শিল্পকলা একাডেমির ব্যবস্থাপনায় আয়োজিত ‘পূর্ণিমা তিথির সাধুমেলা’ এবং লালন দর্শন ও লালন সংগীত বিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মশালায় ফকির লালন শাহের দর্শন ও নদীয়ার সাধনার ধারাকে ‘বিকৃত’ করার অভিযোগ উঠেছে।
এই অভিযোগ তুলে কবি ও চিন্তক ফরহাদ মজহারের নেতৃত্বে ‘সাধু-গুরু, ভক্ত-অনুরাগী ও নাগরিক সমাজ’ ব্যানারে প্রতিবাদলিপি দেওয়া হয়েছে একাডেমির মহাপরিচালক রেজাউদ্দিন স্টালিনের কাছে।
গত ২৯ জুন শিল্পকলায় শুরু হওয়া এই আয়োজনগুলো নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে ‘দুর্নীতি ও সাংস্কৃতিক দখলদারত্বের’ নিরপেক্ষ তদন্তসহ আট দফা দাবি তোলা হয়েছে প্রতিবাদলিপিতে।
সেখানে অভিযোগ করা হয়েছে, লালন শাহকে নদীয়ার দীর্ঘ ফকিরি ঘর থেকে বিচ্ছিন্ন করে দীর্ঘদিন ধরে যারা ‘বাউল সম্রাট’, ‘গাঁজাখোর-সাধু’ কিংবা ‘সমাজবিচ্ছিন্ন কাল্ট চরিত্র’ হিসেবে দেশ বিদেশে হাজির করেছে, বর্তমান প্রশাসনও তাদেরই শিল্পকলার মঞ্চে পুনর্বাসন করছে।
কিন্তু গোটা আয়োজনে বা প্রশিক্ষণ কর্মশালায় অংশ নেওয়া ঠিক কাদের বিরুদ্ধে আপত্তি রয়েছে, সে সম্পর্কে স্পষ্ট কিছু স্মারকলিপিতে বলা হয়নি।
এ বিষয়ে ফরহাদ মজহার বলেন, “আমরা মহাপরিচালককে স্মারকলিপি দিয়েছি। উনি আমাদের দাবিগুলো পড়েছেন এবং এগুলোর সঙ্গে একমত হয়েছেন। যারা আমাদের সঙ্গে ছিলেন, তাদের সামনেই মহাপরিচালক দাবিদাওয়ার প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছেন। শিল্পকলার মত একটা জাতীয় প্রতিষ্ঠানকে কিছু লোক যেন জবরদস্তি করে দখল করে রাখতে চাইছে।
“কোনো কর্মশালা করতে চাইলে তো আসলে কমিটির দায়িত্ব পাওয়া দরকার। যেখানে লালনের গান ও দর্শন নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা, সেখানে এমন কিছু লোক দায়িত্ব নিয়ে বসে আছে, যাদের লালনের গান সম্পর্কে কোনো ধারণাই নাই। অথচ গানের সাধনা তো একটা অত্যন্ত গভীর বিষয়, সাধুদের নিজস্ব একটা ধারা আছে।”
তিনি বলেন, “বাউলদের নামে শিল্পকলাকে এভাবে দখল করে জবরদস্তিমূলক ফোরাম তৈরি করার পুরো ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কবি হিসেবে মহাপরিচালকের সঙ্গে আমার সবসময় একটা বন্ধুত্ব আছে। তাকে আমি বলেছি, যেন দ্রুত এর একটি সমাধান করা হয়।”
ফরহাদ মজহারের ভাষ্য, শিল্পকলা একাডেমির ভেতরের পরিস্থিতি দেখে তার মনে হয়েছে, বর্তমান মহাপরিচালকও ‘এক ধরনের অসহায়ত্বের’ মধ্যে আছেন।
“এর কারণ আওয়ামী লীগের আমলের কর্মকর্তা ও সুবিধাভোগীদের একাংশ এখনও সেখানে হুমকি দিচ্ছে এবং ঠিকমত অফিস না করে জবরদস্তিমূলক প্রোগ্রামগুলো চালু রাখতে চাইছে।”
স্মারকলিপিতে তোলা দাবিগুলো হল–
>> ‘সাধুমেলা’ নামে কোনো আয়োজন করতে হলে সেখানে প্রকৃত সাধু-গুরু, নদীয়ার পাঁচ ঘরের অনুসারী, লালন ধামের ভক্ত-অনুরাগী, আখড়া ও ধাম সংলগ্ন সাধন সমাজের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। লালন দর্শন ও লালন সংগীত বিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মশালার প্রশিক্ষক নির্বাচন কোন মানদণ্ডে হয়েছে, তা প্রকাশ করতে হবে। বিতর্কিত, অজ্ঞ, লালনের সুর-ভাব-বাণী বিকৃতকারী এবং লালন ধারায় অগ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের প্রশিক্ষক হিসাবে রাখা যাবে না।
>> লালন বিষয়ক জাতীয় পর্যায়ের প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও চর্চার দায়িত্ব লালন একাডেমির হাতে ন্যস্ত করতে হবে। লালন একাডেমিকে আর্থিক, গবেষণাগত ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী করতে হবে, যাতে লালনচর্চা ঢাকার ‘আমলাতান্ত্রিক ও সাংস্কৃতিক ধান্দাবাজির’ হাতে বন্দি না থাকে।
>> নদীয়ার পাঁচ ঘরের অনুসারী, আখড়া, ধাম, সাধু-গুরু ও ভক্তসমাজের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে লালনচর্চা, সাধুসঙ্গ, আখড়া ও ধামভিত্তিক নিয়মিত কার্যক্রমের জন্য রাষ্ট্রীয় বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। বরাদ্দ ঢাকায় বসে সুবিধাভোগীদের হাতে না দিয়ে প্রকৃত ‘সাধনক্ষেত্র ও সাধকসমাজের’ কাছে পৌঁছাতে হবে।
>> শিল্পকলা একাডেমির পোস্টার, প্রচারপত্র ও ভিজ্যুয়াল উপস্থাপনায় লালন ধারার ভুল, গেরুয়ানির্ভর বা সাম্প্রদায়িকভাবে বিভ্রান্তিকর চিহ্ন ব্যবহার অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। এ বিষয়ে সাধুসমাজ ও সংশ্লিষ্ট গবেষকদের পরামর্শ বাধ্যতামূলক করতে হবে।
>> সাবেক মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকীর সময়কার শিল্পকলা একাডেমির অনিয়ম, দুর্নীতি, দলীয়করণ, সাংস্কৃতিক দখলদারি এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভূমিকা নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। তদন্ত প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।
>> লালনকে ‘বাউল ব্র্যান্ড’ বানানোর সাংস্কৃতিক ব্যবসা থেকে সরে এসে লালন ফকির, নদীয়ার ভাবধারা, গুরুবাদ, মুর্শিদি সাধনা এবং সাধুসমাজের মর্যাদা রক্ষায় স্পষ্ট নীতিগত অবস্থান নিতে হবে শিল্পকলা একাডেমির।
এসব দাবি বিষয়ে শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক রেজাউদ্দিন স্টালিন বলেন, “ফরহাদ মজহার দেশের একজন বড় চিন্তাবিদ ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। উনাদের দেওয়া দাবিগুলো আমরা অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করব। যে পর্যবেক্ষণগুলো আছে, সেগুলো মান্য করে নীতি নির্ধারণের সর্বোচ্চ চেষ্টা আমরা করব।”
আজকালের খবর/আতে