
চলচ্চিত্রের বিভিন্ন মহলের দাবির প্রেক্ষিতে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় ই-টিকেটিং এবং সার্ভার বসানো জন্য উদ্যোগ করছে। ইতিমধ্যে এর যাচাই বাছাইয়ের কাজও চলছে। সবটাই সরকারি তদারকিতে। তবে পরিচালক ও প্রযোজক অনন্য মামুন বলছেন ভিন্ন কথা। তিনি সিনেমাকে উন্মুক্ত ব্যবসা ও সৃজনশীল শিল্পমাধ্যম উল্লেখ করে এর স্বাধীনতার ওপর যুক্তি তুলে ধরেন। পাশাপাশি সরকারি উদ্যোগ থাকায় মাধ্যমটি সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়া এবং দলীয়করণের আশঙ্কা করেছেন। এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি মতামতও প্রকাশ করেছেন তরুন এই পরিচালক।
অনন্য মামুন লিখেছেন, “চলচ্চিত্রের উন্নয়নের পক্ষে সব সময় কাজ করেছি। কো-প্রোডাকশন থেকে শুরু করে হিন্দি ছবি আমদানি, নতুন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ সবকিছুতেই শুরু থেকেই সম্পৃক্ত ছিলাম। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে চলচ্চিত্র উন্নয়নের নামে দুটি বিষয় নিয়ে যে তোরজোড় চলছে, আমি তার সম্পূর্ণ বিরোধী। একটি হলো ই-টিকিটিং, অন্যটি সেন্ট্রাল সার্ভার।”
পৃথিবীর কোথাও সরকারিভাবে সিনেমা প্রদর্শনের জন্য কোনো সেন্ট্রাল সার্ভার ব্যবস্থা নেই উল্লেখ করে তিনি লিখেন, “আমাদের দেশে প্রায়ই কিছু শব্দ ব্যবহার করা হয়, যেগুলো নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। পৃথিবীর কোথাও সরকারিভাবে সিনেমা প্রদর্শনের জন্য কোনো সেন্ট্রাল সার্ভার ব্যবস্থা নেই। চলচ্চিত্র একটি উন্মুক্ত ব্যবসা ও সৃজনশীল শিল্পমাধ্যম। এখানে স্বাধীনতা থাকা জরুরি। যখনই এটি পুরোপুরি সরকারের নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে, তখনই দলীয়করণ ও নানা ধরনের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হবে।
এফডিসি কর্তৃক এনওসি পেতে টাকা দেওয়া প্রসঙ্গে মামুন লিখেন, “শুধুমাত্র একটি এনওসি নেওয়ার জন্য সরকারকে ২০ হাজার টাকা দিতে হয়। কেন এই টাকা দিতে হয়, কীসের জন্য দিতে হয় আজ পর্যন্ত বহু প্রতিবাদ করেও তার যৌক্তিক ব্যাখ্যা আমরা পাইনি। যে কাগজটিতে শুধু লেখা থাকে, ‘বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশনের কাছে এই প্রতিষ্ঠানের কোনো পাওনা নেই’, সেই অনাপত্তিপত্রের জন্যই ২০ হাজার টাকা গুনতে হয়। এটি সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।”
নেতাদের সঙ্গে এফডিসির সখ্য নিয়েও মামুন অভিযোগ আনেন। তিনি লিখেন, “এফডিসিতে কোন প্রোগ্রাম বা কার্যক্রম হলে রেগুলার যারা আমরা প্রডিউসার এবং পরিচালক তারা আমরা কেউই খবর পাই না। খবর পায় শুধু যারা নেতাদের সাথে সখ্য রয়েছে তারা। এখন যদি সেন্ট্রাল সার্ভার ও ই-টিকিটিং সিস্টেমও বিএফডিসির নিয়ন্ত্রণে দেওয়া হয়, তাহলে আমি মনে করি চলচ্চিত্র শিল্প ধ্বংসের জন্য সেটাই যথেষ্ট হবে। চলচ্চিত্র একটি স্বাধীন পেশা। এখানে প্রত্যেককে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে।”
অবকাঠামোগত উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে মামুন লিখেন “আমাদের উচিত অবকাঠামোগত উন্নয়নের দিকে মনোযোগ দেওয়া। যেমন জিয়া ফিল্ম সিটি বা একটি আধুনিক ফিল্ম সিটি নির্মাণ। এজন্য বাজেটও রয়েছে, কিন্তু আজ পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো কার্যকর কাজ হয়নি। নতুন স্টুডিও তৈরি হয়নি, আন্তর্জাতিক মানের সুযোগ-সুবিধাও গড়ে ওঠেনি। অথচ আমরা চাইলে আমাদের ফিল্ম সিটিকে এমনভাবে সাজাতে পারতাম, যাতে দেশের নির্মাতারা বিদেশে শুটিং করতে যেতে বাধ্য না হন।”
দেশের মাটিতেই কাজের সুযোগ বাড়ানোর ওপর তাগিদ দিয়ে এই নির্মাতা লিখেন, “আমরা ইন্ডিয়ায় শুটিং করতে যাই। কিন্তু কেন যাই? শুধুমাত্র উন্নত সুযোগ-সুবিধার কারণে। সেই সুযোগ-সুবিধাগুলো যদি আমাদের দেশেই থাকত, তাহলে কেউ বিদেশে শুটিং করতে যেত না। আমরা সবাই চাই দেশের মাটিতেই কাজ করতে।”
এফডিসির শপিং কমপ্লেক্স প্রকল্পকে ‘অর্থ অপচয়’ উল্লেখ করে মামুন লিখেন, “এফডিসির শপিং কমপ্লেক্স প্রকল্পের কথাও বলা যায়। তিন ও চার নম্বর ফ্লোর ভেঙে কমপ্লেক্সের প্রকল্প ব্যয় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই প্রকল্প চলচ্চিত্র উন্নয়নের তেমন কোনো কাজে আসেনি। সত্যি বলতে, এটি সরকারের অর্থ অপচয় ছাড়া আর কিছু নয়। বরং এটিকে বেসরকারি খাতে লিজ দিয়ে কার্যকর কোনো বাণিজ্যিক উদ্যোগ নেওয়া হলে তা শিল্পের জন্য বেশি উপকারী হতো।
সিনেমা বাঁচাতে মামুনের কিছু প্রস্তাবনার কথা তার পোস্টে লিখেন। তিনি লিখেন, “আমি আবারও বলতে চাই চলচ্চিত্রকে সরকারি নিয়ন্ত্রণে এনে বাঁচানো যাবে না। চলচ্চিত্রের মানোন্নয়ন করতে হলে নির্মাতাদের উৎসাহ দিতে হবে, নির্মাণব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে। সহজ শর্তে ঋণ দিতে হবে, নতুন নির্মাতাদের সুযোগ করে দিতে হবে। কিন্তু নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে সেন্ট্রাল সার্ভার ও ই-টিকিটিং নিজেদের হাতে নেওয়ার যে চিন্তা, সেই ধারণা থেকে সরে আসা উচিত। বরং ভালো সিনেমা হল তৈরি করুন, হল মালিকদের সহায়তা দিন। দেখবেন, তারা নিজেরাই আধুনিক ই-টিকিটিং ব্যবস্থা চালু করবে এবং পুরো ব্যবস্থাকে আরও সুন্দর ও কার্যকর করে তুলবে।”
সর্বশেষ মামুন তার পোস্টে লিখেন, “ই টিকিটিং হোক, নতুন নতুন সার্ভার কোম্পানি আসুক, তবে সেটা অবশ্যই প্রাইভেট কোম্পানি। সরকারের দ্বারা না।”
আজকালের খবর/আতে