মালয়েশিয়ায় কর্মসংস্থানের জন্য নেপালি শ্রমিকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা আবারও বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে একচেটিয়া ব্যবসা ও অতিরিক্ত ফি আদায়ের অভিযোগে সমালোচিত এই ব্যবস্থার সংস্কার প্রক্রিয়ার মধ্যেই নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে মালয়েশিয়ার কাঠমান্ডুস্থ দূতাবাসের একটি নোটিশকে ঘিরে।
গত ১৮ মে দূতাবাসের সরকারি ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ওই নোটিশে বলা হয়, নেপালের মাত্র ৩৬টি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ‘বায়োমেডিক্যাল সিস্টেম’ (বিএমএস) এর আওতায় মালয়েশিয়াগামী শ্রমিকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা পরিচালনার অনুমোদন পেয়েছে। একই সঙ্গে প্রত্যেক শ্রমিকের কাছ থেকে অতিরিক্ত ৩,০০০ নেপালি রুপি (প্রায় ১০০ রিঙ্গিত) সার্ভিস ফি আদায়ের কথাও উল্লেখ করা হয়।
তবে কয়েকদিন পর কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই নোটিশটি সরিয়ে নেওয়া হয়। বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর মালয়েশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় স্বীকার করেছে যে নোটিশটিতে “ভুল তথ্য” ছিল এবং এ জন্য তারা দুঃখ প্রকাশ করেছে।
মন্ত্রণালয় জানায়, বিদেশে মালয়েশিয়ার দূতাবাসগুলো কেবল যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। শ্রমিক নিয়োগ, স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারণের দায়িত্ব সম্পূর্ণভাবে মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে।
নোটিশে মালয়েশিয়ার প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান Bestinet Sdn Bhd-সহ দুটি কোম্পানিকে বিএমএস পরিচালনা, ফি সংগ্রহ ও অর্থ ব্যবস্থাপনার অনুমোদিত সংস্থা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানগুলোর কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে নেপালের শ্রম, কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র পিতাম্বর ঘিমিরে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে বলেন, অতীতে অল্প কয়েকটি বেসরকারি মেডিকেল সেন্টারের মাধ্যমে স্বাস্থ্য পরীক্ষা পরিচালিত হওয়ায় পুরো ব্যবস্থাটি “বাণিজ্যিক কার্টেল” হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল।
তার ভাষায়, “এই ব্যবস্থায় অতিরিক্ত ফি আদায়, প্রতিযোগিতার অভাবে সেবার মান হ্রাস এবং শ্রমিকদের অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়ার অভিযোগ ছিল।”
তিনি জানান, বর্তমানে নেপাল সরকার স্বীকৃত সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোর স্বাস্থ্য পরীক্ষার রিপোর্ট গ্রহণের সুযোগ চালু করেছে, যাতে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পায় এবং শ্রমিকরা সুবিধা পান।
বিএমএস হলো মালয়েশিয়ায় প্রবেশের আগে বিদেশি শ্রমিকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষার তথ্য ব্যবস্থাপনার একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম। ২০১৩ সালে বেস্টিনেট এটি চালু করে এবং ২০১৫ সাল থেকে এটি বাধ্যতামূলক করা হয়। ২০১৭ সালে মালয়েশিয়া সরকার বেস্টিনেটের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক চুক্তি করে, যার আওতায় কোম্পানিটি প্রতিটি আবেদন থেকে ১০০ রিঙ্গিত ফি সংগ্রহের একচ্ছত্র অধিকার পায়।
চুক্তির মেয়াদ ২০২২ সালে শেষ হলেও পরে অভিযোগ ওঠে যে বিএমএস-সংক্রান্ত ফি আদায় অব্যাহত ছিল।
নেপাল সরকারের একটি উচ্চপদস্থ সূত্র মালয়েশিয়াকিনিকে জানায়, দূতাবাসের নোটিশ দেখে অনেকেই মনে করেছেন এটি বহু বছর ধরে চলা একটি বিতর্কিত কার্টেল ব্যবস্থাকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা।
অন্যদিকে অনুসন্ধানী সাংবাদিক অনিল অধিকারী দাবি করেন, নেপালি শ্রমিকদের কাছ থেকে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য প্রায় ৯,৮০০ নেপালি রুপি (প্রায় ৩৩৫ রিঙ্গিত) নেওয়া হয়, যার একটি বড় অংশ প্রকৃত চিকিৎসা ব্যয়ের বাইরে চলে যায়।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, শ্রম চুক্তি অনুযায়ী নিয়োগকর্তার খরচ বহনের কথা থাকলেও ৯০ শতাংশের বেশি শ্রমিককে নিজেদের পকেট থেকেই এই ব্যয় মেটাতে হয়। অনেক শ্রমিক নেপালে স্বাস্থ্য পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরও মালয়েশিয়ায় এসে পুনরায় পরীক্ষায় অকৃতকার্য ঘোষিত হয়ে দেশে ফেরত যেতে বাধ্য হয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
নেপালে শ্রমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার প্রক্রিয়া চলমান থাকলেও দূতাবাসের বিতর্কিত নোটিশ নতুন করে এই খাতের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
আজকালের খবর/ এমকে