রবিবার ২১ জুন ২০২৬
তারেক রহমান : বগুড়া থেকে কুয়ালালামপুর
প্রকাশ: রোববার, ২১ জুন, ২০২৬, ১২:২২ এএম   (ভিজিট : ৬)
রাজনৈতিক জীবনের এক বৃত্ত পূরণ করতে যাচ্ছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দেশের একাদশ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন তিনি। আর সরকারপ্রধান হিসেবে আজ রোববার (২১ জুন) তিনি প্রথম বিদেশ সফরে যাচ্ছেন। এর মধ্য দিয়ে তাঁর দীর্ঘ ৩৮ বছরের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার এক নতুন মাত্রায় উন্নীত হতে যাচ্ছে।

মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আজ বিকেলে কুয়ালালামপুরের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করবেন। এরপর আগামীকাল সোমবার (২২ জুন) বিকেলে তিনি চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের আমন্ত্রণে চীন সফরে যাবেন। মালয়েশিয়ায় তাঁর এই সফরে বাণিজ্য সম্প্রসারণ, শ্রমবাজারে সহযোগিতা এবং বিনিয়োগের সুযোগ বৃদ্ধির বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে। প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরে দু'টি সমঝোতা স্মারক ও দু'টি ‘নোট অব এক্সচেঞ্জ’ সই হতে পারে।

তাঁর এই সফরকে ঘিরে আশায় বুক বেঁধেছেন মালয়েশিয়া প্রবাসী বাংলাদেশিরা। রাজধানী কুয়ালালামপুরসহ দেশটির বিভিন্ন রাজ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রবাসীরা তারেক রহমানের সফরকে তাদের জন্য এক বড় সুযোগ হিসেবে দেখছেন। দেশটিতে বর্তমানে প্রায় ১২ লাখ বাংলাদেশি বসবাস করছেন। এর মধ্যে লক্ষাধিক মানুষ বিভিন্ন কারণে অনিয়মিত অবস্থায় রয়েছেন। কেউ নিয়োগকর্তার প্রতারণার শিকার হয়েছেন, আবার কেউবা কর্মসংস্থানের সংকটে বৈধ অবস্থান হারিয়েছেন। তাঁরা সবাই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন। প্রবাসীদের আশা, এই সফরের মাধ্যমে শ্রমবাজার পুনরায় চালু, সিন্ডিকেটমুক্ত কলিং ভিসা, অনিয়মিত কর্মীদের বৈধতার সুযোগ এবং দূতাবাস সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। মালয়েশিয়ায় কর্মরত বাংলাদেশিদের প্রধান দাবির মধ্যে শীর্ষে রয়েছে স্বচ্ছ ও সিন্ডিকেটমুক্ত কর্মী নিয়োগ ব্যবস্থা।  

মালয়েশিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরাও এই সফরকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। তাঁরা উচ্চশিক্ষা, গবেষণা সহযোগিতা, শিক্ষার্থী বিনিময় এবং স্কলারশিপ বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে, ব্যবসায়ী মহল আশা করছে, সফরের মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগে নতুন গতি আসবে। হালাল শিল্প, প্রযুক্তি, কৃষি ও উৎপাদন খাতে যৌথ উদ্যোগ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।

আগামীকাল তারেক রহমান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে একান্ত বৈঠক করবেন। পরে দুই দেশের সরকার প্রধানের নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। সেখানে পারস্পরিক দ্বিপাক্ষিক বিষয় আলোচনা হবে। এতে উঠে আসবে মালয়েশিয়ার বিভিন্ন সেক্টরে নতুন বাংলাদেশি কর্মী নেওয়া, আসিয়ানে বাংলাদেশের যোগদান এবং রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে মালয়েশিয়ার সমর্থন চাওয়ার বিষয়টিও।

তবে বাংলাদেশের মানুষ মালয়েশিয়ার পাশাপাশি তারেক রহমানের চীন সফরের দিকেও খুব আগ্রহ সহকারে চোখ রাখছেন। প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া ও চীন সফর উপলক্ষে গতকাল শনিবার (২০ জুন) ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেন পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম। তিনি জানান, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ১৩টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ), দু‘টি চুক্তি, একটি অ্যাকশন প্ল্যান এবং একটি প্রটোকলসহ মোট ১৫ থেকে ১৭টি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি সই হওয়ার কথা রয়েছে। একই সঙ্গে বহুল আলোচিত তিস্তা প্রকল্প নিয়েও আলোচনা হবে।      

