ব্যবসায়ী কিংবা প্রবাসীদের মুঠোফোনে হুমকি দেওয়া হতো লাখ থেকে কোটি টাকা চাঁদার জন্য। এরপর বাহকের মাধ্যমে নগদে সংগ্রহ করা হতো চাঁদাবাজির সেই টাকা। চাঁদার টাকা সংগ্রহের জন্য ছিল এলাকাভেদে পৃথক ব্যক্তি। তাঁরা মূলত ইউসুফ নামের এক ব্যক্তিকে চাঁদাবাজির সেই টাকা জমা দিতেন। তিনি এসব টাকা হুন্ডি এবং কয়েকটি ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে পাঠিয়ে দিতেন চট্টগ্রামের শীর্ষ সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমনের কাছে।
পুলিশ ও চাঁদাবাজির শিকার ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। গত বুধবার সকালে যশোর থেকে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পথে ইমনকে তিন সহযোগীসহ গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ইমন পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর অনুসারী হিসেবে পরিচিত। তাঁর বিরুদ্ধে অন্তত ১৫টি মামলা রয়েছে। বৃহস্পতিবার ইমনকে আদালতে সোপর্দ করা হয়। আদালত তাঁকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
২০ লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে গত সোমবার সকালে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়ার্ডের বড় দিঘিরপাড় এলাকার ব্যবসায়ী জসিম উদ্দিনের নির্মাণাধীন ভবনে হামলা ও ভাঙচুর চালানোর অভিযোগ ওঠে ইমনের অনুসারীদের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় মামলা করার পর ৫০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। এর আগে ১৩ জুলাই ২ কোটি টাকা চাঁদার জন্য নগরের বাকলিয়া এক্সেস রোডে ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ডিডিএনে হামলা ও ভাঙচুর চালানোর অভিযোগ ওঠে ইমনের অনুসারীদের বিরুদ্ধে। এই দুটি ঘটনার পর মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলন করে চাঁদাবাজি বন্ধ এবং ইমনকে গ্রেপ্তারের দাবি জানানো হয়। যদিও ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে চাঁদাবাজিসহ সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে বেপরোয়া হয়ে ওঠেন ইমন।
চাঁদা দাবির আগে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ
পুলিশ জানায়, চাঁদা চাওয়ার আগে কোনো ব্যক্তির আয়ের উৎস, বর্তমান সম্পদ, নির্মাণাধীন ভবনের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করেন ইমনের লোকজন। পরিবারের সদস্যদের জীবনবৃত্তান্তও সংগ্রহ করা হয়। তথ্য সংগ্রহের জন্য এলাকাভিত্তিক সোর্স রয়েছে ইমনের।
তথ্য সংগ্রহের পর চাঁদার জন্য বিদেশি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর থেকে ফোন করা হয় নির্ধারিত ব্যক্তিকে। কয়েক লাখ টাকা থেকে কয়েক কোটি টাকা পর্যন্ত চাঁদা দাবি করা হয়। ওই ব্যক্তির পরিবারের সদস্যদের কে কোথায় থাকেন, কী করেন, সব জানানো হয়। দাবি অনুযায়ী চাঁদা না দিলে গুলি করার হুমকি দেন ডেভিড ইমন। নির্ধারিত সময়ে টাকা না পেলে হামলার ঘটনাও ঘটে।
ইমনকে চলতি মাসের শুরুতে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দেওয়া এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা হয়। তিনি নগরের দক্ষিণ পাহাড়তলীর বড় দিঘিরপাড় এলাকার বাসিন্দা। ইমন গ্রেপ্তার হলেও এখনো ভয়ে রয়েছেন সেই ব্যবসায়ী।
গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে ওই ব্যবসায়ী বলেন, জুন মাসের শেষের দিকে বিদেশি একটি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর থেকে সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের সহযোগী পরিচয় দিয়ে ডেভিড ইমন তাঁকে ফোন করেন। তাঁর নির্মাণাধীন একটি বহুতল ভবন ও বিভিন্ন ব্যবসার কথা বলে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন ইমন। ওই সময় ওই ব্যবসায়ীর ছেলেমেয়েরা কে কোথায় পড়াশোনা করেন, তারও বিস্তারিত বর্ণনা দেন। চাহিদামতো টাকা না দিলে ব্যবসায়ীর কলেজপড়ুয়া বড় ছেলেকে শেষ করে দেওয়ার হুমকি দেন।
ওই ব্যবসায়ী জানান, নিরুপায় হয়ে বিভিন্ন লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন তিনি। এর মধ্যে রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ছিলেন। কয়েকজনের মাধ্যমে ইমনকে ফোন করা হয়। কিন্তু কারও কথা শুনতে নারাজ ছিলেন ইমন। ইতিমধ্যে নির্মাণাধীন ভবনে হামলা চালানো হয়। মারধর করা হয় নিরাপত্তা প্রহরীকে।
ওই ব্যবসায়ী বলেন, ‘এরপর আমাকে আবার ফোন করা হয়। চাঁদা দেওয়ার মতো এত টাকা নেই জানিয়ে আমি তাঁকে অনুনয়-বিনয় করে চাঁদা কমানোর অনুরোধ করি। শেষে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা নির্ধারিত হয়। ইমন তখন বলেন, আমার লোকজন নগদে টাকা নেবে। যেখান থেকে বলা হবে, সেখান থেকে নিতে পারবে।’
পরে বিদেশি হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর থেকে ফোন করে ইমনের লোক পরিচয় দিয়ে এক ব্যক্তি নগরের অক্সিজেন এলাকায় টাকা নিয়ে যেতে বলেন বলে জানান ওই ব্যবসায়ী। তিনি বলেন, ‘আমি যেতে রাজি না হওয়ায় একটি অটোরিকশায় করে দুই যুবক বড় দিঘিরপাড়ে আমার বাসার সামনে আসে। নগদ পাঁচ লাখ টাকা নিয়ে তারা আবার একই গাড়িতে করে চলে যায়।’
এই ব্যবসায়ীর মতো আরও অন্তত পাঁচজন ভুক্তভোগীর সঙ্গে কথা হয়। তাঁরা সবাই নগদে বাহকের কাছে চাঁদার টাকা পরিশোধ করেছেন। তবে নাম প্রকাশ করে এ বিষয়ে বক্তব্য দিতে তাঁরা রাজি হননি। কারণ জানতে চাইলে তাঁরা বলেন, ইমন জামিনে বেরিয়ে এলে তাঁদের ক্ষতি করতে পারেন। তা ছাড়া ইমনের অনেক সহযোগী এখনো বাইরে রয়েছেন।
ইউসুফকে খুঁজছে পুলিশ
পুলিশ জানায়, চট্টগ্রাম নগর ও জেলায় ইমনের লোকজন চাঁদার নগদ টাকা সংগ্রহ করে নিয়ে যেতেন নগরের জিইসি মোড় এলাকার একটি রেস্টুরেন্টে। সেখানে ইউসুফ নামের এক ব্যক্তিকে জমা দিতেন। পরে তিনি এসব টাকা ইমনের নির্দেশমতো হুন্ডি কিংবা ব্যাংক হিসাবে পাঠাতেন।
ইমনকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য মিলেছে জানিয়ে পুলিশ কর্মকর্তারা বলেন, ইউসুফকে ধরার চেষ্টায় রয়েছে পুলিশ। তাঁকে পেলে চাঁদাবাজির টাকা কোথায় যায়, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য বেরিয়ে আসবে।
চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা পুলিশ সুপার (হাটহাজারী সার্কেল) কাজী মোহাম্মদ তারেক আজিজ বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ইমন জানিয়েছেন, ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকতে কৌশল হিসেবে নগদে চাঁদার টাকা নিতেন। এসব টাকা যাঁরা সংগ্রহ করতেন, তাঁরা সাধারণত ওই এলাকার নন। অন্য কোনো এলাকা থেকে এসে চাঁদার টাকা সংগ্রহ করা হতো।
পুলিশের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, তাদের একটি দল তথ্য সংগ্রহ করে, আরেকটি দল নগদ টাকা গ্রহণ করে, আরেকটি হামলা-ভাঙচুর কিংবা গুলিবর্ষণের মতো ঘটনায় জড়ায়। প্রতিটি কাজের জন্য আলাদা দল রয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, রিমান্ডে আনার পর ইমনের কাছ থেকে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। ইতিমধ্যে পুলিশ তাঁর কাছ থেকে অস্ত্র উদ্ধার করেছে। চাঁদাবাজি কিংবা হামলার শিকার ভুক্তভোগী লোকজন পুলিশকে এ বিষয়ে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করতে পারেন।
ক্রিকেট ছেড়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে
ইমন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর এলাকার বাসিন্দা। দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। তাঁর বাবা মো. মুসা ওমানপ্রবাসী ছিলেন। কয়েক বছর আগে মারা গেছেন।
স্থানীয় লোকজন জানান, স্কুলে পড়ার সময় থেকেই ক্রিকেটের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় ইমনের। কাঞ্চননগর থেকে সাইকেলে করে ফটিকছড়ি কলেজ মাঠে এসে অনুশীলন করতেন। পরে নগরের অক্সিজেন মোড়ে খালার বাসায় থেকে নিয়মিত ক্রিকেট প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করেন। খেলতেন চট্টগ্রাম ব্রাদার্স একাডেমিতে। অনুশীলন করতেন কাজীর দেউড়ি স্টেডিয়ামে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের মাধ্যমে তাঁর দলে যুক্ত হন। সাজ্জাদের অন্যতম সহযোগী সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ গত বছরের ১৫ মার্চ ঢাকা থেকে গ্রেপ্তারের পর সাজ্জাদের অন্যতম সহযোগী হয়ে ওঠেন ইমন।
২০২৫ সালের ৩০ মার্চ বাকলিয়া এলাকার জোড়া খুন, একই বছরের ২৩ মে রাতে নগরের পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত এলাকায় সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া আকবর হত্যাসহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী ঘটনায় আলোচিত হন মোবারক হোসেন ইমন। তাঁর বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে অন্তত ১৫টি।
পুলিশের ভাষ্য, ইমন ১৫ থেকে ২০টি আগ্নেয়াস্ত্র বহন করেছেন—এমন তথ্য রয়েছে। অস্ত্র ব্যবহারে তিনি দক্ষ। বাকলিয়ার জোড়া খুনের ঘটনায় সন্ত্রাসী ও মোটরসাইকেল ভাড়া করার দায়িত্বও তাঁর ছিল। পুলিশের কর্মকর্তারা জানান, বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী ওরফে বড় সাজ্জাদের হয়ে বর্তমানে চট্টগ্রামে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনায় নেতৃত্ব দেওয়া দুজনের একজন ইমন। অন্যজন মোহাম্মদ রায়হান। এর আগে দেশে সন্ত্রাসী দলটির নেতৃত্ব দিতেন সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ। তিনি কারাগারে যাওয়ার পর ইমন ও রায়হান দলটির নেতৃত্বে আসেন।
পুলিশের দাবি, বড় সাজ্জাদের বাহিনীতে অন্তত ৫০ জন শুটার ও সহযোগী সক্রিয় রয়েছেন। মোহাম্মদ রায়হান ও ইমন বড় সাজ্জাদের হয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে নিয়মিত চাঁদা দাবি করে আসছেন।
গ্রেপ্তার হওয়ার কয়েক দিন আগে হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে চাঁদাবাজির অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়েছিল ইমনের কাছে। এ সময় তিনি বলেন, ‘আমি টাকা নিই এটা ঠিক, তবে সব বড়লোকদের কাছ থেকে।’ সন্ত্রাসের পথ কেন বেছে নিয়েছেন—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমার ছোটবেলা থেকে ইচ্ছা ছিল বড় ক্রিকেটার হব, নয়তো বড়লোক হব। বড়লোক হওয়ার জন্য এই পথে আছি।’
আজকালের খবর/এমকে