বুধবার ৬ মে ২০২৬
এক পরিবারের ভেঙে পড়া স্বপ্নের গল্প
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৫ মে, ২০২৬, ৪:৫৯ পিএম   (ভিজিট : ৩২)
স্বপ্ন ছিল ছোট্ট, কিন্তু দায় ছিল বিশাল। ধার-দেনা করে ২০২২-২৩ সালের কলিং ভিসায় প্রায় ছয় লাখ টাকা খরচ করে পরিবারে স্বচ্ছলতা ফেরানোর আশায় সুদূর মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমিয়েছিলেন মোঃ মনির হোসেন (২৮)। পাসপোর্ট নম্বর, ইএল ০৭৫৫৬২৬—এই সংখ্যার আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক তরুণের অসংখ্য স্বপ্ন, দায়িত্ব আর ভালোবাসা।

প্রবাস জীবন মানেই সংগ্রাম, আর সেই সংগ্রামের নামই যেন ‘রেমিটেন্সযোদ্ধা’। প্রিয়জনদের ছেড়ে, অজানা এক দেশে কঠোর পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে তারা গড়ে তুলতে চান পরিবারের হাসিমুখ। মনিরও ছিলেন সেই স্বপ্নবাজদের একজন। চোখে ছিল বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফোটানোর স্বপ্ন, স্ত্রী-সন্তানের জন্য একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ার আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু সব স্বপ্ন কি পূরণ হয়?

গত শনিবার (২ মে) হঠাৎ করেই থেমে যায় মনিরের জীবনের পথচলা। কী কারণে তিনি এমন চরম সিদ্ধান্ত নিলেন—তা আজও অজানা। সহকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, গলায় ফাঁস দিয়ে তার মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। তবে ঘটনাস্থলের চিত্র ছিল কিছুটা ভিন্ন। ঝুলন্ত অবস্থায় নয়, বরং হাঁটু গেড়ে বসা অবস্থায় পাওয়া যায় তার নিথর দেহ। এই অস্বাভাবিক দৃশ্য অনেকের মনেই প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

মালয়েশিয়ার কেলাংয়ের দক্ষিণ বন্দরের একটি কোম্পানিতে রাত্রিকালীন প্রহরী হিসেবে কর্মরত ছিলেন মনির। প্রতিদিনের মতোই সেদিনও সন্ধ্যায় কর্মস্থলে যান তিনি। সকালে ডিউটি থেকে এসে এক বাংলাদেশি সহকর্মী তাকে খুঁজতে গিয়ে আবিষ্কার করেন সেই মর্মান্তিক দৃশ্য। নিঃশব্দ, নিথর মনির, যার ফিরে যাওয়ার কথা ছিল পরিবারের কাছে, কিন্তু ফিরলেন লাশ হয়ে।

ঘটনার আরও কিছু দিক রহস্যকে ঘনীভূত করেছে। মনিরের কর্মস্থলের কাছে বসবাসরত একজন ইন্দোনেশীয় দম্পতি ও তিনজন মিয়ানমারের নাগরিক ঘটনার পরপরই নিখোঁজ হয়ে যান বলে জানা যায়। যদিও পরবর্তীতে পুলিশি তদন্ত শেষে তারা আবার কর্মস্থলে ফিরে আসেন, তবুও প্রশ্ন থেকেই যায়—কেন এই হঠাৎ অন্তর্ধান?

হাসপাতালের ময়নাতদন্তে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যার কথা উল্লেখ করা হলেও, অনেকেই এই মৃত্যুকে ঘিরে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি তুলেছেন। তবে মনিরের পরিবার এখন শোকের ভারে ন্যুব্জ।  তাদের কাছে উত্তর খোঁজার চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রিয়জনকে শেষবারের মতো বিদায় জানানোর অপেক্ষা।

মনিরের বড় ভাই মো. কামরুল শেখ, যিনি একই কোম্পানির অন্য একটি সেকশনে কাজ করেন, ইতোমধ্যে ভাইয়ের মরদেহ দেশে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে মনিরের নিথর দেহ পাঠানো হবে তার গ্রামের বাড়ি ফরিদপুর জেলার মধুখালী থানার বনমালিদিয়া মিয়া পাড়ায়।

এই মৃত্যুর খবরে শোকের ছায়া নেমে এসেছে পুরো পরিবার ও এলাকাজুড়ে। বাবা-মা হারালেন তাদের সম্ভাবনাময় সন্তানকে, স্ত্রী হারালেন জীবনসঙ্গীকে, আর ছোট্ট কন্যাটি হারালো তার সবচেয়ে বড় আশ্রয় তার বাবাকে।

মনিরের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের নয়, বরং হাজারো প্রবাসী জীবনের না বলা কষ্টের প্রতিচ্ছবি। স্বপ্নের পেছনে ছুটতে গিয়ে কত স্বপ্ন যে নিঃশব্দে ঝরে যায় তার হিসাব কেউ রাখে না।

প্রশ্ন রয়ে যায় এই স্বপ্নভাঙার দায় কার? আর কত মনির হারিয়ে গেলে আমরা থামবো, শুনবো তাদের নীরব আর্তনাদ?

আজকালের খবর/বিএস 







আরও খবর


Advertisement
Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রাপা প্লাজা( ৭ম তলা), রোড-২৭ (পুরাতন) ১৬ (নতুন), ধানমন্ডি, ঢাকা -১২০৯।
ফোন: বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor@gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor@gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft