ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প, অবকাঠামো কিংবা ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ, বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ খাতের অর্থায়নের প্রধান উৎস এখনো ব্যাংক। বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থার তুলনামূলক বিশ্লেষণেও উঠে এসেছে একই চিত্র। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক তথ্য-উপাত্ত ও আর্থিক খাতের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মোট ব্যবসায়িক ও করপোরেট অর্থায়নের প্রায় ৭৫ থেকে ৮৫ শতাংশই বাংলাদেশে ব্যাংকের মাধ্যমে হয়ে থাকে।
সমমর্যাদার উন্নয়নশীল দেশ এমনকি উন্নত অর্থনীতির তুলনায়ও এ হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ৬১টি তফসিলি ব্যাংক এবং ৩৫টি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
তবে আর্থিক খাতের বিশ্লেষকদের মতে, সংখ্যাগত উপস্থিতি থাকলেও বাংলাদেশের আর্থিক ব্যবস্থার মূল ভিত্তি এখনো ব্যাংক। করপোরেট বন্ড বাজার, পুঁজিবাজার, লিজিং, ফ্যাক্টরিং এবং অন্যান্য বিকল্প অর্থায়ন ব্যবস্থার সীমিত বিকাশের কারণে দেশের আর্থিক কাঠামো তুলনামূলকভাবে কম বৈচিত্র্যময়।
তুলনামূলক বৈশ্বিক তথ্য বলছে, উন্নত ও উদীয়মান অর্থনীতির অধিকাংশ দেশই ধীরে ধীরে ব্যাংকনির্ভরতা কমিয়ে বহুমুখী অর্থায়ন ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে গেছে। সেখানে ব্যাংকের পাশাপাশি পুঁজিবাজার, করপোরেট বন্ড, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী, লিজিং কোম্পানি, প্রাইভেট ক্রেডিট ফান্ড এবং অন্যান্য নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান অর্থায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বাংলাদেশে এখনো সেই কাঠামো পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি।
বৈশ্বিক আর্থিক কাঠামো: বিভিন্ন দেশের ব্যাংক ও ননব্যাংকভিত্তিক অর্থায়নের তুলনামূলক চিত্রে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রে মোট অর্থায়নের মাত্র ২০ থেকে ৩০ শতাংশ ব্যাংকের মাধ্যমে হয়।
বাকি ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ আসে করপোরেট বন্ড, শেয়ারবাজার, প্রাইভেট ক্রেডিট ফান্ড এবং অন্যান্য আর্থিক উৎস থেকে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে ব্যাংকভিত্তিক অর্থায়নের হার ২৫ থেকে ৩৫ শতাংশ। জাপানে এ হার ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় ৩৫ থেকে ৪৫ শতাংশ। চীনে ব্যাংকনির্ভরতা তুলনামূলক বেশি হলেও মোট অর্থায়নের ৫০ থেকে ৬০ শতাংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
ভারতে ব্যাংকভিত্তিক অর্থায়নের হার ৫৫ থেকে ৬৫ শতাংশ, ভিয়েতনামে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ এবং থাইল্যান্ডে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ। অন্যদিকে বাংলাদেশে মোট অর্থায়নের প্রায় ৭৫ থেকে ৮৫ শতাংশই ব্যাংকের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। অ-ব্যাংক অর্থায়নের অংশ মাত্র ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ। ফলে তুলনামূলকভাবে ব্যাংকনির্ভর আর্থিক ব্যবস্থার তালিকায় বাংলাদেশ অন্যতম শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই তুলনামূলক চিত্র স্পষ্টভাবে দেখায় যে বাংলাদেশের আর্থিক ব্যবস্থা এখনো প্রধানত ব্যাংকনির্ভর, যেখানে উন্নত ও অনেক উদীয়মান অর্থনীতি ইতোমধ্যে অর্থায়নের বহুমুখী কাঠামো গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের আর্থিক ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো প্রায় সব ধরনের ঋণ ও বিনিয়োগের জন্য ব্যাংকের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতা। বাণিজ্য, উৎপাদনশিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ (এসএমই), অবকাঠামো এবং বড় শিল্পপ্রকল্প-প্রায় সব ক্ষেত্রেই অর্থায়নের মূল দায়িত্ব পালন করছে ব্যাংকগুলো।
তাদের মতে, এ পরিস্থিতির পেছনে কয়েকটি কাঠামোগত কারণ রয়েছে। দেশে নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ও সক্ষমতা সীমিত। বর্তমানে মাত্র ৩৫টি এনবিএফআই কার্যক্রম পরিচালনা করছে। একই সঙ্গে করপোরেট বন্ড বাজার এখনো কার্যকরভাবে বিকশিত হয়নি। দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের বিকল্প উৎস হিসেবে পুঁজিবাজারও প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখতে পারেনি। এছাড়া লিজিং, ফ্যাক্টরিং, প্রকল্প অর্থায়ন এবং স্ট্রাকচার্ড ফাইন্যান্সের মতো আধুনিক অর্থায়ন ব্যবস্থারও যথেষ্ট বিস্তার ঘটেনি। ফলে ব্যবসা ও শিল্প খাতের অধিকাংশ অর্থায়নের চাপ ব্যাংকগুলোর ওপরই কেন্দ্রীভূত হয়েছে।
উন্নত অর্থনীতির ভিন্ন বাস্তবতা: বৈশ্বিক তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, উন্নত অর্থনীতিগুলোতে ব্যাংক একমাত্র অর্থায়নের উৎস নয়; বরং এটি বৃহত্তর আর্থিক ব্যবস্থার একটি অংশ মাত্র।
যুক্তরাষ্ট্রে করপোরেট অর্থায়নের বড় অংশ আসে করপোরেট বন্ড, শেয়ারবাজার এবং প্রাইভেট ক্রেডিট ফান্ড থেকে। ফলে সেখানে ব্যাংকের ভূমিকা তুলনামূলকভাবে সীমিত।
ইউরোপীয় ইউনিয়নে ব্যাংকের পাশাপাশি পুঁজিবাজার এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সমন্বয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ আর্থিক কাঠামো গড়ে উঠেছে। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও করপোরেট অর্থায়নে এসব প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় শিল্পায়নের সঙ্গে তাল মিলিয়ে গড়ে উঠেছে শক্তিশালী লিজিং কোম্পানি, সিকিউরিটিজ প্রতিষ্ঠান এবং ভোক্তা অর্থায়ন সংস্থা।
ফলে শিল্প ও ব্যবসা খাতের অর্থায়নের জন্য ব্যাংকের ওপর একক নির্ভরতা তৈরি হয়নি। চীনের আর্থিক ব্যবস্থাকে অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংকনির্ভর বলা হলেও, দেশটির অর্থায়ন কাঠামোকে শক্তিশালী করেছে নীতিনির্ধারণী ব্যাংক, বৃহৎ লিজিং খাত এবং বিস্তৃত নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান। ফলে অর্থায়নের উৎস তুলনামূলকভাবে বহুমুখী।
উদীয়মান অর্থনীতিতেও বাড়ছে বিকল্প অর্থায়ন: ভারত, ভিয়েতনাম এবং থাইল্যান্ডের মতো উদীয়মান অর্থনীতিগুলোও ধীরে ধীরে ব্যাংকনির্ভরতা কমিয়ে বহুমাত্রিক আর্থিক ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
এসব দেশে নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা ক্রমেই বাড়ছে। একই সঙ্গে লিজিং ও এসএমই অর্থায়নের সম্প্রসারণ, করপোরেট বন্ড বাজারের বিকাশ এবং পুঁজিবাজারের গভীরতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ব্যবসা ও শিল্প খাতের জন্য নতুন অর্থায়নের উৎস তৈরি হচ্ছে। এর ফলে ব্যাংকিং খাতের ওপর চাপও তুলনামূলকভাবে কমে আসছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের মতো অর্থনীতির জন্য এসব দেশের অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ শিল্পায়নের সঙ্গে সঙ্গে অর্থায়নের উৎস বৈচিত্র্যময় না হলে ব্যাংকিং খাতের ওপর চাপ বাড়তে থাকে এবং আর্থিক ব্যবস্থার ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়।
