মঙ্গলবার ৭ জুলাই ২০২৬
রাজমুকুট সবার জন্য নয় রোনালদো!
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৭ জুলাই, ২০২৬, ১:৪১ পিএম  আপডেট: ০৭.০৭.২০২৬ ১:৪৪ পিএম  (ভিজিট : ২১)
একসময় লেখা হত—দিয়েগো মারাদোনা গুড, পেলে বেটার, জর্জ বেস্ট। যাঁকে নিয়ে অজস্র কালি খরচ হয়েছে, সেই জর্জ বেস্ট কোনওদিন বিশ্বকাপের মঞ্চে পা রাখার সুযোগই পাননি।

চার্লি চ্যাপলিন সিনেমাকে দিয়েছিলেন এক নতুন ভাষা, এক নতুন ব্যাকরণ। অথচ শ্রেষ্ঠ অভিনেতা বা শ্রেষ্ঠ পরিচালকের অস্কার তাঁর ঝুলিতে ওঠেনি। ইতিহাস সবসময়ে যোগ্যদের হাতে সর্বোচ্চ পুরস্কার তুলে দেয় না। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো গল্পটাও তেমনই। 

বিশ্বকাপ এমন এক মঞ্চ, যেখানে কিংবদন্তিদের সব স্বপ্ন সফল হয় না। কেউ প্রতিপক্ষের জালে বল জড়িয়ে ইতিহাস লিখে যান, কেউ ড্রিবলিংয়ের জাদুতে থামিয়ে দেন সময়ের গতি, আবার কেউ কেউ রেখে যান দীর্ঘ প্রতীক্ষা আর অপূর্ণতার এক মহাকাব্য।

সিআর সেভেনের বিশ্বকাপ-যাত্রাও ছিল তেমনই এক দীর্ঘ অপেক্ষার গল্প। ২০০৬ থেকে ২০২৬—দুই দশক ধরে তিনি লড়েছেন, অপেক্ষা করেছেন, স্বপ্ন দেখেছেন। কিন্তু সেই কাঙ্ক্ষিত ট্রফি আর ছোঁয়া হল না। প্রতিবারই বিশ্বকাপের মঞ্চ থেকে ফিরতে হয়েছে একরাশ হতাশা আর না-পাওয়ার যন্ত্রণা নিয়ে। 

২০০৬ সালে জার্মানির মাটিতে জিনেদিন জিদানের ফ্রান্স থামিয়ে দিয়েছিল তরুণ রোনালদোর স্বপ্নের দৌড়। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচেও জার্মানির কাছে হারতে হয়েছিল পর্তুগালকে।

২০১০ সালে স্পেনের অপ্রতিরোধ্য তিকিতাকার সামনে শেষ ষোলোয় থেমে যায় পর্তুগালের পথচলা। ২০১৪ সালে গ্রুপ পর্বেই থেমে যায় রোনালদোর অভিযান। ২০১৮ সালে উরুগুয়ের বাধা আর টপকানো সম্ভব হয়নি। ২০২২ সালে কোয়ার্টার ফাইনালে থেমেছিল স্বপ্ন। আর এবার শেষ হলো রাউন্ড অফ ১৬-তেই। গল্পের শেষ অধ্যায়ে গিয়ে সব নায়ক জয়ী হন না। রোনাল্ডোও হলেন না। 

তাঁকে দেখে কষ্ট হচ্ছিল। না পাওয়ার যন্ত্রণা, পরাজয়ের গ্লানি, ব্যর্থতার ধাক্কা লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছিলেন। তারপর ধীর পায়ে এগিয়ে গেলেন টানেলের দিকে। তাঁর দীর্ঘ ছায়া ধীরে ধীরে হারিয়ে গেল অন্ধকারে। বিদায়, রোনাল্ডো। বিশ্বকাপের মঞ্চে আর দেখা যাবে না পর্তুগালের মহানায়ককে।

স্পেন ১-০ গোলে হারিয়ে পৌঁছে গেল কোয়ার্টার ফাইনালে। এই লড়াইটার পারদ চড়ছিল দুই প্রজন্মের দুই তারকাকে সামনে রেখে। একদিকে ভবিষ্যতের প্রতীক লামিন ইয়ামাল। অন্যদিকে অস্তগামী সূর্য রোনাল্ডো। ইয়ামাল বল পায়ে সাবলীল গতি তুললেন উইংয়ে। স্প্যানিশ আর্মাডারা কখনও কখনও পর্তুগালের রক্ষণে কাঁপুনি ধরিয়ে দিচ্ছিলেন।  কিন্তু পর্তুগিজ গোলকিপার দিয়েগো কোস্তা বুক চিতিয়ে লড়ে যাচ্ছিলেন। ড্যানি ওলমোদের বিষ শুষে নিচ্ছিলেন পর্তুগিজ গোলকিপার।  

সবার নজর তো ছিল ৪১-এর রোনালদোর দিকে। যে রোনাল্ডো একসময় বল পায়ে ঝড় তুলতেন, প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের আতঙ্কে রাখতেন, সেই গতির ঝলক আর আগের মতো দেখা গেল না। বয়স তাঁর শরীরের ওপর নিজের স্বাক্ষর রেখে গিয়েছে। দৌড়ের মধ্যে নেই আগের সেই অপ্রতিরোধ্য ছন্দ।

বরং অনেক সময়ে তাঁর উপস্থিতিই দলের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছিল। তিনি আর আগের সেই দুরন্ত ঘোড়া নন, যিনি একাই ম্যাচের গতিপথ বদলে দিতে পারেন। একটা সময় যে নাম শুনলেই প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডাররা সতর্ক হয়ে যেতেন, এখন সেই ভয়টা আর আগের মতো নেই। 

স্পেনের বিরুদ্ধেও ছবিটা বদলাল না। রোনাল্ডো চেষ্টা করলেন, লড়লেন, কিন্তু সেই পুরনো ধার আর খুঁজে পাওয়া গেল না।

প্রথমার্ধে একবার তাঁর শক্তিশালী শট প্রতিপক্ষকে ভাবতে বাধ্য করেছিল। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে সতীর্থদের কাছ থেকেও তিনি পাননি প্রয়োজনীয় সহায়তা। ধীরে ধীরে হতাশা ঘিরে ধরছিল তাঁকে। 

দ্বিতীয়ার্ধে নুনো মেন্দেসের চোট পর্তুগালের ছন্দে আঘাত করল। শেষের দিকে স্পেনের কোচ দে লা ফুয়েন্তের পরিবর্তন সোনা  ফলিয়ে গেল। ৮৪ মিনিটে মিকেল মেরিনোকে মাঠে পাঠানো হয়। অতিরিক্ত সময়ে ফেরান তোরেসের পাস থেকে সেই মিকেল মেরিনো নিখুঁত ফিনিশ করেন। তখনই বঝা গিয়েছিল পর্তুগালের স্বপ্ন শেষ। তাও শেষ মুহূর্তে বার্নার্ডো সিলভার হেড সামান্যর জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। তারপর আর প্রত্যাবর্তনের গল্প লেখা সম্ভব হয়নি পর্তুগালের পক্ষে। 

এবারের বিশ্বকাপ শুধুমাত্র একটি ফুটবল টুর্নামেন্ট ছিল না। এটি ছিল তিন মহাতারকার শেষবারের মতো একই আকাশে আলো ছড়ানোর গল্প। 

নরওয়ের কাছে হেরে নেইমারের বিশ্বকাপ অধ্যায় শেষ হয়ে গিয়েছে। আজ শেষ হলো রোনালদোর দীর্ঘ পথচলা। পড়ে রইলেন শুধু লিওনেল মেসি। যিনি ইতিমধ্যেই নিজের বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন পূরণ করেছেন।

কল্পনার এক মঞ্চে যদি মেসি আর রোনাল্ডো মুখোমুখি বসেন, হয়তো সেই কথোপকথনের শেষটা এমন হতে পারে, “আমার কাছে বিশ্বকাপ আছে… তোমার কাছে?”

কিন্তু জীবন তো সবসময় রূপকথার মতো হয় না। সব গল্পের নায়ক শেষ পর্যন্ত জেতেনও না। সব কিংবদন্তির বিদায়ও সোনার অক্ষরে লেখা হয় না। কিছু বিদায় লেখা হয় চোখের জলে। আর সেই অশ্রুই তাঁদের আরও গভীরভাবে মানুষের হৃদয়ে বাঁচিয়ে রাখে।

রোনাল্ডো ট্রফি নিয়ে বিদায় নিলেন না, কিন্তু রেখে গেলেন অনেক স্মৃতি। তাঁর দৌড়, তাঁর গোল, তাঁর লড়াই সবকিছুই থেকে যাবে ফুটবল ইতিহাসের পাতায় পাতায়। রাজা সাজা আর হল না রোনালদোর। হৃদয়ের রাজা হয়েই থেকে গেলেন চিরকাল। 

আজকালের খবর/এমকে









Advertisement
Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রাপা প্লাজা( ৭ম তলা), রোড-২৭ (পুরাতন) ১৬ (নতুন), ধানমন্ডি, ঢাকা -১২০৯।
ফোন: ৪১০২১৯১৫-৬, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor$gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor$gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রাপা প্লাজা( ৭ম তলা), রোড-২৭ (পুরাতন) ১৬ (নতুন), ধানমন্ডি, ঢাকা -১২০৯।
ফোন: ৪১০২১৯১৫-৬, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor$gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor$gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft