়ক হয়েই থেকে গেলেন। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে বিশ্বকাপ জেতা আর হল না তাঁর।
স্বপ্নের দৌড় শুরু হয়েছে নরওয়ের। সমর্থকরা বলছেন, 'এই দৌড় যেন না থামে।' মেসি-এমবাপের ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছেন হালান্ড। এবারের বিশ্বকাপে সাতটা গোল হয়ে গেল তাঁর। মেসি-এমবাপেকে ছোঁয়ার দিন অস্ফুটে হালান্ড হয়তো বলে গেলেন, 'তুমি ব্রাজিল, পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। কিন্তু আমি হালান্ড।' তিনিই ব্রাজিলের শোকের কারণ। নরওয়ের দেশনায়ক আজ আর্লিং হালান্ড।
আজকালের খবর/কবির