২০২৬ সালে ইউনাইটেড মালেজ ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন (ইউএমএনও)-এর ৮০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী মালয়েশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ১৯৪৬ সালের ১১ মে প্রতিষ্ঠিত এই দলটি উপনিবেশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা অর্জন, রাষ্ট্রগঠন এবং আধুনিক রাজনৈতিক রূপান্তরের প্রতিটি ধাপে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আট দশকের এই যাত্রা কেবল উদযাপনের নয়, বরং আত্মসমালোচনা, চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং ভবিষ্যৎ পথ নির্ধারণেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।
ইউএমএনও প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৪৬ সালে অন জাফর-এর নেতৃত্বে, ব্রিটিশদের প্রস্তাবিত মালায়ান ইউনয়ন-এর বিরোধিতার মধ্য দিয়ে। এই প্রস্তাব মালয় শাসকদের সার্বভৌমত্ব ও মালয় জনগণের বিশেষ অধিকারকে ক্ষুণ্ন করার আশঙ্কা তৈরি করলে দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এরই প্রেক্ষাপটে ইউএমএনও মালয় জাতীয়তাবাদের ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে আবির্ভূত হয় এবং গণআন্দোলনের মাধ্যমে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। আন্দোলনের সফলতায় মালায়ান ইউনিয়ন বাতিল হয়ে ১৯৪৮ সালে ফেডারেশন অব মালয়া প্রতিষ্ঠিত হয়, যা ইউএমএনও’র রাজনৈতিক উত্থানের সূচনা করে।
পরবর্তীতে ইউএমএনও, মালয়েশিয়ান চাইনিজ এসোসিয়েশন (এমসিএ) এবং মালয়েশিয়ান ইন্ডিয়ান কংগ্রেস (এমআইসি)-কে সঙ্গে নিয়ে অ্যালায়েন্স পার্টি গঠন করে। এই বহুজাতিক জোটের নেতৃত্বেই ১৯৫৭ সালে মালয়া স্বাধীনতা লাভ করে, যেখানে নেতৃত্ব দেন তুংকু আব্দুল রহমান।
স্বাধীনতার পর ইউএমএনও অ্যালায়েন্স এবং পরবর্তীতে বারিশান ন্যাশনাল-এর প্রধান শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। টানা ছয় দশকের বেশি সময় ধরে ইউএমএনও-নেতৃত্বাধীন জোট মালয়েশিয়া শাসন করেছে, যা বিশ্বে দীর্ঘতম সময় ক্ষমতায় থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অন্যতম। এই সময়ের মধ্যে মালয়েশিয়ার প্রায় সব প্রধানমন্ত্রী তুংকু আবদুল রহমান থেকে নাজিব রাজাক পর্যন্ত ইউএমএনও’র সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন।
রাষ্ট্রগঠন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং সামাজিক পুনর্গঠনে ইউএমএনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষ করে নিউ ইকনোমিক পলিসি (এনইপি) প্রবর্তনের মাধ্যমে মালয় ও বুমিপুত্র জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক বৈষম্য কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। একই সঙ্গে দলটি মালয় অধিকার, ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম এবং সাংবিধানিক রাজতন্ত্রের রক্ষক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে।
ইউএমএনও’র মূল ভিত্তি মালয় জাতীয়তাবাদ ও রক্ষণশীল রাজনৈতিক দর্শন। দলটি মালয় জনগোষ্ঠীর অধিকার সংরক্ষণ, ইসলামের মূল্যবোধ প্রচার এবং মালয় সংস্কৃতির সংরক্ষণে গুরুত্ব দিয়ে থাকে। ৮০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে নেতারা পুনর্ব্যক্ত করেন, ইউএমএনও’র সংগ্রাম তিনটি মূল স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে ইসলাম, মালয় ও বুমিপুত্র অধিকার এবং মালয় শাসকদের সার্বভৌমত্ব।
২ মে রাজধানী কুয়ালালামপুরে ৮০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে নানা আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়, বিশেষ করে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল বুমিপুত্র শিক্ষা কংগ্রেস এবং ইউএমএনও কনভেনশন। এসব আয়োজনে দলীয় নেতা, প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ ও তৃণমূল পর্যায়ের কর্মীরা অংশ নেন এবং অতীত সাফল্য পর্যালোচনার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ কৌশল নির্ধারণে মতবিনিময় করেন।
ইউএমএনও প্রেসিডেন্ট আহমাদ জাহিদ হামিদি বলেন, ৮০ বছরের এই যাত্রা দলটির ত্যাগ, সংগ্রাম ও স্থিতিশীলতার প্রতীক। তিনি এটিকে “সংগ্রাম ও দৃঢ়তার এক দীর্ঘ ইতিহাস” হিসেবে উল্লেখ করেন, যা দেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
