সাম্প্রতিক সময়ে স্থানীয় সরকার বিভাগ ঢাকা শহরের হকার ব্যবস্থাপনা নিয়ে নীতিমালা প্রণয়ন করলেও, সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়া হকারদের ফুটপাত ও সড়কে বসার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)।
সংগঠনটির মতে, অপরিকল্পিত, স্বেচ্ছাচারী ও অপরিণামদর্শী এ উদ্যোগ রাজধানীর নাগরিকদের চলাচলে আরও বড় ধরনের ভোগান্তি ও বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে পারে।
শুক্রবার (১৫ মে) আইপিডির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান এক বিবৃতিতে এসব কথা বলেন।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, হকার সমস্যা শুধু ঢাকা শহরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, দেশের বিভিন্ন নগর এলাকাতেও এটি পথচারীদের চলাচলে বাধা, নিরাপত্তাহীনতা এবং জনজীবনে ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ কারণে সারা দেশের নগর এলাকার জন্য সমন্বিত হকার ব্যবস্থাপনা নীতিমালা প্রণয়ন ও কার্যকর বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেছে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)।
পাশাপাশি হকার সমস্যা সমাধানে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য এবং কমিউনিটিভিত্তিক নজরদারির ওপরও গুরুত্বারোপ করেছে সংস্থাটি।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, দেশের নগর এলাকাগুলোর জন্য একটি কার্যকর হকার নীতিমালার প্রয়োজন দীর্ঘদিন ধরেই ছিল। দেরিতে হলেও এ নীতিমালা প্রণয়ন হকারদের জন্য পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার একটি সূচনা হতে পারে।
তবে আইপিডির মতে, নীতিমালাটিতে মেগাসিটিতে নাগরিকদের নিরাপদ চলাচলের অধিকার আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। হকার ব্যবস্থাপনা ও ফুটপাতে পথচারীদের চলাচলের অধিকারের মধ্যে যে ধরনের সমন্বয়ের কথা বলা হয়েছে, তা যথেষ্ট প্রশ্নবিদ্ধ বলেও মনে করছে সংস্থাটি।
আইপিডির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, নীতিমালা প্রণয়নের পর যথাযথ পরিকল্পনাগত বিশ্লেষণ ছাড়াই হকারদের ফুটপাতের পাশাপাশি সড়কেও দাগ টেনে ব্যবসার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে, যা অত্যন্ত অবিবেচনাপ্রসূত ও বিস্ময়কর।
সংস্থাটি উল্লেখ করে, অল্প কিছুদিন আগে হকার উচ্ছেদের ফলে রাজধানীর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কে নাগরিকদের স্বস্তিতে হাঁটার যে সুযোগ তৈরি হয়েছিল, তা আবারও হারিয়ে গেছে। তাদের মতে, এটি সরকারের নীতি ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে অসামঞ্জস্য এবং দিকভ্রান্ত অবস্থানের বহিঃপ্রকাশ।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ফুটপাত ও সড়কে হকারদের অবাধে ব্যবসার সুযোগ দেওয়ার আইনি ভিত্তি ও যৌক্তিকতা নিয়েও নাগরিকদের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। পথচারীদের চলাচল ও যানবাহন চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে সিটি করপোরেশন এ ধরনের ব্যবস্থা নিতে পারে কি না—সে বিষয়টিরও যৌক্তিক ও আইনি মীমাংসা প্রয়োজন বলে মনে করছে আইপিডি।
একইসঙ্গে যথাযথ লাইসেন্স, কর ও ফিস প্রদানের মাধ্যমে দোকান বা মার্কেটে ব্যবসা করা ব্যবসায়ীদের অনেক ক্ষেত্রেই হকারদের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতায় পড়তে হচ্ছে।
আইপিডির মতে, প্রস্তাবিত হকার নীতিমালায় পথচারীদের জন্য মাত্র ৫ থেকে ৬ ফুট জায়গা রাখার শর্ত মেগাসিটির আধুনিক নগর পরিকল্পনার মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সংস্থাটি মনে করে, এ নীতিমালায় রাস্তার আয়তন ও বিভিন্ন এলাকার বৈশিষ্ট্যগত পার্থক্য যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।
বিবৃতিতে বলা হয়, নগর পরিকল্পনার সূচক অনুযায়ী বড় শহরের আবাসিক এলাকায় সাধারণত ৮ থেকে ১০ ফুট, বাণিজ্যিক এলাকায় ১০ থেকে ১৬ ফুট এবং কেন্দ্রীয় বাণিজ্যিক এলাকা (সিবিডি) বা উচ্চ ঘনত্বপূর্ণ অঞ্চলে ২০ থেকে ৪০ ফুট প্রশস্ত ফুটপাত ডিজাইন করা হয়।
এছাড়া নীতিমালায় মেট্রো স্টেশন, বাসস্টপ বা গুরুত্বপূর্ণ মোড় থেকে মাত্র ৩০ থেকে ৪০ ফুট দূরত্বে হকার বসার সুযোগ রাখা হয়েছে। অথচ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী সাধারণত এসব স্থানের ১৫০ ফুটের মধ্যে হকার বসতে দেওয়া হয় না বলে উল্লেখ করেছে আইপিডি।
নীতিমালায় হলিডে মার্কেট, নৈশকালীন মার্কেট এবং হকারমুক্ত এলাকা ঘোষণার বিষয়গুলোকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে আইপিডি। পাশাপাশি প্রান্তিক হকারদের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় আনা এবং আপদকালীন সহায়তার সুযোগ রাখার বিষয়টিও প্রশংসনীয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে সংস্থাটি বলছে, হকারদের লাইসেন্স ও পরিচয়পত্র দেওয়ার বিষয়টি থাকলেও বায়োমেট্রিক শনাক্তকরণ বিষয়ে কোনও সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা নেই। একইভাবে হকার নিবন্ধনের কথা উল্লেখ থাকলেও এলাকাভিত্তিক তালিকা প্রকাশের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এছাড়া হকার ব্যবস্থাপনা কমিটিতে সরকারি কর্মকর্তাদের বাইরে নাগরিক প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত না করায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আইপিডি।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বর্তমানে যেভাবে হকাররা ফুটপাত দখল করে ব্যবসা করছেন, সেই অবস্থাকে যদি নীতিমালার মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়, তাহলে উল্টো জনদুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে। এটি একটি বিপজ্জনক প্রাতিষ্ঠানিক বন্দোবস্তে রূপ নিতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
আইপিডির মতে, স্থানীয় সরকার বিভাগের এই নীতিমালা শুধু ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনকে কেন্দ্র করে তৈরি করা হয়েছে, অথচ দেশের সব নগর এলাকার জন্য একটি সমন্বিত জাতীয় হকার ব্যবস্থাপনা কাঠামো প্রয়োজন ছিল। পরে ঢাকার বাস্তবতা অনুযায়ী আলাদা ও বিস্তারিত নির্দেশনা যুক্ত করা যেতো।
সংস্থাটি বলছে, ফুটপাত দখল করে ব্যবসা করা আইনগতভাবে বৈধ নয়। তাই প্রকৃত হতদরিদ্রদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, খাদ্য সহায়তা, কর্মসংস্থান ও পরিবারভিত্তিক সহায়তা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া উচিত। তবে অবৈধ দখলকে পুনর্বাসনের বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা ঠিক হবে না।
একইসঙ্গে ঢাকার সব হকারকে একই মানদণ্ডে হতদরিদ্র হিসেবে দেখাও বাস্তবসম্মত নয় বলে মনে করছে আইপিডি। তাই প্রকৃত প্রান্তিক ও দরিদ্র হকারদের আলাদাভাবে চিহ্নিত করার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ঢাকার ফুটপাত ও রাজপথকে সারা দেশের দারিদ্র্যের ভার বহন করতে হবে—এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে এলাকাভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি মানুষের অবাধ চলাচলের অধিকারকে গুরুত্ব দিয়ে হকার সমস্যার স্থায়ী ও মানবিক সমাধান খুঁজতে হবে।
এছাড়া হকার সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত লাইনম্যান, রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী ব্যক্তি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, প্রশাসন ও সিটি করপোরেশনের যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী চাঁদাবাজির সুবিধা নেয়, তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে আইপিডি। এই দখলদার ও চাঁদাবাজ চক্র ভাঙতে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও দৃঢ় পদক্ষেপ প্রয়োজন বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
আজকালের খবর/ এমকে