নিউইয়র্কের অদূরে মনোরম চেস্টনাট রিজের থ্রিফোল্ড এডুকেশনাল সেন্টারে দুই দিনব্যাপী আয়োজনে অনুষ্ঠিত হলো চতুর্থ রকল্যান্ড রিট্রিট ও বইমেলা ২০২৬। বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রসার এবং বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির মধ্যে সেতুবন্ধন গড়ে তোলার লক্ষ্যে বেঙ্গলি ইন্টারন্যাশনাল লিটারারি সোসাইটি (BILS) এ আয়োজনের উদ্যোগ নেয়। সংগঠনটি দীর্ঘদিন ধরে সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি অটিজম স্পেকট্রামে থাকা তরুণ-তরুণীদের সৃজনশীল বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
সবুজ প্রকৃতিবেষ্টিত রিসোর্টসদৃশ পরিবেশে বাংলাদেশ ও ভারতের জাতীয় সংগীত পরিবেশন করেন অ্যান্ড্রু সেঞ্চেজ, সামিনা খন্দকার ও প্রথম চক্রবর্তী। তাঁদের সম্মিলিত কণ্ঠে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। বাংলাদেশ এবং ভারতীয় জাতীয় সংগীতের ইংরেজি অনুবাদ করে শোনান ড. অনিমিতা সাহা। কনভেনর গিয়ানা মেলার স্বাগত বক্তব্যের মধ্য দিয়ে শুরু হয় মূল পর্ব।
এ বছরের প্রতিপাদ্য ছিল ‘বিশ্বসাহিত্য ও সংস্কৃতিতে শাড়ি’। এই বিষয়কে কেন্দ্র করেই সাজানো হয় পুরো আয়োজন। অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন এমেরিটাস অধ্যাপক, সাবেক উপাচার্য ও লেখক ড. মোস্তফা সারওয়ার। প্রখ্যাত কবি সুবোধ সরকার শাড়ির ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, ‘শাড়ি শুধু একটি পরিধেয় বস্ত্র নয়; এটি হাজার বছরের ঐতিহ্য, ইতিহাস, সংস্কৃতি, রাজনীতি এবং সর্বোপরি নারীর আনন্দ-বেদনা, স্বপ্ন ও সংগ্রামের এক অনন্য বাহন।’ তাঁর বিখ্যাত ‘শাড়ি’ কবিতাটি আবৃত্তি করেন শিল্পী পারভীন সুলতানা। সম্মেলনের সভাপতি, জাতিসত্তার কবি মোহাম্মদ নূরুল হুদা শাড়ির বৌদ্ধিক সম্পদ এবং এর বৈশ্বিক সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন।
এবারের আয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র, বাংলাদেশ, ভারত, আয়ারল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, গায়ানা, ডোমিনিকান রিপাবলিক ও তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশের কবি, সাহিত্যিক, গবেষক, শিল্পী ও সংস্কৃতিপ্রেমীরা অংশ নেন। উত্তর আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, ইউরোপ, এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত অংশগ্রহণকারীদের পদচারণায় পুরো আয়োজন যেন শান্তিনিকেতনের এক মিলনমেলায় পরিণত হয়। দুই দিনের এই অনুষ্ঠানে ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বন্ধনে পৃথিবী যেন একসূত্রে গাঁথা হয়েছে—এমন অনুভূতি প্রকাশ করেন অনেক অংশগ্রহণকারী।
আয়োজক ও BILS-এর পৃষ্ঠপোষক ও ছড়াবিতা কবিতার প্রনেতা ড. ধনঞ্জয় সাহা বলেন, সাহিত্যচর্চার জন্য যেমন প্রয়োজন সুস্থ ও সৃজনশীল পরিবেশ, তেমনি সৃজনশীল মনন গড়ে তুলতে দরকার স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন। এ বিষয়ে আলোচনা করেন ডা. দীপা সাহা ও ম্যারাথন রানার নাসির শিকদার। তাঁরা তেলবিহীন রান্না, নিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত শরীরচর্চা ও দৌড়ানোর উপকারিতা তুলে ধরেন। ডা. দীপা সাহা সুস্থ জীবনচর্চার মাধ্যমে ইতিবাচক চিন্তা ও সৃজনশীল লেখালেখির মানসিকতা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
অনুষ্ঠানে বাংলা, ইংরেজি, স্প্যানিশ ও তুর্কি ভাষায় মৌলিক কবিতা, গল্প ও ছড়া উপস্থাপিত হয়। ড. ধনঞ্জয় সাহা তাঁর উদ্ভাবিত ‘ছড়াবিতা’—ছড়া ও কবিতার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা নতুন সাহিত্যধারা—সম্পর্কে আলোচনা করেন। তাঁর একটি ‘ছড়াবিতা’ পাঠ করেন ইসরাত বুখারি।
মেলায় ছিল তাজা ফল, স্বাস্থ্যকর অর্গানিক খাবার, অটিস্টিক যুবক-যুবক-যুবতীদের শিল্পকর্ম প্রদর্শনী এবং লেখকদের বই প্রদর্শন ও বিক্রির ব্যবস্থা।
অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল অটিজম স্পেকট্রামে থাকা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন লেখকদের পরিবেশনা এবং Endeavor21+ Autism Program-এর অংশগ্রহণকারীদের শিল্পকর্ম প্রদর্শনী। উপরন্ত সৌখিন শিল্পী Enza ও Piera Lombardo-র শিল্পকর্মও দর্শকদের প্রশংসা কুড়ায়। এ পর্বে জন কার্লোস উডি গাথরির বিখ্যাত গান This Land Is Your Land পরিবেশন করে উপস্থিত সবার মন জয় করেন।
এছাড়া অনুষ্ঠিত হয় লাইভ ক্রিয়েটিভ রাইটিং প্রতিযোগিতা, যেখানে অনেক সম্ভাবনাময় প্রতিযোগী অংশ নেন। প্রথম স্থান অর্জন করেন ডা. কৌশিক কর। আবৃত্তি পরিবেশন করেন টিটানিয়া গুপ্তা, দ্বীপ নারায়ণ গুপ্তা, খালেদ মিঠু, নিলুফার জারিন, পারভীন সুলতানা, সংঘমিত্রা ব্যানার্জি, অশ্বিনী প্রসাদ এবং ভারতের প্রখ্যাত সারেঙ্গি শিল্পী উস্তাদ কামাল সাবরি গদ্যকবিতার মাধ্যমে বাঙালিদের আমেরিকায় আগমনের ইতিহাস তুলে ধরে ড. অশ্বিনী প্রসাদ বিশেষ প্রশংসা অর্জন করেন।
গল্প ও কবিতা পাঠ করেন ডা. তপতী রায়, বেনজির সিকদার, মোহাম্মদ কাইউম, রফিকুল ইসলাম, বনানী সিনহা, খালেদ সরফুদ্দীন, আইজ্যাক স্টেইনবার্গ, কমোলিকা পান্ডে, ইফফাত আরা, ড. মোহাম্মদ মাসুম, ড. মল্লিকা ধর-সহ আরও অনেকে। একক কবিতা পাঠ করেন ফারহানা ইলিয়াস তুলি, রকল্যান্ড পোয়েট গ্রুপের শেরিল লার্নার এবং তুরস্কের কবি মুরাত নিমিত। স্প্যানিশ ও ইংরেজিতে গল্প পাঠ করেন আইরিস তেহেদাস ও লুজ কুয়েভাস। ভ্রমণকাহিনি পাঠ করেন সুলতানা ইসমত আরা।
ওয়েস্টচেস্টার কাউন্টির স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘লিপিলেখা’র সদস্যরা, বিশেষ করে সভাপতি টিটানিয়া গুপ্তা, অনুষ্ঠানে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। লেখক ও কমিউনিটি লিডার ড. দিলীপ নাথ গত বছরের রকল্যান্ড রিট্রিট ও বইমেলার সাফল্য এবং এর সামাজিক প্রভাব নিয়ে আলোচনা করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত বিশেষ সেমিনারে বাংলা ও পাশ্চাত্য সাহিত্যের পারস্পরিক প্রভাব ও উৎকর্ষ নিয়ে আলোচনা হয়। সেমিনারটি সঞ্চালনা করেন কবি ফকির ইলিয়াস। সাংস্কৃতিক পর্বে বাংলা ও পাশ্চাত্য সংগীত পরিবেশন করেন অ্যান্ড্রু সেঞ্চেজ, ওস্তাদ কামাল সাবরি, সামিনা খন্দকার, ডা. শিউলী রায়, ডা. মো. জুলফিকার হোসেন, গৌতম সাহা ও ডা. অর্পিতা ঘোষ।
অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন কবি ও প্রকাশক হুমায়ুন কবির ডালি, শাহ জে. চৌধুরী, এবং বরেণ্য সংগীতশিল্পী রথীন্দ্রনাথ রায়। তাঁদেরকে উত্তরীয় পরিয়ে সম্মাননা জানানো হয়।
রিট্রিটের অংশ হিসেবে ছিল ফরেস্ট হাইক, যোগব্যায়াম, সাঁতার, ক্যাম্পিং, ফার্ম ট্যুর এবং প্রকৃতির সান্নিধ্যে বিশ্রামের বিশেষ আয়োজন।
দ্বিতীয় দিনের অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন ড. মোহাম্মদ মাসুম। তিনি তাঁর ভ্রমণ অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। পরে ডা. অনিমিতা সাহা ‘অন্ধকার থেকে আলোয়’ শিরোনামে নৃত্য পরিবেশন করে উপস্থিত সবাইকে মুগ্ধ করেন।
নিউইয়র্কে পরিকল্পিত শাড়ি জাদুঘরের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ড. অশ্বিনী প্রসাদ শাড়ির ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরে পুরোনো , ঐতিহ্যবাহী শাড়ি দানের আহ্বান জানান।
আয়ারল্যান্ডের ব্যারিস্টার ক্যারেন মরিস শাড়িকে ঘিরে নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন। অস্ট্রেলিয়ার শিক্ষক ক্রিস্টিন ম্যাকক্লিনও এ বিষয়ে বক্তব্য দেন।
সমাপনী পর্বে বিভিন্ন সম্মাননা ও পুরস্কার প্রদান করা হয়। পূর্ব-পশ্চিমের সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন এবং সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য BILS Award ২০২৬ প্রদান করা হয় ড. মোস্তফা সারওয়ারকে। ডা. অবনীভূষণ চৌধুরী আবৃত্তি পুরস্কার লাভ করেন অশ্বিনী প্রসাদ (ইংরেজি) ও বাংলা কবিতা আবৃত্তির পুরস্কার ছিনিয়ে নেয় কিশোরী অদ্রিতা দাস এবং কবিতায় বীণাপাণি সাহা সাহিত্য পুরস্কার অর্জন করেন বেনজির সিকদার।
এ বছর প্রথমবারের মতো প্রবর্তন করা হয় BILS Writers-in-Residence Award। এ সম্মাননা লাভ করেন ভারতের কবি সুবোধ সরকার এবং বাংলাদেশের কবি মোহাম্মদ নূরুল হুদা। এই কর্মসূচির আওতায় নির্বাচিত লেখকেরা দুই দিন থেকে চার সপ্তাহ পর্যন্ত BILS-এর পৃষ্ঠপোষকতায় অবস্থান করে সৃজনশীল সাহিত্যচর্চার সুযোগ পাবেন।
সমাপনী বক্তব্য দেন সম্মেলনের চেয়ারম্যান কবি মোহাম্মদ নূরুল হুদা ও কনভেনর গিয়ানা মেলা। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন BILS-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রেসিডেন্ট, অধ্যাপক ড. ধনঞ্জয় সাহা। অনুষ্ঠান শেষে পরিবেশ সচেতনতার প্রতীক হিসেবে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে পুদিনা গাছের চারা বিতরণ করা হয়।
আগামী বছরের রকল্যান্ড রিট্রিট ও বইমেলার তারিখ নির্ধারণ করা হয় ২৪–২৫ জুলাই ২০২৭। এই আসরের প্রতিপাদ্য হবে ‘মেঘনা থেকে মিসিসিপি’। প্রাথমিকভাবে প্রধান অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণের সম্মতি জানিয়েছেন বাংলা সাহিত্য নিয়ে গবেষণার জন্য সুপরিচিত চেক প্রজাতন্ত্রের চার্লস ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও গবেষক Dr. Blanka Notková।
আজকালের খবর/কাও