বুধবার ২০ মে ২০২৬
এআই ভিডিও ও অপতথ্য: ডিপফেকের যুগে ভোটার কতটা নিরাপদ?
প্রকাশ: সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১১:১৬ পিএম   (ভিজিট : ৮৭৭)
নির্বাচন কেবল ব্যালটের প্রতিযোগিতা নয়, এটি নাগরিক বিশ্বাসের এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা। একজন ভোটার যখন ভোটকেন্দ্রে যান, তখন তিনি ধরে নেন—যে তথ্যের ভিত্তিতে তিনি সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, তা সত্য ও নির্ভরযোগ্য। কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের দ্রুত বিকাশ সেই বিশ্বাসের ভিত্তিকেই আজ গুরুতর ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া ভিডিও, অডিও ও ছবির বিস্তার—যা ডিপফেক নামে পরিচিত—নির্বাচনী নিরাপত্তা ও গণতন্ত্রের ভিতকে নীরবে কাঁপিয়ে দিচ্ছে।

বাংলাদেশসহ বিশ্বজুড়ে সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোর অভিজ্ঞতা এক কথায় উদ্বেগজনক। অপতথ্য নতুন কোনো বিষয় নয়, তবে এআই অপতথ্যকে দিয়েছে ভয়ংকর গতি, বাস্তবতার ছদ্মবেশ এবং বিস্তারের ক্ষমতা। আগে একটি গুজব ছড়াতে সময় লাগত; এখন কয়েক মিনিটেই তা লাখো মানুষের মোবাইল স্ক্রিনে পৌঁছে যায়। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে ভোটারের মনোভাব, প্রার্থীর ভাবমূর্তি এবং সামগ্রিক নির্বাচনী পরিবেশের ওপর।

ডিপফেক মূলত ডিপ লার্নিংভিত্তিক এআই প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি এমন ভুয়া কনটেন্ট, যা দেখতে ও শুনতে একেবারে সত্যের মতো। ভিডিওতে দেখা যায় কোনো ব্যক্তি এমন বক্তব্য দিচ্ছেন বা এমন কাজ করছেন, যা তিনি বাস্তবে কখনোই করেননি। এখানেই বিপদের মূল। মানুষ চোখে দেখা বিষয়কে সহজে বিশ্বাস করে, আর লেখা বা ছবির তুলনায় ভিডিওর বিশ্বাসযোগ্যতা অনেক বেশি।

ডিপফেকের পাশাপাশি রয়েছে চিপফেক—যেখানে উন্নত এআই নয়, বরং সাধারণ সফটওয়্যার দিয়ে আসল ভিডিও বা ছবি কেটে-ছেঁটে, প্রসঙ্গ বদলে কিংবা বিভ্রান্তিকর ক্যাপশন জুড়ে অপতথ্য ছড়ানো হয়। প্রযুক্তি ভিন্ন হলেও ফলাফল এক—ভোটার বিভ্রান্ত হয়, সত্য আড়ালে চলে যায়।

২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গাইবান্ধা-১ আসনের একটি ঘটনা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ডিপফেকের ভয়াবহ বাস্তবতা সামনে আনে। ভোটের দিন সকালে এক প্রার্থীর একটি ডিপফেক ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে তাকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিতে দেখা যায়। এতে বহু ভোটার বিভ্রান্ত হন। নির্বাচন এমনিতেই বিতর্কিত ছিল; তার ওপর এই প্রযুক্তিনির্ভর অপতথ্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

এই ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন উদাহরণ নয়। আন্তর্জাতিক গবেষণা ও বিভিন্ন প্রতিবেদন বলছে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুরু করে ইউরোপ, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকা—সবখানেই নির্বাচনে ডিপফেক ব্যবহারের নজির রয়েছে। কোথাও ভোটারদের ভোট দিতে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে, কোথাও প্রার্থীর চরিত্র হননের চেষ্টা হয়েছে, আবার কোথাও পুরো নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর আস্থা নষ্ট করার অপচেষ্টা দেখা গেছে।

সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাজনৈতিক অপতথ্য ছড়ানোর প্রধান মাধ্যম এখন ভিডিও। গ্রাফিক্স, ছবি বা লিখিত পোস্টের তুলনায় ভিডিও বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে, কারণ এটি আবেগে আঘাত করে, দ্রুত বিশ্বাস তৈরি করে এবং বেশি শেয়ার হয়। বাংলাদেশে নির্বাচন ঘনিয়ে এলে ভিডিওভিত্তিক অপতথ্যের হার লক্ষণীয়ভাবে বেড়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে একই ভুয়া ভিডিও একযোগে অসংখ্য পেইজ ও অ্যাকাউন্ট থেকে ছড়ানো হয়—যা সংঘবদ্ধ অপপ্রচারের স্পষ্ট উদাহরণ। এখানে ব্যক্তি নয়, কাজ করে সংগঠিত নেটওয়ার্ক বা তথাকথিত বটবাহিনী।

এআই অপতথ্য এতটা কার্যকর হওয়ার পেছনে বড় কারণ হলো ডিজিটাল লিটারেসির ঘাটতি। বাংলাদেশের একটি বড় অংশের মানুষ এখনো জানেন না কীভাবে অনলাইনের তথ্য যাচাই করতে হয় বা কীভাবে আসল-নকল আলাদা করতে হয়। ফলে ডিপফেক ও চিপফেক সহজেই বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে।