কিছু বিশ্লেষকের মতে, বাংলাদেশে ব্যাংকের সংখ্যা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক থাকলেও প্রকৃত সমস্যা সংখ্যায় নয়, কাঠামোতে। তাদের ভাষায়, দেশের মূল চ্যালেঞ্জ অতিরিক্ত ব্যাংক নয়; বরং ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে বিকল্প অর্থায়নের পর্যাপ্ত স্তর গড়ে না ওঠা। অর্থাৎ ব্যাংকের পাশাপাশি শক্তিশালী নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান, করপোরেট বন্ড বাজার, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী এবং অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের উৎস গড়ে তুলতে না পারায় পুরো আর্থিক ব্যবস্থা একটি মাত্র খাতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।
প্রবৃদ্ধির অবকাঠামো হিসেবে আর্থিক ব্যবস্থা: অর্থনীতিবিদরা আর্থিক ব্যবস্থাকে বহুস্তরবিশিষ্ট অবকাঠামোর সঙ্গে তুলনা করেন। তাদের মতে, ব্যাংক স্বল্পমেয়াদি তারল্যের প্রধান উৎস হিসেবে কাজ করে। নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান লিজিং, প্রকল্প অর্থায়ন এবং এসএমই খাতের অর্থায়নে সহায়তা করে। অন্যদিকে পুঁজিবাজার বন্ড, শেয়ার এবং পেনশনভিত্তিক দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের অর্থায়ন নিশ্চিত করে। তাদের মতে, এই তিন স্তরের মধ্যে ভারসাম্য না থাকলে অর্থনীতিতে ঋণপ্রবাহে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হতে পারে। একই সঙ্গে একটি মাত্র উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা আর্থিক কেন্দ্রীভবনের ঝুঁকি বাড়ায়।
সামনে যে চ্যালেঞ্জ: বিশ্লেষকদের মতে, তৈরি পোশাক, অবকাঠামো এবং জ্বালানি খাতে বাংলাদেশের বিনিয়োগ ও শিল্পায়ন যত বাড়বে, ততই বহুমুখী অর্থায়ন কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা বাড়বে। তাদের মতে, এ জন্য নন-ব্যাংক আর্থিক খাতের সম্প্রসারণ, করপোরেট বন্ড বাজার ও পুঁজিবাজারকে আরও গভীর ও কার্যকর করা, লিজিং ও প্রকল্প অর্থায়ন শক্তিশালী করা এবং ব্যাংকঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো জরুরি।
বিশ্লেষকদের মতে, সংখ্যার বিচারে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বড় হলেও বৈশ্বিক তুলনামূলক তথ্য বলছে, দেশের আর্থিক ব্যবস্থা এখনো বিশ্বের অন্যতম ব্যাংকনির্ভর। ভারত, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডের মতো সমমর্যাদার অর্থনীতি, এমনকি জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের তুলনায়ও বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ব্যাংকভিত্তিক অর্থায়নের ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
তাদের মতে, টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হলে ব্যাংকের পাশাপাশি বিকল্প অর্থায়নের শক্তিশালী অবকাঠামো গড়ে তোলার বিকল্প নেই। নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান, করপোরেট বন্ড বাজার, পুঁজিবাজার এবং অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের উৎস যত শক্তিশালী হবে, বাংলাদেশের আর্থিক ব্যবস্থাও তত বেশি ভারসাম্যপূর্ণ, স্থিতিশীল ও প্রতিযোগিতামূলক হয়ে উঠবে।
আজকালের খবর/ এমকে