হাসপাতালে ছয় নবজাতক মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষমা চেয়েছেন আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ডা. শেখ মহিউদ্দিন। এছাড়াও হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলকে ‘ফাঁসি হওয়ার’ সঙ্গে তুলনা করেছেন তিনি।
সোমবার (১৫ জুন) রাজধানীর মগবাজারে আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক ডা. শেখ মহিউদ্দিন।
তিনি বলেন, আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত এ কষ্ট পাওয়ার জন্য। আমি আপনাদের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী। আপনারা জানেন আমাদের লাইসেন্স বাতিল হয়েছে। আমি বলি লাইসেন্স বাতিল হয়েছে এটা আমার ফাঁসি হয়ে গেছে, আমার হাসপাতালের ফাঁসি। এটাকে সম্মান জানাই।
তিনি আরও বলেন, মন্ত্রী মহোদয় বলেছেন এর মাধ্যমে অন্য মেডিকেল কলেজগুলোকে শিক্ষা দিয়েছেন। অন্য মেডিকেল কলেজগুলো যদি পরিবর্তন করা যায় এ নিয়ে আমার কষ্ট নেই।
এদিকে লাইসেন্স বাঁচাতে কোটি কোটি টাকা নিয়ে মন্ত্রীর পেছনে ঘোরার অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও অসত্য। মন্ত্রীকে ঘুষের বিষয়ে আদ্-দ্বীন ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক বলেন, আমি এ ব্যাপারে কথা বলব না, মন্ত্রী মহোদয়ই বলবেন।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি উত্তর দিতে চাই না। মন্ত্রী সাহেবকে জিজ্ঞেস করেন এই প্রুফটা উনাকে দেখাতে। আমি এর উত্তর দেব না, মন্ত্রীকে প্রুফ করতে হবে। আমি কেন টাকা নিয়ে ঘুরব? আমার টাকা নিয়ে ঘুরার দরকার নেই।
এর আগে গত ১৩ জুন নরসিংদীর মনোহরদীতে এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, সরকারি সুবিধা পেতে এখন আর কাউকে ঘুষ দিতে হয় না। আদ্-দ্বীন হাসপাতাল কোটি কোটি টাকা নিয়ে তার পেছনে ঘুরেছে, কিন্তু তিনি হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিল করে দিয়েছেন। একই অনুষ্ঠানে তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী তাকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছেন।
সংবাদ সম্মেলনে ডা. শেখ মহিউদ্দিন আরও বলেন, হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে যে রিট করা হয়েছে, তার সঙ্গে আদ্-দ্বীন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। একজন আইনজীবী ব্যক্তিগত উদ্যোগে ওই রিট করেছেন।
ছয় নবজাতকের মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখনো নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না কী কারণে শিশুদের মৃত্যু হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তদন্ত প্রতিবেদনেও মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করা হয়নি। এছাড়া মৃত শিশুদের ময়নাতদন্তও করা হয়নি।
তিনি জানান, তদন্ত প্রতিবেদনে যেসব সীমাবদ্ধতার কথা বলা হয়েছে, সেগুলো দূর করতে ইতোমধ্যে সংস্কার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে হাসপাতালের বিভিন্ন ইউনিটে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা হচ্ছে। হাসপাতালের জন্য কার্বন ডাই-অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড ও অক্সিজেন পরিমাপের আধুনিক যন্ত্র কেনা হয়েছে এবং প্রতিটি কক্ষ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে।
ডা. মহিউদ্দিন বলেন, পরামর্শক দলের সদস্য হিসেবে একজন বুয়েট প্রকৌশলী, একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার ও একজন কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার কাজ করছেন। তাদের পর্যবেক্ষণে মূল উদ্বেগের বিষয় ছিল ভেন্টিলেশন ব্যবস্থা এবং কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা। তবে সাম্প্রতিক পরীক্ষায় কোনো কক্ষেই উল্লেখযোগ্য বিচ্যুতি পাওয়া যায়নি।
তার মতে, হাসপাতালের ভেতরে কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা বাইরের পরিবেশের তুলনায় কিছুটা বেশি পাওয়া গেলেও তা গ্রহণযোগ্য সীমার মধ্যেই রয়েছে। তারপরও রোগীদের স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করতে কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা আরও কমিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী বিভিন্ন কক্ষে পজিটিভ এয়ার প্রেসার ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে, যাতে দ্রুত কার্বন ডাই-অক্সাইড বের হয়ে যেতে পারে। ইতোমধ্যে শিশু ওয়ার্ডসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে এ কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
হাসপাতালের একটি সিলগালা করা ওয়ার্ডের বিষয়ে তিনি জানান, ওই অংশের চাবি চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। চাবি পাওয়া গেলে সেখানে সংস্কার কার্যক্রমও দ্রুত শুরু করা হবে। সব মিলিয়ে এক সপ্তাহের মধ্যেই প্রয়োজনীয় সংস্কার কাজ শেষ করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে হাসপাতালের ওপরের তলায় থাকা বেকারি নিয়েও কথা বলেন ডা. শেখ মহিউদ্দিন। তিনি জানান, বেকারিটির লাইসেন্স সংক্রান্ত কোনো জটিলতা ছিল না। তবে সরকারের আপত্তির কারণে আপাতত কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়েছে। সেখানে কর্মরত প্রায় ৭০০ থেকে ৮০০ শ্রমিকের পুনর্বাসনের চেষ্টা চলছে এবং বেকারিটি অন্যত্র স্থানান্তরের প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে।
বর্তমানে হাসপাতালে প্রায় ৬০ জন সংকটাপন্ন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাদের তাৎক্ষণিকভাবে অন্যত্র স্থানান্তর করা সম্ভব নয়।
সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিলের বিষয়ে তিনি জানান, আইন অনুযায়ী ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করা হবে। এ সংক্রান্ত আবেদনপত্র ইতোমধ্যে প্রস্তুত করা হয়েছে এবং শিগগিরই তা জমা দেওয়া হবে।
নবজাতকদের মৃত্যুর কারণ নিয়ে তিনি আরও বলেন, সরকারি প্রতিবেদনে ভেন্টিলেশনের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়নে বর্তমানে যে মাত্রার গ্যাস পাওয়া গেছে, তা সরাসরি শিশু মৃত্যুর কারণ হওয়ার মতো নয়। তবুও নবজাতকেরা অক্সিজেনের মাত্রা কমে যাওয়া বা কার্বন ডাই-অক্সাইড বেড়ে যাওয়ার মতো পরিবর্তনের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সরকারের পক্ষ থেকে কোনো আশ্বাস পাওয়া গেছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের আশ্বাস দেওয়া হয়নি। তবে সমস্যাগুলো সমাধান করা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব এবং সে লক্ষ্যেই কাজ চলছে।
আজকালের খবর/বিএস