যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যখন যুদ্ধ বন্ধের চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছে যাচ্ছিল, তখন এই আলোচনার বিষয়ে কিছুই জানত না ইসরায়েল। বরং দেশটি তখন আরও বড় যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। বুধবার (৬ মে) বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের পৃথক প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করা এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারকে কেন্দ্র করে একটি এক পৃষ্ঠার ১৪ দফা সমঝোতা স্মারক নিয়ে দর-কষাকষি চলছে বলে জানা গেছে।
একটি ইসরায়েলি সূত্রের বরাতে রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে এমন একটি চুক্তির কাছাকাছি রয়েছেন, যা যুদ্ধ বন্ধের পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক করতে সহায়তা করতে পারে। কিন্তু এ বিষয়ে ইসরায়েলের আগে কোনো ধারণাই ছিল না।
পাকিস্তানের একটি সূত্র ও দুজন মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, চলমান যুদ্ধ বন্ধে একটি সমঝোতা স্মারক সইয়ের কাছাকাছি পৌঁছেছে দুই দেশ। এই আলোচনার নেতৃত্ব দিচ্ছেন ট্রাম্পের দূত স্টিভ উইটকফ এবং তাঁর জামাতা জ্যারেড কুশনার। সূত্রগুলো বলছে, যুদ্ধ শুরুর পর দুই পক্ষ এবারই চুক্তির সবচেয়ে কাছাকাছি রয়েছে।
অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার লক্ষ্যে শুরু করা সামরিক অভিযান স্থগিত রেখেছেন ট্রাম্প। মূলত আলোচনায় অগ্রগতির কারণেই তিনি এই ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি না ভাঙার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে দুজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন। আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ইরানের পক্ষ থেকে জবাব আশা করছে ওয়াশিংটন।
সম্ভাব্য চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, ইরান তার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি স্থগিত রাখবে। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর থেকে ধাপে ধাপে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে এবং বিশ্বজুড়ে আটকে থাকা ইরানের শত শত কোটি ডলার পর্যায়ক্রমে অবমুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দেবে। এ ছাড়া উভয় পক্ষই হরমুজ প্রণালিতে আরোপিত বিধিনিষেধ তুলে নেবে।
ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিতের মেয়াদ নিয়ে এখনো মূল দর-কষাকষি চলছে। তিনটি সূত্র জানিয়েছে, এই মেয়াদ হবে অন্তত ১২ বছর। একটি সূত্র বলছে, ১৫ বছর হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। ইরান ৫ বছরের প্রস্তাব দিলেও যুক্তরাষ্ট্র ২০ বছরের দাবিতে অটল ছিল। মেয়াদ শেষে ইরান ৩ দশমিক ৬৭ শতাংশ পর্যন্ত নিম্নমাত্রার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করতে পারবে।
সমঝোতা স্মারকে ইরান অঙ্গীকার করবে, তারা কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না এবং এ-সংক্রান্ত কোনো কর্মকাণ্ডেও জড়াবে না। এ ছাড়া কোনো ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক স্থাপনা পরিচালনা না করার বিষয়েও আলোচনা চলছে। ইরান কঠোর তদারকি ব্যবস্থার আওতায় থাকতে রাজি হবে বলে জানা গেছে, ফলে জাতিসংঘের পরিদর্শকেরা যেকোনো সময় ইরানি স্থাপনায় আকস্মিক পরিদর্শন করতে পারবেন। আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুটি সূত্র জানিয়েছে, ইরান তাদের কাছে থাকা উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশ থেকে সরিয়ে নিতেও রাজি হতে পারে, যা এত দিন তেহরান মানতে চায়নি।
প্রাথমিক চুক্তি হলে ইসলামাবাদ অথবা জেনেভায় ৩০ দিনের নিবিড় আলোচনা শুরু হবে। এ সময়ের মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া, পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করা এবং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয়ে চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা করা হবে। তবে আলোচনা ব্যর্থ হলে মার্কিন বাহিনী আবার অবরোধ আরোপ করতে বা সামরিক পদক্ষেপ নিতে পারবে।
তবে চুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে সংশয়ও রয়েছে। হোয়াইট হাউস মনে করছে, ইরানের বর্তমান নেতৃত্ব কয়েক ভাগে বিভক্ত, ফলে দেশটির বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষের মধ্যে ঐকমত্য তৈরি কঠিন হতে পারে। কিছু মার্কিন কর্মকর্তা প্রাথমিক চুক্তিতে পৌঁছানো নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেছেন। এ ছাড়া সমঝোতা স্মারকের অনেক শর্তই চূড়ান্ত চুক্তির ওপর নির্ভর করছে, ফলে স্থায়ী সমাধান না হওয়ার আশঙ্কাও থেকে যাচ্ছে।
আজকালের খবর/ এমকে