
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, আগামী ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্য নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ইতোমধ্যে রূপরেখা ঘোষণা করেছে। বিএনপি ঘোষিত সকল পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য কর্মসংস্থান এবং কর্মপরিকল্পনা নিশ্চিত করে দল, মত, ধর্ম-বর্ণ, গোষ্ঠী নির্বিশেষে সবার জন্য একটি নিরাপদ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির পক্ষ থেকে আপনাদের সক্রিয় সমর্থন এবং সহযোগিতা চাই।
আজ শনিবার বিকেল ৪টায় ময়মনসিংহ নগরীর তারেক স্মৃতি অডিটোরিয়ামে ‘ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর জাতীয় প্রতিনিধি সমাবেশ-২০২৫’ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ভার্চুয়ালি অংশ নিয়ে এসব কথা বলেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব তারেক রহমান।
এ সময় তিনি বলেন, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর এই সমাবেশ পাহাড়ে কিংবা সমতলে বসবাসকারীদের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির দিকনির্দেশক হয়ে উঠুক। আপনাদের কাছে দেওয়া আমাদের প্রতিশ্রুতি গুলো বাস্তবায়নের সমর্থন ও সহযোগিতা চাই।
তিনি গারো, হাজং, ক্ষত্রিয়, সাঁওতাল, মালো, খাসিয়া ও মনিপুরিসহ বাংলাদেশের সমতল ভূমিতে বসবাসকারী সকল জাতিগোষ্ঠীগকে এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করার জন্য ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।
এসময় তারেক রহমান শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সঙ্গে তার আমলে ময়মনসিংহ অঞ্চলের সমতল ভূমিতে বসবাসকারী ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে আলোচনার বিভিন্ন স্মৃতি তুলে ধরেন। ১৯৭৬-৭৭ সালে এসব ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী একাধিকবার জিয়াউর রহমানের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে তাদের বিভিন্ন দাবি-দাওয়া সফল করেছিলেন বলেও স্মরণ করিয়ে দেন তিনি।
তারেক রহমান জানান, সে সময় জিয়াউর রহমান এই অঞ্চলে বিরিশিরি কালচারাল একাডেমি প্রতিষ্ঠা করে দিয়েছিলেন। এছাড়াও ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন গঠন করেছিলেন। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর জন্য সে সময় ছাত্র হোস্টেল, উচ্চ শিক্ষার ব্যবস্থাসহ সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সুব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন বলেও জানান তিনি।
এছাড়াও তারেক রহমান জানান, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের একটি নিবিড় সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। এই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর স্মৃতি বিজড়িত একটি স্থান ময়মনসিংহ বলে উল্লেখ করেন তিনি।
বিএনপি'র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের মতে, এই অনুষ্ঠানটি সচরাচর কোনো রাজনৈতিক প্রোগ্রামের মতো নয়। তার দৃষ্টিতে এই সমাবেশটির একটি মনস্তাত্ত্বিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক তাৎপর্য রয়েছে।
বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘প্রেম প্রকৃতির নিবিড় সংস্পর্শে বেড়ে ওঠা ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সদস্যরা সাধারণত শেকরের সঙ্গে বন্ধন ছিন্ন করতে চায় না। এটা শুধু বাংলাদেশে নয়, পৃথিবীর সকল রাষ্ট্রে এই বন্ধন বিদ্যমান।’ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রতি বিশ্বাস, সংস্কৃতি এবং স্বতন্ত্রবোধের প্রতি সম্মান রেখেই বিনীত আহ্বান থাকবে জানিয়ে তিনি বলেন, এই সময় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নিজস্ব যে ধর্ম ভাষা ও সংস্কৃতি আছে সেগুলো সংরক্ষণের স্বার্থে যেকোনো মূল্যে শিক্ষা কর্মদক্ষতা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা অত্যন্ত জরুরি।
তারেক রহমান জোর দিয়ে বলেন, নিজেদের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা ও চর্চার জন্য সবাইকে সমানভাবে সক্রিয় থাকা অত্যাবশ্যকীয়। শিক্ষা দীক্ষাসহ সকল নাগরিক অধিকার রক্ষা ও রাষ্ট্র কর্তৃক সকল সুযোগ সুবিধা যাতে ক্ষুদ্র জাতি গোষ্ঠীর সদস্যরা ভোগ করতে পারেন, সে লক্ষ্যে ২০০৭ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া তাদেরকে সুসংগঠিত করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন।
সেই উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় ২০১৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর বিএনপি'র অস্থায়ী সহযোগী সংগঠন হিসেবে জাতীয়তাবাদী ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম শুরু হয়।
তারেক রহমান মনে করিয়ে দেন, ‘আপনারা যারা বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করছেন বর্তমানে বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় যে সকল সুযোগ সুবিধা রয়েছে সেগুলো আপনাদের প্রতিটি সদস্যের কাছে পৌঁছে দেওয়া আপনাদের দায়িত্ব। পাহাড়ে কিংবা সমতলে বসবাসকারী প্রতিটি নাগরিকের নিজের এবং নিজ দেশের স্বার্থ সম্পর্কে যদি সচেতন থাকে তাহলে কোন অপশক্তি বিভ্রান্তি সৃষ্টির সুযোগ নিতে পারবে না।’
