মানুষের জীবনে কিছু পথ থাকে, যা শুধু চলাচলের জন্য নয়; স্মৃতি, ভালোবাসা আর শিকড়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার গুয়াখোলা গ্রামের একটি ছোট্ট রাস্তা আমার কাছে তেমনই এক পথ। সেই পথ ধরে স্কুলে গিয়েছি, স্বপ্ন দেখেছি, বড় হয়েছি। আজ আমি ফিনল্যান্ডে থাকি, কিন্তু জন্মভূমির সেই পথের কথা মনে পড়লেই হৃদয় ভারী হয়ে ওঠে।
১৯৮৯ সালে প্রবাস জীবনের শুরু। দীর্ঘ প্রায় চার দশক ধরে ফিনল্যান্ডের রাজধানী হেলসিংকিতে বসবাস করছি। তবুও জন্মভূমির প্রতি টান কখনো কমেনি। প্রতি এক বা দুই বছর পরপর দেশে ফিরি, আর যতবার ফিরি, ততবারই ছুটে যাই আমার শৈশবের ঠিকানা গুয়াখোলায়।
আমার জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে বাসাইল উচ্চ বিদ্যালয়। এই বিদ্যালয় থেকেই আমি এসএসসি পাস করেছি। আজও গ্রামের প্রতিটি পথ, গাছপালা, মানুষের মুখ আমার স্মৃতিতে অমলিন।
কিন্তু দেশে ফিরলেই একটি বিষয় আমাকে গভীরভাবে কষ্ট দেয়। ইমামগঞ্জ-বাসাইল-গুয়াখোলা-রামকৃষ্ণদী সড়কের প্রায় পুরো অংশ পাকা হলেও বাসাইল উচ্চ বিদ্যালয়ের পেছনে মাত্র ৬০ মিটার রাস্তা এখনো কাঁচা। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) প্রায় ২৩ বছর আগে সড়কের অধিকাংশ অংশ উন্নয়ন করলেও এই অংশটি যেন সময়ের বাইরে রয়ে গেছে।
সম্প্রতি দেশে গিয়ে আবারও সেই পথ দিয়ে হেঁটেছি। সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তা কর্দমাক্ত হয়ে পড়ে। রিকশা, অটোরিকশা ও পথচারীদের চলাচল দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। স্কুলগামী শিক্ষার্থীরা কাদা মাড়িয়ে বিদ্যালয়ে যায়। বৃদ্ধ মানুষ, রোগী, কৃষক ও ব্যবসায়ীরা প্রতিনিয়ত ভোগান্তির শিকার হন।
স্থানীয়দের ভাষায়, এটি শুধু একটি রাস্তার সমস্যা নয়; এটি দীর্ঘদিনের অবহেলার প্রতীক। প্রায়ই ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটে। অথচ ব্যস্ত এই সড়কের মাত্র ৬০ মিটার অংশ পাকা করতে ২৩ বছর সময় লেগে যাচ্ছে।
প্রবাসে থেকে প্রতিদিন আধুনিক সড়ক ও উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা দেখি। কিন্তু নিজের গ্রামের মানুষের এই দুর্ভোগ দেখলে মন খারাপ হয়ে যায়। মনে প্রশ্ন জাগে—উন্নয়নের এই যুগে মাত্র ৬০ মিটার রাস্তা কি পাকা করা এতটাই কঠিন?
এই পথ শুধু একটি রাস্তা নয়। এটি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের পথ, কৃষকের জীবিকার পথ, রোগীর চিকিৎসার পথ এবং হাজারো মানুষের দৈনন্দিন চলাচলের পথ। তাই গুয়াখোলার সন্তান হিসেবে, বাসাইল উচ্চ বিদ্যালয়ের একজন সাবেক শিক্ষার্থী হিসেবে এবং একজন প্রবাসী বাংলাদেশি হিসেবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আমার বিনীত আবেদন—দীর্ঘদিনের এই অবহেলার অবসান ঘটান।
মাত্র ৬০ মিটার রাস্তা পাকা করে হাজারো মানুষের কষ্ট লাঘব করা সম্ভব। আমি বিশ্বাস করি, সদিচ্ছা থাকলে এই সমস্যার সমাধান খুবই সহজ।
আগামীবার দেশে ফিরে এসে যেন দেখতে পাই, গুয়াখোলার সেই ৬০ মিটার আর অবহেলার প্রতীক নয়; বরং মানুষের প্রত্যাশা পূরণের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। জন্মভূমির মানুষের মুখে হাসি ফোটানোই হোক উন্নয়নের প্রকৃত অর্থ।
আজকালের খবর/ এমকে