সোমবার ২৯ জুন ২০২৬
চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়নে ডিপি ওয়ার্ল্ড, খুলছে নতুন দিগন্ত
প্রকাশ: সোমবার, ২৯ জুন, ২০২৬, ৭:৩১ পিএম   (ভিজিট : ৫)
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (NCT) পরিচালনায় আন্তর্জাতিক অপারেটর 'ডিপি ওয়ার্ল্ড' (DP World)-এর কৌশলগত অংশীদারিত্ব বাংলাদেশের অর্থনৈতিক লাইফলাইনে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করতে যাচ্ছে। কৌশলগত ও ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনা করে এই টার্মিনাল পরিচালনায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের (UAE) এই খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠানের সাথে সরকারের আলোচনা ও দরকষাকষি এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এটি হুট করে নেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত নয়; বরং দুই দেশের দীর্ঘদিনের দ্বিপাক্ষিক আলোচনা, গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং বিশ্বমানের বন্দর ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা থেকেই এই দূরদর্শী উদ্যোগ আলোর মুখ দেখছে।

এই অংশীদারিত্বের পটভূমি ও বিনিয়োগ প্রস্তাবের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। ২০১৯ সালে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনা নিয়ে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়। তখন ইউএই এবং বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে একটি জিটুজি (G2G) এবং পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (PPP) কাঠামোর অধীনে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের প্রক্রিয়া চালু হয়। বাংলাদেশ-ইউএই জয়েন্ট পিপিপি প্ল্যাটফর্মের প্রথম ও দ্বিতীয় বৈঠকে বন্দর খাতে, বিশেষ করে এনসিটিতে বিনিয়োগের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে আলোচিত হয়। পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে অনুষ্ঠিত তৃতীয় বৈঠক এবং বর্তমান সরকারের শুরুর দিকে অনুষ্ঠিত চতুর্থ বৈঠকেও এটি অন্যতম প্রধান এজেন্ডা হিসেবে স্থান পায়। এই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ সমুন্নত রেখে বিনিয়োগ প্রস্তাব চূড়ান্ত করার কাজ দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে সরকার।

কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা বাড়াতে এবং আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের চাপ সামলাতে ২০০০ সালের দিকে এনসিটি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ২০০৭ সালে বন্দর কর্তৃপক্ষের নিজস্ব তহবিল থেকে প্রায় ৫৮২ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫টি জেটি সমৃদ্ধ এই টার্মিনালের অবকাঠামো নির্মাণ শেষ হয়। ২০১৭ সাল থেকে এখানে পুরোদমে কনটেইনার হ্যান্ডলিং শুরু হলেও বর্তমানে কিছু কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। যেখানে বিশ্বব্যাপী যন্ত্রপাতির সহজলভ্যতা বা সচল থাকার হার ৯৩ শতাংশ, সেখানে এনসিটিতে তা ৭০ শতাংশে নেমে এসেছে। বর্তমানে এখানে প্রতি ঘণ্টায় ২০ থেকে ২২টি কনটেইনার হ্যান্ডলিং হয়, তবে বিশ্বমানের প্রযুক্তি ও আধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহার করলে তা অনায়াসেই ৩০টি কনটেইনারে উন্নীত করা সম্ভব, যা জাহাজের বন্দরে অবস্থানকাল বা টার্ন-অ্যারাউন্ড টাইম অনেক কমিয়ে আনবে।