সমস্যা আরও গভীর হয় যখন রাজনৈতিক নেতা, প্রভাবশালী ব্যক্তি কিংবা কিছু গণমাধ্যম যাচাই না করেই সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো তথ্যকে সত্য ধরে বক্তব্য দেন বা প্রকাশ করেন। এতে অপতথ্য যেন বৈধতার সিল পেয়ে যায়। সাধারণ মানুষ তখন ধরে নেয়—নেতা বা গণমাধ্যম বললে নিশ্চয়ই তা সত্য।

বিশ্লেষকদের মতে, অপতথ্য ছড়ানোর পেছনে প্রধানত দুই ধরনের গোষ্ঠী সক্রিয়। একদল রাজনৈতিক বা আদর্শিক উদ্দেশ্যে প্রণোদিত—ক্ষমতা, প্রভাব বা প্রতিশোধই তাদের লক্ষ্য। অন্য দলটি অর্থের বিনিময়ে কাজ করে; অপতথ্য তাদের কাছে একটি লাভজনক ব্যবসা। এর সঙ্গে যুক্ত থাকে অসংখ্য ভুয়া পরিচয়ের পেইজ ও অ্যাকাউন্ট, যেগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করে। প্রথমে একটি মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হয়, পরে সেটিকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে একই কনটেন্ট বারবার প্রচার করা হয়। অ্যালগরিদম তখন সেটিকে জনপ্রিয় ধরে নিয়ে আরও বিস্তার ঘটায়। কিছু ক্ষেত্রে বিদেশে বসেও বাংলাদেশের নির্বাচন ও রাজনীতি নিয়ে অপতথ্য ছড়ানো হচ্ছে, যা অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার জন্য বাড়তি ঝুঁকি তৈরি করছে।

ডিপফেক ও এআই অপতথ্যকে শুধু নির্বাচনী সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি আসলে জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়। এর মাধ্যমে ভোটারদের ভোট দেওয়া থেকে বিরত রাখা, সহিংসতা উসকে দেওয়া, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা নষ্ট করা এবং নির্বাচন-পরবর্তী অস্থিরতা তৈরি করা সম্ভব। বিশ্বের কিছু দেশে ডিপফেক ও সাইবার আক্রমণের কারণে নির্বাচন পেছানোর নজিরও রয়েছে। অর্থাৎ এটি কেবল তথ্যযুদ্ধ নয়; এটি গণতন্ত্রের স্থিতিশীলতার বিরুদ্ধে এক নীরব যুদ্ধ।

বাংলাদেশে অপতথ্য মোকাবিলায় বিভিন্ন সংস্থা সাইবার নজরদারি, ফ্যাক্টচেকিং ও বিশেষ সেল গঠনের মতো উদ্যোগ নিয়েছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও সামাজিক মাধ্যমে নজরদারি বাড়িয়েছে। তবে প্রশ্ন থেকে যায়—এই উদ্যোগগুলো কি বাস্তব ঝুঁকির তুলনায় যথেষ্ট? ডিপফেক প্রযুক্তি যেভাবে দ্রুত উন্নত হচ্ছে, সেই গতিতে কি আমাদের সক্ষমতাও বাড়ছে? অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, নজরদারি থাকলেও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা এখনো দুর্বল। অপতথ্য ছড়ানোর পর ব্যবস্থা নেওয়া হয়, কিন্তু ততক্ষণে ক্ষতি হয়ে যায়।

এই সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। ডিজিটাল লিটারেসি বাড়াতে হবে—স্কুল-কলেজ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের জন্য তথ্য যাচাই শেখানো প্রয়োজন। রাজনৈতিক দলগুলোকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে; স্বল্পমেয়াদি লাভের জন্য অপতথ্য ব্যবহার করলে দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতি হবে পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থার। গণমাধ্যমকে আরও সতর্ক হতে হবে, কারণ যাচাই ছাড়া সামাজিক মাধ্যমের কনটেন্ট প্রকাশ করলে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়। পাশাপাশি আইনি ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা জোরদার করে ডিপফেক শনাক্তকরণ, দ্রুত প্রতিক্রিয়া ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।

এআই নিজে কোনো শত্রু নয়; এটি একটি শক্তিশালী প্রযুক্তি। কিন্তু নির্বাচনের মতো সংবেদনশীল সময়ে যদি এআই অপতথ্যের অস্ত্রে পরিণত হয়, তাহলে তা গণতন্ত্রের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। আজ যদি বিষয়টিকে হালকাভাবে নেওয়া হয়, আগামীকাল তার পরিণতি হবে ভয়াবহ। নির্বাচন মানে শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন নয়; এটি নাগরিক বিশ্বাসের প্রতিফলন। সেই বিশ্বাস ভেঙে গেলে রাষ্ট্রই দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই ডিপফেক ও এআই অপতথ্যের বিরুদ্ধে লড়াই কোনো গৌণ ইস্যু নয়—এটাই এখন গণতন্ত্র রক্ষার মূল লড়াই।

লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

আজকালের খবর/ এমকে









Advertisement
Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রাপা প্লাজা( ৭ম তলা), রোড-২৭ (পুরাতন) ১৬ (নতুন), ধানমন্ডি, ঢাকা -১২০৯।
ফোন: ৪১০২১৯১৫-৬, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor@gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor@gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft