বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ বাড়াতে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিয়েছেন জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) সভাপতি তানাকা আকিহিকো।
তিনি বলেন, জাপানি বিনিয়োগকারীরা অনিশ্চয়তা পছন্দ করেন না।
বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নীতির ধারাবাহিকতা, স্বচ্ছতা ও দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেন।
বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) দ্য ডেইলি স্টারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ কথা বলেন তিনি।
তানাকা আকিহিকো বলেন, বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এখনো শক্তিশালী। তবে আরো বেশি জাপানি বিনিয়োগ বাড়াতে সুশাসন, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতের কথা বলেন তিনি।
বাংলাদেশ সফরে তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, বিভিন্ন মন্ত্রী ও ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল, এমআরটি (মেট্রো রেল) প্রকল্প, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর এবং অন্যান্য জাপানি অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা করেন।
তানাকা জানান, প্রশাসনিক জটিলতা ও সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে কয়েকটি বড় অবকাঠামো প্রকল্পের কাজ বিলম্বিত হয়েছে। তবে এ নিয়ে জাইকা ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে কোনো মৌলিক মতপার্থক্য তৈরি হয়নি।
তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, দ্রুত ক্রয় ও দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে প্রকল্পগুলোর কাজ এগিয়ে নিতে পারব।
জাপানের অর্থায়নে বাস্তবায়িত প্রকল্পগুলো বেশি ব্যয়বহুল—এমন সমালোচনাও প্রত্যাখ্যান করেন জাইকাপ্রধান। তিনি বলেন, ব্যয় নয়, প্রকল্পের গুণগত মান ও দীর্ঘমেয়াদি সুফল বিবেচনা করা উচিত। তিনি ঢাকার মেট্রো রেলকে উচ্চমানের অবকাঠামো বিনিয়োগের সফল উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
আঞ্চলিক সংযোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের গুরুত্ব তুলে ধরে তানাকা বলেন, জাপানের ‘ফ্রি অ্যান্ড ওপেন ইন্দো-প্যাসিফিক’ কৌশলে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর চালু হলে দেশের বাণিজ্যিক সক্ষমতা বাড়বে এবং চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর চাপ কমবে।
জাইকার ঋণের সুদের হার বৃদ্ধির বিষয়ে তিনি বলেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও মূল্যস্ফীতির কারণে এ পরিবর্তন হয়েছে। তবে ঋণ পরিশোধের নির্দিষ্ট সময় রয়েছে। এই সময়ের মধ্যে পরিশোধ করলে রেয়াতি সুবিধা থাকবে।
বর্তমানে বাংলাদেশে জাপানের প্রত্যক্ষ সরকারি বিনিয়োগ ৪০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি এবং এখানে প্রায় ৩৪০ থেকে ৩৫০টি জাপানি প্রতিষ্ঠান ব্যবসা করছে। সম্প্রতি স্বাক্ষরিত বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ আরো বাড়াতে সহায়ক হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন জাইকা সভাপতি।
জাপানি কোম্পানিগুলো বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয় জানিয়ে তিনি বলেন, অর্থনৈতিক সহযোগিতার কাঠামো উন্নত হলে ব্যাবসায়িক কার্যক্রম আরো সহজ হয়। তবে বাংলাদেশে আরো বেশি জাপানি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ও উন্নত শাসনব্যবস্থা অপরিহার্য।
জাপান-অর্থায়িত প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে তানাকা আকিহিকো বলেন, প্রশাসনিক জটিলতা ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের কিছু বড় অবকাঠামো প্রকল্পে বিলম্ব হয়েছে। এমআরটি লাইন-১ ও লাইন-৫-এর মতো প্রকল্পেও অগ্রগতি ধীর হয়েছে বলেও জানান তিনি।
তবে জাইকা ও বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে কোনো মৌলিক মতভেদ নেই দাবি করে তিনি বলেন, উভয় পক্ষই একমত যে ক্রয় ও দরপত্র প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করে নির্মাণকাজ এগিয়ে নেওয়া। তিনি বলেন, সরকারি প্রশাসনিক কাঠামোয় কখনো কখনো কিছু অংশে বিস্তারিত যাচাই-বাছাইয়ের কারণে সময় লাগে, যা শুধু বাংলাদেশের ক্ষেত্রেই নয়, অন্যান্য দেশেও এমনটি হয়।
তিনি আরো বলেন, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হওয়ায় কিছু প্রক্রিয়া ধীর হয়েছে। তবে বিদ্যমান সমস্যাগুলো সমাধান করে প্রকল্পগুলো এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে তিনি আশাবাদী।
জাপানি অর্থায়নে বাস্তবায়িত প্রকল্পগুলো ব্যয়বহুল—এমন সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করে জাইকা সভাপতি বলেন, প্রকল্পের ব্যয় সব সময় গুণগত মান ও দীর্ঘমেয়াদি ফলাফলের সঙ্গে তুলনা করে দেখা উচিত। একই মান ও ফলাফল হলে ব্যয়ের তুলনা করা যেতে পারে, তবে জাপানি প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে গুণগত মান ও দীর্ঘমেয়াদি সুফল অনেক বেশি। তিনি ঢাকার মেট্রো রেলকে জাপানের উচ্চমানের অবকাঠামো বিনিয়োগের সফল উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন এবং এর সেবার প্রতি মানুষের ইতিবাচক গ্রহণযোগ্যতার প্রশংসা করেন।
জাপানের ‘ফ্রি অ্যান্ড ওপেন ইন্দো-প্যাসিফিক’ কৌশলে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন জাইকাপ্রধান। তিনি বলেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কেন্দ্র ধীরে ধীরে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের দিকে সরে যাচ্ছে, এবং জাপান এই উন্নয়নের অংশ হতে চায়।
তিনি মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে এই কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হিসেবে উল্লেখ করেন। বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর চাপ ক্রমেই বাড়ছে, তাই একটি শক্তিশালী বিকল্প বন্দর প্রয়োজন।
তিনি জানান, আগে জাপান বাংলাদেশ, মায়ানমার ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে যুক্ত করে আঞ্চলিক সংযোগ উন্নয়নের পরিকল্পনা করেছিল। পাশাপাশি নেপাল, ভুটান ও বাংলাদেশের মধ্যেও উত্তর-দক্ষিণ সংযোগের ধারণা ছিল। তবে মায়ানমারের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়নি।
জাপানি উন্নয়ন ঋণের সুদের হার বৃদ্ধি প্রসঙ্গে তানাকা বলেন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিবর্তন ও মূল্যস্ফীতির কারণে এ ধরনের সমন্বয় প্রয়োজন হয়েছে। তিনি বলেন, জাইকা সব সময় অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অর্থায়নের শর্ত নির্ধারণ করে।
জাইকা সভাপতি বলেন, কভিড-১৯ মহামারি ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলেছে। তিনি সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন, সরকারি অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালীকরণ এবং কর রাজস্ব বৃদ্ধির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি বলেন, উচ্চ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হলে তৈরি পোশাক খাতের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে অর্থনীতিকে বহুমুখী করতে হবে এবং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বাজারের সঙ্গে আরো গভীরভাবে যুক্ত হতে হবে। এ সময় বাংলাদেশের সঙ্গে জাপানের অংশীদারত্ব অত্যন্ত শক্তিশালী এবং ভবিষ্যতেও এই সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলেও আশ্বাস দেন তিনি।
আজকালের খবর/বিএস