তিনি বলেন, ‘পাহাড়ে এবং সমতলের সব মিলিয়ে অর্ধশত ক্ষুদ্র জাতি গোষ্ঠীর বসবাস। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশ সবাইকে বাঙালি বানাতে গিয়ে ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর মনে একটি অবিশ্বাসের বীজ বপন করা হয়েছিল। কিন্তু আমরা দেখেছি স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর মন থেকে সেই অবিশ্বাস দূর করতে সক্ষম হয়েছেন।’
বিএনপির দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি ইঙ্গিত করে তারেক রহমান বলেন, ‘ভাষা, গোত্র বর্ণ কিংবা দলমত, ধর্ম, দর্শন সবার কাছে প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ সবার আগে। পাহাড়ে কিংবা সমতলে যেখানেই আমরা বসবাস করি না কেন যারা বাংলাদেশের বৈধ নাগরিক তাদের প্রথম এবং প্রধান পরিচয় আমরা বাংলাদেশি। বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে সবার সমান অধিকার রয়েছে। বিএনপি বিশ্বাস করে বাংলাদেশ শুধু বাঙালির নয়, ভিন্ন ভাষাভাষী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এবং বৈধভাবে বসবাসকারীদের সবার।’
পাহাড়ি বাঙালি ও সমতলে বসবাসকারী সবাইকে নিয়ে একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠনের কথা জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘সকলের অধিকার সমুন্নত রাখার পাশাপাশি ভাষা সংস্কৃতি ও ধর্মকে সমুন্নত রাখার জন্য জাতীয় সংসদ থেকে শুরু করে জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন কমিটিতে যোগ্য নেতৃবৃন্দকে বিএনপিতে স্থান দেওয়া হবে। পাশাপাশি শিক্ষা সংস্কৃতির জন্য বিভিন্ন ট্রাস্ট গঠন, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ব্যাংক লোনের ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দেয়ার চিন্তাভাবনা রয়েছে আমাদের।’
দেশে বিদ্যমান কোটা ব্যবস্থা সরকারি চাকরিতে নিয়োগের বিষয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বলেন, ‘পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাসকারী জনগণের জন্য নিয়োগ প্রক্রিয়াটি এখনো জটিল রয়েছে। ক্ষুদ্র জাতি গোষ্ঠীর জন্য প্রত্যয়ন পত্রসহ বিভিন্ন কাগজপত্র সংগ্রহ করা অত্যন্ত জটিল। বিএনপি জনগণের ভোটে আগামী দিনের রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সদস্যদের জন্য সরকারি চাকরিতে প্রবেশের প্রক্রিয়া কীভাবে আরও সহজ করা যায় সে ব্যাপারে চিন্তা ভাবনা করবে।’
ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সমাবেশে তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিটি জাতিগোষ্ঠীর ভাষা সংস্কৃতি ধর্ম ও মূল্যবোধের প্রতি আমাদের ব্যক্তিগতভাবে আমার এবং আমাদের দল বিএনপি'র কোনো আস্থা এবং সম্মান রয়েছে। ভাষা এবং সংস্কৃতির সংরক্ষণ এবং উন্নয়নের জন্য বিশেষ ভূমিকা রাখা আমাদের দায়িত্ব বলে আমরা মনে করি।’
বিএনপির ঘোষিত ৩১ দফায় ১৬তম দফার কথা মনে করিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘দল মত জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে পাহাড়ে এবং সমতলে বসবাসকারী সকল জাতিগোষ্ঠীর সকল নাগরিক ও ধর্মীয় অধিকার এবং সম্পদের নিরাপত্তা বিধানের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হবে। ক্ষুদ্র কিংবা বৃহৎ জনগোষ্ঠীর প্রতি এটি আমাদের অঙ্গীকার। সামনের দিনে বিএনপি ক্ষমতায় এলে প্রতিটি অঙ্গীকার পূরণ করা হবে।’
তিনি বলেন, ‘স্বৈরাচারী সরকারের আমলে হামলা মামলা উপেক্ষা করে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। পলাতক স্বৈরাচার মুক্ত বাংলাদেশ বর্তমানে প্রতিটি মানুষের নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার একটি সুযোগ সামনে এসেছেন।’
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, ভয়াবহ দানবীয় শেখ হাসিনা সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে নতুন বাংলাদেশ পেয়েছি। এখন প্রতিটা নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করা আমাদের সকলের দায়িত্ব। ক্ষুদ্রনৃগোষ্ঠী এবং জাতিগোষ্ঠীর কাওকে সংখ্যালঘু বা সংখ্যাগুরু বলা যাবে না। আমরা সবাই বাংলাদেশি। তারেক রহমানের দেওয়া ৩১ দফায় বাংলাদেশের সকল শ্রেণি পেশা ও ধর্ম বর্ণের লোকেদের কথা বলা হয়েছে। আমরা সে লক্ষ্য বাস্তবায়নে কাজ করছি।
অনুষ্ঠান শুরুর আগে ক্ষুদ্র জাতি গোষ্ঠী এক ঝাঁক তরুণ শিল্পী দ্বারা এক মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও নৃত্য পরিবেশন করা হয়। তারেক রহমানসহ উপস্থিত সকল অতিথি এবং দর্শকবৃন্দ এটি উপভোগ করেন।
এসময় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি মৃগেন হাগিদগের সভাপতিত্বে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির যুগ্ন মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আবু ওয়াহাব আকন্দ, দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক জাকির হোসেন বাবলু, সদস্য সচিব রোকনুজ্জামান সরকার, বিএনপি নেতা ডা. মাহবুবুর রহমান লিটন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী দলের ভাইস চেয়ারম্যান সুভাস চন্দ্র বর্মণসহ ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর নেতাকর্মীরা।
আজকালের খবর/ওআর