টার্মিনাল অপারেশনে আন্তর্জাতিক অপারেটর যুক্ত করা কেবল ক্রেন চালানো বা জাহাজ পরিচালনার সাধারণ বিষয় নয়, এটি মূলত একটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি, বৈশ্বিক লজিস্টিকস চেইন এবং ভূরাজনীতির সাথে জড়িত কৌশলগত সিদ্ধান্ত। আন্তর্জাতিক অপারেটররা নিজস্ব অর্থ বিনিয়োগ করে সর্বাধুনিক যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি স্থাপন করে বলে সরকারের আর্থিক চাপ অনেকটাই কমে যায়। এরা অত্যাধুনিক গ্যান্ট্রি ক্রেন, টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেম (TOS), গ্রিন পোর্ট টেকনোলজি এবং অটোমেটেড ইয়ার্ড ম্যানেজমেন্ট ব্যবহার করে থাকে। তা ছাড়া শীর্ষস্থানীয় অপারেটরদের নিজস্ব শিপিং লাইন বা বড় শিপিং জোটের সাথে চুক্তি থাকার কারণে তারা বৈশ্বিক ক্লায়েন্টদের এই বন্দরে আসতে উদ্বুদ্ধ বা বাধ্য করতে পারে। সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও পেপারলেস সিস্টেম ব্যবহারের কারণে রিয়েল-টাইম ডাটা ট্র্যাকিং সম্ভব হয়, যার ফলে মানুষের সরাসরি হস্তক্ষেপ এবং অন্যায্য দাবির সুযোগ বন্ধ হয় এবং কোনো লুকানো খরচ বা সিন্ডিকেট তৈরির সুযোগ থাকে না। এর ফলে জাহাজের বন্দরে অবস্থানকাল ২৪ ঘণ্টার নিচে নেমে আসবে এবং দেশের আমদানি-রপ্তানি খরচ এক ধাক্কায় প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।

আমিরাত সরকারের সম্পূর্ণ মালিকানাধীন ডিপি ওয়ার্ল্ড মূলত 'দুবাই ওয়ার্ল্ড'-এর অধীনে পরিচালিত একটি রাষ্ট্রীয় বহুজাতিক কোম্পানি। ইউএই-এর সাথে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বের কারণে এই চুক্তি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিশ্বজুড়ে ৭০টিরও বেশি দেশে ৮০টি টার্মিনাল ও লজিস্টিকস কার্যক্রম পরিচালনার ব্যাপক অভিজ্ঞতা রয়েছে এই বহুমাত্রিক লজিস্টিকস জায়ান্টের। ডিপি ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশের লজিস্টিকস ও অবকাঠামো খাতে প্রায় ১ বিলিয়ন বা ১০০ কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগের বড় প্রস্তাব দিয়েছে। এর ফলে কনটেইনার হ্যান্ডলিং সক্ষমতা কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় দীর্ঘমেয়াদে শুল্ক ও অন্যান্য খাত থেকে সরকারের সামগ্রিক রাজস্ব আয় বর্তমানের চেয়ে অনেক বাড়বে এবং স্থানীয় কর্মকর্তা ও বন্দর শ্রমিকরা আধুনিক বিশ্বমানের প্রযুক্তি ব্যবহারের বিশেষ প্রশিক্ষণ পাবেন।

ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে এই চুক্তিটি হবে শুধুমাত্র টার্মিনাল অপারেশন ও লজিস্টিকস ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত, তাই কোনোভাবেই দেশের নিরাপত্তা বা সার্বভৌমত্ব হস্তান্তরের সুযোগ এখানে নেই। বন্দর এলাকার সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা, বহির্নোঙর নজরদারি এবং সাইবার গেটওয়ে নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও দেশীয় নিরাপত্তা বাহিনীর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণেই থাকবে। চট্টগ্রাম বন্দর একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এবং আইএসপিএস (ISPS) কোড কমপ্লায়েন্ট বন্দর হওয়ায় মার্কিন কোস্ট গার্ড এবং আইএমও (IMO) দ্বারা এটি নিয়মিত অডিট হয়। ডিপি ওয়ার্ল্ডের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী পূর্বানুমতি এবং কঠোর স্ক্রিনিং ছাড়া বন্দরের সংবেদনশীল কোনো ডাটা বা সংরক্ষিত এলাকায় প্রবেশ করতে পারবেন না। পাশাপাশি তাদের অটোমেটেড টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেমের প্রতিটি ডাটা এবং সিসিটিভি ফিড রিয়েল-টাইমে বাংলাদেশ কাস্টমস, এনবিআর এবং জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সাথে সরাসরি যুক্ত থাকবে।