তবে দীর্ঘদিনের আধিপত্য সত্ত্বেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউএমএনও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। বিশেষ করে ২০১৮ সালের মালয়েশিয়ার সাধারন নির্বাচনে ঐতিহাসিক পরাজয়ের মাধ্যমে স্বাধীনতার পর প্রথমবারের মতো ক্ষমতা হারায় দলটি। এই পরাজয় ইউএমএনও’র জন্য একটি বড় মোড় পরিবর্তনের সূচনা করে এবং দলটি নিজেদের কৌশল, নেতৃত্ব ও ভাবমূর্তি পুনর্মূল্যায়নে বাধ্য হয়।
পরবর্তীতে রাজনৈতিক জোট পুনর্গঠনের মাধ্যমে ইউএমএনও আবার ক্ষমতার কেন্দ্রে ফিরে আসে এবং বর্তমানে জাতীয় ঐক্য সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে কাজ করছে। তবে প্রতিযোগিতামূলক রাজনৈতিক পরিবেশে বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের আস্থা পুনরুদ্ধার এখন দলটির বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
৮০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী তাই আত্মসমালোচনারও সময়। দলীয় নেতারা তৃণমূল শক্তি জোরদার, অভ্যন্তরীণ ঐক্য বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য, ডিজিটাল রূপান্তর ও যুবসম্পৃক্ততার মতো আধুনিক ইস্যুগুলোর সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
বর্তমানে ইউএমএনও মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে, যদিও আগের তুলনায় রাজনৈতিক পরিবেশ এখন আরও জটিল ও প্রতিযোগিতামূলক। এটি এখনও বারিসান ন্যাশনাল জোটের প্রধান শক্তি এবং সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।
রাজনীতির পাশাপাশি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও দলটির প্রভাব বিস্তৃত। দেশজুড়ে লাখো সদস্য নিয়ে ইউএমএনও একটি শক্তিশালী তৃণমূল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে, বিশেষ করে গ্রামীণ অঞ্চলে। তরুণ, নারী ও শিক্ষার্থী সংগঠনের মাধ্যমে দলটি সমাজের বিভিন্ন স্তরের সঙ্গে সংযোগ বজায় রাখছে।
নবম দশকে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে ইউএমএনও নতুন করে নিজেকে গড়ে তোলার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো এখন অন্যতম অগ্রাধিকার। শিক্ষা, যুব উন্নয়ন এবং সমসাময়িক সামাজিক-অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানে নতুন উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে দলীয় ঐক্য ও জোট সহযোগিতা জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সমঝোতা ও সহযোগিতার গুরুত্বও বেড়েছে। ইউএমএনও তার ঐতিহ্যবাহী মূল্যবোধ বজায় রেখেও আধুনিক শাসনব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এগিয়ে যেতে চায়।
ইউএমএনও’র ৮০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী কেবল একটি রাজনৈতিক দলের ইতিহাস নয়, বরং আধুনিক মালয়েশিয়ার রাজনৈতিক বিবর্তনের প্রতিচ্ছবি। উপনিবেশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে রাষ্ট্র পরিচালনা এবং বর্তমান জোট সরকারের অংশ হওয়া এই দীর্ঘ পথচলা দেশের সামগ্রিক ইতিহাসেরই প্রতিফলন।
এদিকে শততম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সামনে রেখে আহমাদ জাহিদ হামিদি এক দূরদর্শী স্বপ্নের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এমন এক মালয় জাতি গড়ে উঠুক, যারা ইসলামী মূল্যবোধে অবিচল, আত্মপরিচয়ে দৃঢ়, নৈতিকতায় সমৃদ্ধ এবং উদ্ভাবনে অগ্রগামী। যারা ঐক্যবদ্ধ থেকে বহুজাতিক সমাজে নেতৃত্ব দেবে এবং দেশের অগ্রগতির প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে।
তার ভাষায়, আমরা এমন এক প্রজন্ম চাই যারা ঈমানে দৃঢ়, চিন্তায় প্রজ্ঞাবান, সৃষ্টিতে সক্ষম, সংগ্রামে উদারচিত্ত এবং নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ।
ইউএমএনও’র ৮০ বছরের ইতিহাস সংগ্রাম, নেতৃত্ব ও স্থিতিশীলতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত, যা আজও মালয়েশিয়ার রাজনীতিতে একটি শক্তিশালী ভিত্তি হিসেবে বিদ্যমান। ভবিষ্যতে দলটি কতটা সফলভাবে নিজেকে সংস্কার করতে পারে এবং জনগণের সঙ্গে পুনঃসংযোগ স্থাপন করতে পারে তার ওপরই নির্ভর করবে এর প্রাসঙ্গিকতা ও প্রভাব।
আজকালের খবর/বিএস