পররাষ্ট্র সচিব জানান, মালয়েশিয়া ও চীন সফরে প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী প্রতিনিধি দল তুলনামূলকভাবে ছোট রাখা হয়েছে। দুই সফরেই প্রতিনিধি দলের সদস্য সংখ্যা ২৭ থেকে ২৮ জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে। আগামী ২৫ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন। এছাড়া ২৬ জুন তিনি চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। 

চীন সফরকালে প্রধানমন্ত্রী লিয়াওনিং প্রদেশের দালিয়ানে ২৩ থেকে ২৫ জুন অনুষ্ঠেয় ‘নিউ চ্যাম্পিয়নস’-এর ১৭তম বার্ষিক সম্মেলনে (সামার দাভোস ফোরাম) অংশ নেবেন। ‘ইনোভেটিং অ্যাট স্কেল’ প্রতিপাদ্য নিয়ে আয়োজিত এ ফোরামে ৯০টিরও বেশি দেশ ও অঞ্চলের ১ হাজার ৭০০-এর বেশি প্রতিনিধি অংশ নেবেন। সেখানে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবণতা, প্রযুক্তিগত অগ্রগতি এবং উদ্ভাবননির্ভর প্রবৃদ্ধি নিয়ে আলোচনা হবে। প্রধানমন্ত্রী আগামী শুক্রবার রাতে দেশে ফিরবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে মালয়েশিয়ায় আসার সিদ্ধান্ত নিয়ে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করতে যাচ্ছেন তারেক রহমান। বিশ্ব ও আঞ্চলিক রাজনীতির নানা হিসেব-নিকেশ চিন্তা করেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। রাজনৈতিক জীবনে নানা চড়াই-উৎরাইয়ের মধ্য দিয়ে যাওয়া তারেক রহমানের এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশকে একটি নির্দিষ্ট বলয়ের বাহিরে যেতে নিয়ামক ভূমিকা পালন করবে। 

এই মালয়েশিয়ার সাথে তারেক রহমানের এক আত্মিক সম্পর্ক রয়েছে। তাঁর একমাত্র ছোট ভাই ছিলেন আরাফাত রহমান কোকো। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে তিনি ২০১৫ সালের ২৪ জানুয়ারি মালয়েশিয়ায় নির্বাসিত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। বাবা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দেখানো পথ অনুসরণ করে সেই মালয়েশিয়াতেই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেশের বাইরে প্রথম পা রাখছেন তারেক রহমান।

১৯৮৮ সালে পৈতৃক নিবাস বগুড়ার গাবতলী থানা বিএনপির প্রাথমিক সদস্য পদ গ্রহণের মধ্য দিয়ে তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির রাজনীতিতে নাম লেখান। ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর ২০০২ সালে তিনি দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব নির্বাচিত হন। এরই ধারাবাহিকতায় দলের কাউন্সিল অধিবেশনের মধ্য দিয়ে ২০০৯ সালে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন তিনি।  

এক-এগারোর সময় ২০০৭ সালের ৭ মার্চ তারেক রহমানকে গ্রেফতার করা হয়। প্রায় ১৮ মাস কারাবরণের পর ২০০৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর কারাগার থেকে তিনি মুক্তি পান। এরপর লন্ডনে তাঁকে দীর্ঘ ১৮ বছর নির্বাসিত জীবন পার করতে হয়েছে। বিদেশে ১৭ বছর ৩ মাস ১৩ দিন নির্বাসিত জীবন শেষে গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর ঢাকায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করেন তিনি। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর গত ৯ জানুয়ারি দলের নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন তারেক রহমান।   

গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। ১৭ ফেব্রুয়ারি দেশের একাদশ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি শপথ গ্রহণ করেন। সরকারপ্রধান হিসেবে চার মাস দায়িত্ব পালনের পর ২১ জুন তিনি প্রথমবারের মতো পা রাখতে যাচ্ছেন দেশের বাইরে। আর তাঁর এই ঐতিহাসিক সফরে সঙ্গী হিসেবে থাকতে পারেন স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান। তারেক রহমানকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত কুয়ালালামপুরও। গতকাল শনিবার বিকেলে একপশলা বৃষ্টি হয়েছে। প্রকৃতিও যেন বলছে, ‘স্বাগত, তারেক রহমান!’







আরও খবর


Advertisement
Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রাপা প্লাজা( ৭ম তলা), রোড-২৭ (পুরাতন) ১৬ (নতুন), ধানমন্ডি, ঢাকা -১২০৯।
ফোন: ৪১০২১৯১৫-৬, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor$gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor$gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রাপা প্লাজা( ৭ম তলা), রোড-২৭ (পুরাতন) ১৬ (নতুন), ধানমন্ডি, ঢাকা -১২০৯।
ফোন: ৪১০২১৯১৫-৬, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor$gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor$gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft