টেলিটকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুরুল মাবুদ চৌধুরী বলেছেন, নতুন পাওয়া স্পেকট্রামকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রায়ত্ত মোবাইল অপারেট-টেলিটকের ব্যাপক পরিকল্পনা রয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে আরও উন্নত নেটওয়ার্ক উপস্থাপন করা সম্ভব আশাও তার রয়েছে।
তিনি জানান, মন্ত্রী ও উপদেষ্টা টেলিটককে পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা জমা দিতে বলেছেন। প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে তা জমা দিয়েছে।
টেলিটক এমডি আরও বলেন, ‘সবকিছু ঠিকভাবে এগোলে এবং প্রয়োজনীয় ন্যূনতম বিনিয়োগ পেলে আমাদের নেটওয়ার্ক বর্তমান অবস্থার চেয়ে অনেক ভালো হবে।’
দেশব্যাপী নেটওয়ার্ক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সেবার পরিধি উন্নত করার লক্ষ্যে সরকারের স্পেকট্রাম বণ্টন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ৭০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ড বরাদ্দ দেওয়া হয়।
এ প্রক্রিয়ায় গ্রামীণফোন ৭০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডে ১০ মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম পায়। তবে ওই সময়ে রবি ও বাংলালিংক এ ব্যান্ডের স্পেকট্রাম নিতে আগ্রহ দেখায়নি। পরে একই ব্যান্ডে টেলিটককে আরও ১০ মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম বরাদ্দ দেওয়া হয়।
লো-ব্যান্ড ৭০০ মেগাহার্টজ স্পেকট্রামকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়। কারণ তুলনামূলক কম নেটওয়ার্ক স্থাপনায় এটি বৃহত্তর ভৌগোলিক এলাকা কভার করতে পারে। বিশেষত দূরবর্তী, গ্রামীণ ও অনগ্রসর এলাকায় বিস্তৃত নেটওয়ার্ক কভারেজ ও ভবনের ভেতরে উন্নত সংযোগ নিশ্চিত করতে এটি কার্যকর।
স্পেকট্রাম ইস্যুতে নুরুল মাবুদ চৌধুরী বলেন, অনেকে দাবি করেন টেলিটক বিনামূল্যে স্পেকট্রাম পেয়েছে। আবার গণমাধ্যমে প্রায়ই বলা হয়, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) কাছে টেলিটকের ৫ হাজার কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘টেলিটক তো সরকারি অপারেটর; তাই এই প্রতিষ্ঠানের অর্থায়ন তো সরকারই করবে।’
টেলিটকের এমডি বলেন, অন্যান্য অপারেটরের মতো টেলিটকের কাছেও ৯৫ মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম রয়েছে। তবে সেগুলো বিভিন্ন সেক্টরে ছড়িয়ে আছে। এগুলো পুনর্বিন্যাস করা হবে।
তিনি বলেন, বিটিআরসি ইতোমধ্যে ৮০০ মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম বিক্রির পরিকল্পনা করেছে এবং টেলিটককে ৯০০ মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম পুনর্বিন্যাসে কাজ করতে বলেছে। টেলিটক তা করবে।
নুরুল মাবুদ চৌধুরী বলেন, অন্যান্য অপারেটরের কাছে ১৮০০ ও ২১০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডে আরও বেশি ফ্রিকোয়েন্সি রয়েছে। এছাড়া সর্বশেষ নিলামে বরাদ্দ হওয়া ২৩০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডের একটি অংশ অব্যবহৃত পড়ে রয়েছে। যেকোনো অপারেটর চাইলে তা নিতে পারে।
তিনি বলেন, ‘আমরা না নিলে এটি অব্যবহৃতই পড়ে থাকত।’
তিনি আরও বলেন, সরকার প্রথমে নিলামের মাধ্যমে স্পেকট্রাম বরাদ্দ দেয়। পরে অবিক্রীত অংশ টেলিটককে দেওয়া হয়। ফলে প্রতিষ্ঠানটি একসঙ্গে সব ফ্রিকোয়েন্সি পায়নি।
বর্তমানে টেলিটকের গ্রাহক সংখ্যা ৬৮ লাখ। অন্যদিকে বাজারে শীর্ষ অবস্থানে থাকা গ্রামীণফোনের গ্রাহক ৮ কোটি ৪৪ লাখ। রবি’র ৫ কোটি ৭৩ লাখ এবং বাংলালিংকের ৩ কোটি ৭৩ লাখ গ্রাহক রয়েছে।
নুরুল মাবুদ বলেন, টেলিটকই একমাত্র সরকারি অপারেটর যাকে বিশ্বমানের টেলিকম জায়ান্টদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকতে হচ্ছে।
টেলিটকের কার্যক্রম নিয়ে সমালোচনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ২০০৫ সালে যাত্রা শুরুর পর জনগণের ব্যাপক আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও কেনো টেলিটকের ব্যবহার বাড়েনি-এমন প্রশ্ন অনেকেই তোলেন।
দীর্ঘ কর্মজীবনে খাতটির অনেক পরিবর্তন দেখেছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, মোবাইল খাত বিকশিত হওয়ার আগে দেশে সিটিসেল কার্যক্রম চালালেও তা ছিল ব্যয়বহুল এবং সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।
তিনি বলেন, মূলত ১৯৯৬ সালে তিনটি অপারেটরের মাধ্যমে দেশে মোবাইল নেটওয়ার্কের মূল যাত্রা শুরু হয়।
টেলিটক নিয়ে সমালোচনার জবাবে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান বলেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানকে বাদ রেখে কেবল বেসরকারি খাতকে লাইসেন্স বিশ্বের কোনো দেশে মোবাইল টেলিযোগাযোগ খাতের যাত্রা শুরু হয়েছে বলে জানা নেই।
তিনি আরও বলেন, ‘অনেক প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে আমরা প্রায় ১০ বছর পরে কার্যক্রম শুরু করেছি। ততদিনে বেসরকারি অপারেটররা বড় পরিসরে ব্যবসা সম্প্রসারণ করে জায়ান্টে পরিণত হয়েছে।’
টেলিটকের বাজার অংশীদারিত্ব কম হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি রাখার প্রয়োজনীয়তা নিয়েও অনেকে প্রশ্ন তোলেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। ২০০৫ সালে টেলিটককে ঘিরে কেনো এত উচ্ছ্বাস তৈরি হয়েছিল, সেটির কারণ সবার বিবেচনা করা উচিত বলেও মনে করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘যদি মোবাইল অপারেটরগুলো সঠিকভাবে কাজ করত, মানুষ সহজে সিম পেত, কলরেট সাশ্রয়ী থাকত এবং নেটওয়ার্কের মান ভালো থাকত, তাহলে টেলিটক নিয়ে এত উন্মাদনা তৈরি হতো না।’
তিনি বলেন, এখনও দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে টেলিটকের নেটওয়ার্ক কাভারেজ চেয়ে আবেদন, ই-মেইল ও ফোন কল পান। এতে বোঝা যায়, অন্যান্য অপারেটর থাকা সত্ত্বেও কোথাও না কোথাও ঘাটতি রয়েছে।
টেলিটকের এমডি বলেন, হাওর এলাকা, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সুন্দরবন অঞ্চলে এখনও স্পেকট্রামের ঘাটতি রয়েছে। ব্যবসায়িক সম্ভাবনা না থাকলেও নেটওয়ার্কের বাইরে থাকা এসব এলাকায় সবার আগে সংযোগ পৌঁছে দেয় টেলিটক।
তিনি বলেন, এখন ওইসব এলাকায় চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং অন্য অপারেটররাও সেখানে প্রবেশ করছে। কিন্তু টেলিটক এখন সেখানে ফ্রিকোয়েন্সি সংকটে পড়ছে।
তিনি বলেন, ‘প্রযুক্তিগতভাবে আমাদের পিআরবি ব্যবহার এত বেশি যে স্পেকট্রাম সংকটের কারণে আমরা ঠিকভাবে সেবা দিতে পারছি না। এজন্য আমরা সেখানে ২৩০০ মেগাহার্টজ ব্যবহারের চেষ্টা করছি।’
ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথের চ্যালেঞ্জ ইস্যুতে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের ওপর অতিনির্ভরতা কমিয়ে স্থানীয় ব্যান্ডউইডথের ব্যবহার বাড়ানোর পরামর্শ দেন নুরুল মাবুদ।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বড় প্রতিষ্ঠানগুলো যদি ভারতের মতো বাংলাদেশেও তাদের সার্ভার স্থাপন করে, তাহলে স্থানীয় ব্যান্ডউইথ আরও বেশি ব্যবহৃত হবে এবং আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের ওপর চাপ কমবে।
টেলিটকের পরিচালন ব্যয়ে সরকার কোনো ভর্তুকি দেয় না বলেও স্পষ্ট জানান তিনি। তার ভাষ্য, টেলিটক নিজের আয় দিয়েই পরিচালন খরচ মেটায়।
তিনি বলেন, চলমান প্রকল্প বাদ দিলেও টেলিটকে মোট বিনিয়োগ প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে টেলিটকের নিজস্ব বিনিয়োগ ১ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ বাকী প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে সরকার।
প্রতিদ্বন্দ্বী অপারেটরগুলোর বিনিয়োগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বড় অপারেটরগুলো ৬০ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করেছে। সেই হিসাবে বিনিয়োগের তুলনায় টেলিটকের বাজার অংশীদারিত্ব খারাপ নয়।
সেবার মান নিয়ে তিনি বলেন, অপারেটররা কতটুকু ক্লিন স্পেকট্রাম পাচ্ছে, তার ওপর মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করা নির্ভর করে।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে সিগন্যাল-টু-নয়েজ রেশিওতে নয়েজের মাত্রা অনেক বেশি। এটি নিয়ন্ত্রণ করে উন্নত পর্যায়ে নেওয়া না গেলে সব চেষ্টা সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত সেবার মান নিশ্চিত করা সম্ভব হবে না।’
বিদ্যুৎ সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অপারেটরগুলোকে জেনারেটর, সৌরবিদ্যুৎ ও বড় ব্যাটারি ব্যাকআপ ব্যবস্থার মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত রাখতে বিটিএস অবকাঠামো স্থাপনের প্রায় সমপরিমাণ বিনিয়োগ করতে হয়।
তিনি বলেন, ‘আমাদের দুর্ভাগ্য, মানসম্মত বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়ার কথা থাকলেও পাইনি। পেলে মানসম্মত সেবা দিতে পারতাম।’
টেলিটক এমডি আরও বলেন, বিটিআরসি এখন সেবার মান আরও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। এই প্রয়োজনীয় উদ্যোগটি ভবিষ্যতে আরও জোরদার করা উচিত।
আজকালের খবর/ এমকে