মাইলস্টোন ট্র্যাজেডিতে নিহত শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মচারীদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে তাদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করেছেন জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. জুবাইদা রহমান।
তিনি বলেছেন, ভয়াবহ এই দুর্ঘটনা পুরো জাতিকে শোকাহত করেছে। তবে শোককে শক্তিতে পরিণত করে সামনে এগিয়ে যেতে হবে এবং আহতদের সাহস ও দৃঢ়তা থেকে নতুন প্রজন্মকে শিক্ষা নিতে হবে।
মঙ্গলবার (২১ জুলাই) ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি আয়োজিত মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি শ্রদ্ধাঞ্জলি ও স্মরণসভা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, প্রথমেই আমি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি মাইলস্টোন ট্র্যাজেডিতে প্রাণ হারানো আমাদের ভাই-বোন ও ছোট্ট বন্ধুদের। মহান আল্লাহ তায়ালা তাদের সবাইকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন।
এ সময় তিনি নিহত শিক্ষার্থীদের মধ্যে– আরিয়ান, মরিয়ম, ওয়াকিয়া, রাইসা, মনিব, বোরহানউদ্দিন, বাপ্পি, শারিয়া আক্তার, নুসরাত জাহান আনিকা, সাইমা আক্তার, হুমায়ুন নূর, ফাতেমা, মোহাম্মদ জুনায়েদ হাসান, সাদ শাফিয়াউদ্দিন, তাসনিম আফরোজ, মাহিদ হাসান, আব্দুল্লাহ শামিম, তাহিয়া আশরাফ, নাজিয়া, মাহতাব রহমান, শায়ান ইউসুফ, তারিফ ফারহান, মোহাম্মদ আফনান ফয়াজ, শামিউল করিম, আব্দুল মুসাব্বির মাহমুদ, চান্দ মারমা, সাহিল ফারাবি, আরিয়ান মাহিয়া, তাসলিম, তাসনিয়া হক ও তানভীর আহমেদের নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন।
তিনি আরও স্মরণ করেন রজনী ইসলাম, লামিয়া আক্তার, আফসানা প্রিয়া, কো-অর্ডিনেটর মেহরিন চৌধুরী, সিনিয়র শিক্ষক মাসুকা বেগম, সিনিয়র শিক্ষক মাহফুজা খাতুন এবং কর্মচারী মাসুমা বেগমকে।
ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, আজ এমন একটি দিন, যেদিন পুরো দেশ ও জাতি গভীরভাবে শোকাহত। এই আকস্মিক ও ভয়াবহ দুর্ঘটনা আমাদের সবাইকে হতবাক করে দিয়েছে। যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের পরিবারের প্রতি সমগ্র জাতি সমবেদনা জানাচ্ছে। আমি ক্ষতিগ্রস্ত সব পরিবারের প্রতি গভীর শোক ও আন্তরিক সমবেদনা জানাই।
আহত শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পরও আপনারা যেভাবে সাহস ও সংকল্প নিয়ে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন, তা জাতি কোনোদিন ভুলবে না। শোকের মধ্যেও আপনারা যে দৃঢ়তা দেখিয়েছেন, তা সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক।
তিনি বলেন, এই অভিজ্ঞতা আপনাদের জীবনের যেকোনো সংকট মোকাবিলায় সাহস জোগাবে। অন্যের দুঃখে পাশে দাঁড়ানোর শক্তি দেবে। আপনাদের মানবিকতা, সহমর্মিতা ও আত্মবিশ্বাস জাতির কাছে অনুসরণীয় হয়ে থাকবে।
মাইলস্টোন ট্র্যাজেডির সময় উদ্ধার ও চিকিৎসা কার্যক্রমে অংশ নেওয়া বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ভূয়সী প্রশংসা করেন ডা. জুবাইদা রহমান। তিনি ফায়ার সার্ভিস, চিকিৎসক, নার্স, স্বেচ্ছাসেবক, ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ড্যাব), রহমান ফাউন্ডেশন এবং জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ধন্যবাদ জানান।
একই সঙ্গে যুক্তরাজ্য, চীন, ভারত ও সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।
ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, সংকটের সেই মুহূর্তে বহু মানুষ নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অন্যের পাশে দাঁড়িয়েছেন। মানবতার এমন দৃষ্টান্ত ইতিহাসে বিরল। সেদিন আমরা দেখেছি মানুষের জন্য মানুষ এখনও নিঃস্বার্থভাবে এগিয়ে আসে।
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনারা একা নন। যে সহমর্মিতা ও সহযোগিতার হাত আপনারা সেই কঠিন সময়ে অনুভব করেছেন, সেই হাত সবসময় আপনাদের পাশে থাকবে। দেশের মানুষ আপনাদের দুঃখ ভাগ করে নিয়েছে এবং ভবিষ্যতেও পাশে থাকবে।
বক্তব্য শেষে আহত এবং নিহত পরিবারের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানান, ২০২৫ সালের ২১ জুলাই মাইলস্টোন স্কুলে ঘটে যাওয়া সেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি আমাদের ইতিহাসের অন্যতম একটি কালো অধ্যায়। সেদিন নিজের জীবনের পরোয়া না করে শিক্ষিকা মাহেরিন চৌধুরী যেভাবে আগুনে পোড়া বাচ্চাদের উদ্ধার করতে গিয়ে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন, আমি তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের পরিচালক ডা. মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন বলেন, দগ্ধ রোগীদের চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। একটি উন্নয়নশীল দেশের সরকারের পক্ষে এই বিপুল ব্যয় একাকী বহন করা কঠিন। তাই এর স্থায়ী সমাধানের জন্য আমাদের বার্ন প্রতিরোধ ও সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। উন্নত দেশগুলো সচেতনতার মাধ্যমে দগ্ধ রোগীর সংখ্যা ৫০ শতাংশ কমিয়ে এনেছে।
স্মরণসভায় আরও উপস্থিত ছিলেন– স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত, ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন, বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী এবং ড্যাবের সভাপতি ডা. হারুনুর রশীদ, জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশন এর নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ডা.ফরহাদ হালিম ডোনার এবং উপস্থাপনায় ছিলেন ডা শাওন বিন রহমানসহ জাতীয় বার্ন ইউনিটের চিকিৎসকরা।
অনুষ্ঠানে আহত ও নিহতদের পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। এসময় মাইলস্টোন ট্র্যাজেডিতে সহায়তাকারী বেশ কিছু সংগঠন ও ব্যক্তিকে সম্মাননা প্রদান করা হয়।
অনুষ্ঠানের মাইলস্টোন ট্র্যাজেডিতে নিহতদের স্মরণে ১ মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এ সময় নিহতদের স্বজন, আহত শিক্ষার্থী, শিক্ষক, চিকিৎসক, স্বেচ্ছাসেবক এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও উপস্থিত ছিলেন।
আজকালের খবর/বিএস