বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের জন্য বহুল আলোচিত ‘প্রবাসী কার্ড’ নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা প্রবাসীদের মধ্যে। বিশেষ করে মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ইতালি, যুক্তরাজ্য ও দক্ষিণ কোরিয়ায় কর্মরত বাংলাদেশিরা জানতে চাইছেন কারা আগে এই কার্ড পাবেন এবং এতে কী ধরনের সুবিধা মিলবে।
বাংলাদেশ সরকার প্রবাসীদের জন্য দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত এই বিশেষ পরিচয়পত্র চালুর উদ্যোগ নেওয়ায় ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, প্রবাসী সংগঠন ও বিভিন্ন কমিউনিটিতে আলোচনা শুরু হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রবাসীদের তথ্যভাণ্ডার তৈরি, সরকারি সেবা সহজ করা এবং দেশে বিনিয়োগে উৎসাহ দিতেই মূলত এই কার্ড চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রাথমিকভাবে বৈধভাবে বিদেশে কর্মরত এবং সরকার অনুমোদিত উপায়ে রেমিট্যান্স পাঠানো বাংলাদেশিরাই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এই কার্ড পাবেন বলে জানা গেছে। বিশেষ করে যেসব প্রবাসীর বৈধ পাসপোর্ট, কর্ম অনুমতি এবং নিবন্ধিত তথ্য রয়েছে, তাদের তথ্য যাচাই শেষে পর্যায়ক্রমে কার্ড বিতরণ করা হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রথম ধাপে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শ্রমঘন দেশগুলোতে কর্মরত বাংলাদেশিদের অন্তর্ভুক্ত করা হতে পারে। কারণ এসব দেশ থেকেই বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স আসে।
এছাড়া দক্ষ কর্মী, পেশাজীবী, শিক্ষার্থী এবং দীর্ঘমেয়াদে বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশিদেরও পরবর্তী ধাপে এই সুবিধার আওতায় আনা হবে বলে আলোচনা চলছে।
প্রবাসী কার্ডে থাকবে আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তিনির্ভর পরিচয় ব্যবস্থা। এতে কার্ডধারীর নাম, পাসপোর্ট নম্বর, এনআইডি নম্বর, বিদেশে অবস্থানের তথ্য, কর্মক্ষেত্র এবং জরুরি যোগাযোগের তথ্য সংরক্ষিত থাকবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ভবিষ্যতে এই কার্ডের সঙ্গে অনলাইন ডাটাবেইস সংযুক্ত করা হলে বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের তথ্য ব্যবস্থাপনা আরও সহজ হবে। একই সঙ্গে জরুরি পরিস্থিতিতে দূতাবাস বা সরকারের পক্ষ থেকেও দ্রুত সহায়তা প্রদান সম্ভব হবে।
প্রবাসী কার্ডধারীরা দেশে এবং বিদেশে বিভিন্ন ধরনের বিশেষ সুবিধা পাবেন বলে জানানো হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো, বিমানবন্দর সেবায় বিশেষ সহায়তা, ব্যাংকিং ও রেমিট্যান্স সেবায় অগ্রাধিকার, বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক সুযোগে সহায়তা, সরকারি বিভিন্ন সেবায় দ্রুততা, প্রশিক্ষণ ও কল্যাণমূলক সুবিধা, জরুরি সহায়তা ও আইনি সহযোগিতা, দেশে ফেরার পর পুনর্বাসন সুবিধা।
এছাড়া ভবিষ্যতে প্রবাসীদের জন্য আলাদা লাউঞ্জ, স্বাস্থ্যসেবা, বীমা সুবিধা এবং সন্তানদের শিক্ষাবিষয়ক সহায়তার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে বলে জানা গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রবাসী কার্ড শুধু একটি পরিচয়পত্র নয়; এটি হবে দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা প্রবাসীদের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি। প্রতিবছর প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
মালয়েশিয়ায় কর্মরত বাংলাদেশি প্রবাসী মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, আমরা অনেক বছর ধরে দেশের জন্য কাজ করছি। সরকার যদি আমাদের জন্য আলাদা পরিচয় ও সুযোগ-সুবিধা দেয়, তাহলে সেটা অবশ্যই ভালো উদ্যোগ হবে।
আরেক প্রবাসী শরীফুল ইসলাম জানান, প্রবাসীরা বিভিন্ন সময়ে নানা সমস্যার মুখোমুখি হন। যদি এই কার্ডের মাধ্যমে দূতাবাস ও সরকারি সেবা দ্রুত পাওয়া যায়, তাহলে অনেক উপকার হবে।
জানা গেছে, প্রবাসী কার্ডের আবেদন প্রক্রিয়া অনলাইনভিত্তিক করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রবাসীরা নির্ধারিত ওয়েবসাইট বা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে আবেদন করতে পারবেন। আবেদন যাচাই শেষে সংশ্লিষ্ট দূতাবাস বা নির্ধারিত কেন্দ্র থেকে কার্ড সরবরাহ করা হতে পারে।
এ ক্ষেত্রে প্রবাসীদের বৈধ কাগজপত্র, পাসপোর্ট, কর্মসংস্থানের তথ্য এবং রেমিট্যান্স সংক্রান্ত তথ্য যাচাই করা হবে বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট মহল বলছে, প্রবাসীদের কল্যাণে সরকার সাম্প্রতিক সময়ে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তারই ধারাবাহিকতায় প্রবাসী কার্ড চালু হলে বিদেশে থাকা বাংলাদেশিদের সঙ্গে সরকারের যোগাযোগ আরও শক্তিশালী হবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে প্রবাসীদের তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থাপনা সহজ হবে, বাড়বে বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানোর প্রবণতা এবং দেশের অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সবমিলিয়ে, বহুল প্রত্যাশিত প্রবাসী কার্ড এখন প্রবাসীদের আলোচনার কেন্দ্রে। কবে থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কার্ড বিতরণ শুরু হবে এবং ঘোষিত সুবিধাগুলো কত দ্রুত বাস্তবায়ন হবে সেদিকেই এখন তাকিয়ে আছেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকা লাখো বাংলাদেশি প্রবাসী।
আজকাালের খবর/ এমকে