বুধবার ১৭ জুন ২০২৬
বাজেটে প্রতিরক্ষা ও কৃষি খাতে বরাদ্দ বাড়ানো উচিত: ড. মিজানুর রহমান
প্রকাশ: বুধবার, ১৭ জুন, ২০২৬, ৭:০৩ পিএম   (ভিজিট : ৩)
দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কৃষিখাতে যথাযথ বাজেট বরাদ্দ হয়নি বলে মনে করেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষক এবং সেন্ট্রাল ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড পিচ স্ট্যাডিজের নির্বাহী পরিচালক ড. মো. মিজানুর রহমান। তার মতে, বর্তমান প্রতিরক্ষা নীতি এবং সামরিক বাজেট অপ্রতুল। আর কৃষিখাত বাজেটে অনেকটা উপেক্ষিত হয়েছে। এই খাতে আরো বেশি গুরুত্ব দেয়া উচিত। 

বুধবার (১৭ জুন)  রাজধানীর পল্টন টাওয়ারে অবস্থিত ইআরএফ অডিটোরিয়ামে ওয়ান ইনিশিয়েটিভ রিসার্চ এন্ড ডেভলপমেন্ট (ওআইআরডি) কর্তৃক আয়োজিত ‘প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট: উন্নয়ন ও রাজনৈতিক অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ’ শীর্ষক জাতীয় সেমিনারে আলোচক হিসেবে তিনি এমন বক্তব্য দেন। 

সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন ওআইআরডির চেয়ারম্যান এবং মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উপচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আব্দুর রব। 

ড. মো. মিজানুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতি ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল। স্বাধীনতার পর থেকে আমাদের সামরিক ও প্রতিরক্ষা নীতি অনেকটা ভারতকেন্দ্রিক হয়ে আছে, যা শক্তির পরিবর্তে পরনির্ভরশীলতা তৈরি করেছে। তিনি বলেন, বর্তমান বাজেটে সামরিক খাতের জন্য ৪০ থেকে ৪২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হলেও এর সিংহভাগই ব্যয় হয় বেতন-ভাতা ও প্রশাসনিক কাজে। প্রকৃত সামরিক সরঞ্জামের জন্য বরাদ্দ থাকে মাত্র ১ থেকে ২ হাজার কোটি টাকা, যা দিয়ে একটি আধুনিক এয়ারক্রাফট কেনাও সম্ভব নয়। তবে সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে চীন, তুরস্ক ও পাকিস্তানের কাছ থেকে ড্রোন ও এয়ারক্রাফট সংগ্রহের জন্য ২৭ হাজার কোটি টাকার বিশেষ বাজেট আলোচনার বিষয়টিকে তিনি একটি ইতিবাচক দিক হিসেবে উল্লেখন করেন। পাশাপাশি বাজেটে সামরিক বরাদ্দ আরো বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে আহ্বান জানান এই বিশ্লেষক।

ড. মো. মিজানুর রহমান বাজেটে কৃষি খাতের বরাদ্দ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, প্রতি বছর বাজেটে কৃষিখাতে মাত্র ৫ থেকে ৬ শতাংশ বরাদ্দ রাখা হয়। বর্তমান সরকার মুখে কৃষি খাতে বরাদ্দ বাড়ানো কথা বললেও বস্তুতপক্ষে সার্বিক বাজেট গ্রোথের সঙ্গে এই খুবই সামান্য বাড়ানো হয়েছে। এ বছর জাতীয় বাজেট ১৭-১৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেলেও কৃষিখাতে বরাদ্দ বেড়েছে মাত্র ৬ শতাংশ, যা মূলত কৃষকদের ঠকানোর শামিল। তিনি আরও অভিযোগ করেন, কৃষিখাতে ১৭-১৮ হাজার কোটি টাকার যে ভতুর্কি দেওয়া হয়, তার বড় একটি অংশই মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে চলে যায়। সাধারণ কৃষকরা এই সুবিধার খুবই সামান্য পায়। এক্ষেত্রে অমূল পরিবর্তন আনতে হবে।