বিশ্বের প্রায় ৮০ শতাংশ বড় সমুদ্রবন্দর ল্যান্ডলর্ড মডেল নীতিতে পরিচালিত হয় এবং এখানেও সেই চমৎকার মডেলের প্রয়োগ ঘটছে। এই মডেলে বন্দরের জমি, জেটি, জলসীমা এবং যাবতীয় স্থাবর সম্পত্তির মূল মালিকানা চিরকাল রাষ্ট্রের হাতেই থাকে, আর অপারেটর কোম্পানিটিকে কেবল একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য পরিচালনার লাইসেন্স দেওয়া হয়। কোনো শর্ত ভঙ্গ করলে সরকার যেকোনো সময় তাদের চুক্তি বাতিল করার ক্ষমতা রাখে। এতে রাষ্ট্রের জন্য সম্পূর্ণ ঝুঁকিহীন আয়ের পথ সুগম হয়, কারণ অপারেটর লাভ করুক বা না করুক, চুক্তি অনুযায়ী রাষ্ট্র প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ফিক্সড রয়্যালটি, লিজ রেন্ট এবং প্রতি কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের ওপর নির্দিষ্ট ফি সরাসরি পেয়ে যায়। এখানে সরকার বা বন্দর কর্তৃপক্ষ রেগুলেটর হিসেবে নিরাপত্তা, ট্যারিফ ও আইনকানুন দেখভাল করবে, আর বিদেশি অপারেটর কেবল ব্যবসা ও অপারেশন চালাবে, যা বন্দরের সামগ্রিক সুশাসন নিশ্চিত করে।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাথে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর, যা মূলত তিনটি শক্তিশালী স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। প্রথমত শ্রমবাজার ও রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে ইউএই-তে ১২ লাখের বেশি প্রবাসী বাংলাদেশি রয়েছেন, যেখান থেকে বছরে গড়ে ৪ থেকে ৪.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্স দেশে আসে। দ্বিতীয়ত বর্তমানে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার, যা ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। তৃতীয়ত দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে কৌশলগত অংশীদারিত্বে রূপান্তর করতে ব্যাপকভিত্তিক অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি বা সেপা (CEPA) স্বাক্ষরের চেষ্টা চলছে, যা কার্যকর হলে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্পূর্ণ শুল্কমুক্ত হবে।

পরিশেষে বলা যায়, নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালে ডিপি ওয়ার্ল্ডের অন্তর্ভুক্তি কেবল একটি সাধারণ টার্মিনাল ব্যবস্থাপনার চুক্তি নয়, বরং এটি বাংলাদেশের ব্লু-ইকোনমি ও বৈশ্বিক বাণিজ্যে এগিয়ে যাওয়ার একটি দূরদর্শী কৌশল। এর ইতিবাচক প্রভাবে বে-টার্মিনাল কিংবা মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের মতো মেগা প্রকল্পগুলোতে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা অনেক সহজ হবে। দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা সম্পূর্ণ সুরক্ষিত রেখে চট্টগ্রাম বন্দরকে আগামী দিনে আঞ্চলিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান আন্তর্জাতিক হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে এটি একটি অত্যন্ত যুগোপযোগী পদক্ষেপ।

আজকালের খবর/কাওছার আল হাবীব







আরও খবর


Advertisement
Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রাপা প্লাজা( ৭ম তলা), রোড-২৭ (পুরাতন) ১৬ (নতুন), ধানমন্ডি, ঢাকা -১২০৯।
ফোন: ৪১০২১৯১৫-৬, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor$gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor$gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রাপা প্লাজা( ৭ম তলা), রোড-২৭ (পুরাতন) ১৬ (নতুন), ধানমন্ডি, ঢাকা -১২০৯।
ফোন: ৪১০২১৯১৫-৬, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor$gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor$gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft