না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন বরেণ্য চলচ্চিত্রগ্রাহক সমিতির সভাপতি বরেণ্য সংগঠক, চলচ্চিত্র সংগঠনের অভিভাবক ও পরিচালক আব্দুল লতিফ বাচ্চু। চলচ্চিত্রের অন্তঃপ্রাণ বলিষ্ঠ এই নেতার স্মরণে আজ সকাল ১১টায় বিএফডিসির জহির রায়হান কালার ল্যাব মিলনায়তনে স্মরণসভা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। এদিন বাচ্চুর মৃত্যুতে ‘অভিভাবকশূণ্য’র শংকার সঙ্গে চলচ্চিত্রের মানুষগুলোর চেহারায় হতাশার ছাপ পড়েছিলো স্পষ্ট। এ অবস্থায় উপস্থিত অংশীজনের মধ্য থেকে বরেণ্য অভিনেতা আলমগীরের বুদ্ধিমত্তায় মুহূর্তে সকলের মাঝে স্বস্তির ছাপ পড়তে দেখা গেছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, পরিচাল অপূর্ব রায়ের সঞ্চালনায় স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে এক পর্যায়ে চলচ্চিত্রের দুঃসময়ের অন্যতম প্রাণভোমরা অভিনেতা আলমগীরের নাম ঘোষণা এলে তিনি সবিনয়ে ফিরিয়ে দেন এবং সিনিয়ল হিসেবে শক্তিমান অভিনেতা মেগাস্টার উজ্জ্বলকে সবশেষে বক্তব্যের জন্য ডাকতে সঞ্চালকের প্রতি অনুরোধ করেন। এ সময় সিনয়রের প্রতি আলমগীরের এমন মহানুভব আচরণে উপস্থিত সকলেই স্বস্তি প্রকাশ করেন। পাশাপাশি উজ্জলের চোখেমুখেও কৃতজ্ঞতার ছাপ স্পষ্ট হয়।
পরে উজ্জ্বল প্রয়াত বাচ্চুকে নিয়ে তার স্মৃতিচারণায় অভিভাবকসুলভ বক্তব্য বলেন, বাচ্চু ভাই সবার অভিভাবক ছিলেন। তিনি চমৎকার হৃদয়ের মানুষ ছিলেন কেবল তাই নয় একজন বিচক্ষণ সংগঠক ছিলেন যে কারণে চলচ্চিত্রের মানুষ তাকে অনেক দিন মনে রাখবে। তার চলে যাওয়া যে শূণ্যতা তৈরি হয়েছে তা এক কথায় অপূরণীয়, তবে এখানে আলমগীর আছে আরো যারা অন্যান্য সংগঠনের নেতৃত্ব আছেন আমি সবাইকে নিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করবো।
তিনি বলেন, ৩৫ মি.মি. থেকে ডিজিটালাইজ হওয়ার মুহূর্তে যে ধরণের টেকানোলজিক্যাল পরিবর্তন হয়েছে আমরা তার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না ফলে এক ধরনের টেকনোলজিক্যাল শূণ্যতা তৈরি হয়েছে। এজন্য আমি বা আমরা কেউ দায় এড়াতে পারি না। সত্যি বলতে চলচ্চিত্র বা এই এফডিসি ঘুরে দাঁড়াবে সেই দিন যখন টেকনোলজির সঙ্গে আমরা পথ চলতে পারবো। তাহলে আবার মুখ থুবড়ে পড়া ইন্ডাস্ট্রি চাঙা হবে। ভবিষ্যতে আমরা সকলে মিলে সেই চেষ্টাই করবো। এ সময় তিনি এফডিসির ভগ্নদশার কথাও উল্লেখ করেন।
পরে বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক আশরাফ উদ্দিন উজ্জ্বল নায়ক আলমগীরকে নিয়ে পরিচালক সমিতিতে মধ্যাহ্নভোজে অংশ নেন। উল্লেখ্য চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির নির্বাচনের পর এই প্রথম আলমগীর সমিতির স্টাডিরুমে গেলেন।
চলচ্চিত্রগ্রাহক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান মজনুর সার্বিক তত্ত্বাবধানে এবং আবু হেনা বাবলুর সভাপতিতে স্মরণসভায় অন্যান্যের মধ্যে প্রযোজক হাবিব খান, ছটকু আহমেদ, দেলোয়ার জাহান ঝন্টু, পরিচালক সমিতির সভাপতি শাহীন খান (শাহীন সুমন), প্রযোজক খোরশেদ আলম খসরু, ফিল্ম ক্লাবের সভাপতি সামসুল আলম, বাপ্পারাজ, ফজলে হক, আবু মুসা দেবু, প্রযোজক কামাল মো. কিবরিয়া লিপু, মোহাম্মদ হোসেন প্রমুখ বক্তব্য দেন। এ সময় আব্দুল লতিফ বাচ্চুর সহধর্মীনী ছাড়াও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারজয়ী ক্যামরাম্যান শফিকুল ইসলাম স্বপন, প্রযোজক আমান, পরিচালক মহিউদ্দিন শাকের, সিনিয়র সাংবাদিক চিত্রনাট্যকার মুজতবা সউদ, চিত্রনায়িকা মুক্তি, সনি রহমান, কমল পাটেকর উপস্থিত ছিলেন।
আব্দুল লতিফ বাচ্চুর স্মরণসভায় উপস্থিত একাংশের মধ্যে মহিউদ্দিন শাকের, শফিকুল ইসলাম স্বপন, ফজলে হক, কামাল মো. কিবরিয়া লিপু, আমানসহ অন্যরা। ছবি: সোহাগ
প্রসঙ্গত, গত ৪ জানুয়ারি আব্দুল লতিফ বাচ্চু না ফেরার দেশে চলে যান। পরে ৭ জানুয়ারি প্রবাসে থাকা তিন সন্তান দেশে আসার পর এফডিসিতে জানাযা শেষে গ্রামের বাড়িতে তাকে দাফন করা হয়।
১৯৪২ সালের ৯ জানুয়ারি তিনি সিরাজগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন। সর্বশেষ তিনি বাংলাদেশ চলচ্চিত্র গ্রাহক সমিতির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
‘আলোর পিপাসা’, ‘আগন্তুক’, ‘দর্পচূর্ণ’ সিনেমায় বিখ্যাত চিত্রগ্রাহক সাধন রায়ের সহকারী হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করেন। ১৯৬৮ সালে ‘রূপকুমারী’ সিনেমায় একক ক্যারিয়ার শুরু করেন।
স্বাধীনতার পর চিত্রা জহিরের প্রযোজনা ও কাজী জহিরের পরিচালনায় কাজ করেন ‘অবুঝ মন’ সিনেমায়। এরপর ‘বলবান’ সিনেমার মাধ্যমে পরিচালনায় নাম লেখান। ‘যাদুর বাঁশি’, ‘দ্বীপকন্যা’, ‘নতুন বউ’, ‘মি. মাওলা’, ‘প্রতারক’ তার পরিচালিত উল্লেখযোগ্য সিনেমা। দীর্ঘ জীবনে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি (বাচসাস) ছাড়াও অর্জন করেছেন চ্যানেল আই কর্তৃক প্রবর্তিত ‘ফজলুল হক স্মৃতি’ পুরস্কার।