ব্যক্তিগত করমুক্ত আয়সীমা সমালোচনা করে বিশ্লেষক বলেন, ব্যক্তিগত আয়কর সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৩ লাখ ৭৫ লাখ টাকা করা হয়েছে, যার মাধ্যমে জনগণের সাথে প্রতারণা করা হয়েছে। তার মতে, মুদ্রাস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে, ফলে এই বৃদ্ধি কোনো কাজে আসছে না। উপরন্তু, ট্যাক্স স্ল্যাব বা ধাপ পরিবর্তনের মাধ্যমে করের পরিমাণ বাড়ানো হয়েছে। আগের হিসেবে ৫ লক্ষ টাকা আয়ের বিপরীতে যেখানে ১০ হাজার টাকা কর দিতে হতো, নতুন নিয়মে সেখানে ১২ হাজার ৫০০ টাকা কর দিতে হচ্ছে।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ম্যানেজমেন্টের (বিআইজিএম) সহযোগী অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ ড. জুবায়ের আহমেদ। তিনি বলেন, প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রাগুলো দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সাথে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। প্রধানত প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি এবং রাজস্ব আদায়ের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা অর্জনে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনার চেয়ে ‘রাজনৈতিক সদিচ্ছা’ বা ‘উচ্চাভিলাষের’ প্রতিফলনই বেশি দেখা যাচ্ছে।

এই অর্থনীতিবিদ বলেন, বর্তমানে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৪ দশমিক ১৪ শতাংশ হলেও আগামী অর্থবছরের জন্য লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। এক বছরের ব্যবধানে এই ২ দশমিক ৩৬ শতাংশ অতিরিক্ত প্রবৃদ্ধি অর্জন বিশাল চ্যালেঞ্জ এবং উচ্চাভিলাষী। একইভাবে, সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) জিডিপির ২ দশমিক ৭ শতাংশ অর্জনের লক্ষ্য রাখা হয়েছে, যেখানে ঐতিহাসিকভাবে এটি সব সময় ১ শতাংশের নিচেই অবস্থান করে। এছাড়া বর্তমানে মূল্যস্ফীতি যেখানে ১০ শতাংশের কাছাকাছি, সেখানে বাজেটে এটি ৭ দশমিক ৫০ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এই লক্ষ্যটিও অর্জন সম্ভব হবে না। তিনি বলেন, একদিকে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যাপক বরাদ্দ, অন্যদিকে ব্যাংক খাতের জন্য ৪০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ এবং নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন অর্থনীতিতে মুদ্রার প্রবাহ বাড়িয়ে দেবে। এই বাড়তি অর্থপ্রবাহের মধ্যে মূল্যস্ফীতি কমানো মোটেও সহজ হবে না।

ড. জুবায়ের আহমেদ আরো বলেন, এনবিআরের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা গত বছরের তুলনায় প্রায় ৪৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। তবে প্রতিবছরই লক্ষ্যমাত্রা ও আদায়ের মধ্যে গ্যাপ বা ব্যবধান বাড়ছে। এনবিআরের বর্তমান সক্ষমতা, ডিজিটাল ব্যবস্থার অভাব এবং করের আওতা বাড়ানোর সীমাবদ্ধতার কারণে এক বছরের মধ্যে এই বিশাল লক্ষ্যমাত্রা অর্জন বাস্তবসম্মত নয়।

তিনি বলেন, সরকার অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ কমানোর দাবি করলেও ঘাটতি পূরণে বৈদেশিক উৎসের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নের জন্য এই ব্যয়বহুল বৈদেশিক ঋণ শেষ পর্যন্ত বিদেশের প্রতি নির্ভরতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণের ফলে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ কমে যাওয়ার বা ‘ক্রাউডিং আউট ইফেক্ট’ তৈরির আশঙ্কাও রয়েছে। এই বিশ্লেষক বলেন, উন্নয়নের অগ্রাধিকার ও রাজনৈতিক অর্থনীতি এবারের বাজেটে ভৌত অবকাঠামোর চেয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের মতো ‘সফট ইনফ্রাস্ট্রাকচার’ বা জনকল্যাণমূলক খাতে গুরুত্ব বেশি দেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক অর্থনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে এই বাজেট মূলত ভোটার বা নাগরিকদের সন্তুষ্ট করার একটি প্রবণতা এবং এটি মূলত একটি ‘সিটিজেন সেন্ট্রিক’ বা নাগরিক-কেন্দ্রিক বাজেট হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে। নীতি নির্ধাকরদের প্রতি পরমর্শ দিয়ে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, এনবিআরের সক্ষমতার সাথে মিল রেখে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা, ভৌত অবকাঠামো এবং সামাজিক খাতের বিনিয়োগের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়কে বরাদ্দকৃত অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা।

আজকালের খবর/বিএস 








আরও খবর


Advertisement
Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রাপা প্লাজা( ৭ম তলা), রোড-২৭ (পুরাতন) ১৬ (নতুন), ধানমন্ডি, ঢাকা -১২০৯।
ফোন: ৪১০২১৯১৫-৬, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor$gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor$gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রাপা প্লাজা( ৭ম তলা), রোড-২৭ (পুরাতন) ১৬ (নতুন), ধানমন্ডি, ঢাকা -১২০৯।
ফোন: ৪১০২১৯১৫-৬, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor$gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor$gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft