মিথ্যা ধর্ষণ মামলায় এক মাসের বেশি কারাভোগ এবং ডিএনএ পরীক্ষায় নির্দোষ প্রমাণিত হওয়ার পরও স্বস্তি মেলেনি ফেনীর ইমাম মোজাফফর আহমদের (২৫)। কারাজীবনের ভয়াবহ মানসিক চাপ তাকে তীব্র মানসিক বিপর্যয়ে ঠেলে দিয়েছে। সর্বশেষ তাকে ঢাকার জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে নেওয়া হয়েছে।
ফেনীর পরশুরাম উপজেলার বক্সমাহমুদ ইউনিয়নের টেটেশ্বর গ্রামের এক কিশোরীকে ধর্ষণের মামলায় অভিযুক্ত হয়ে মোজাফফর আহমদ ৩২ দিন কারাভোগ করেন। পরে ডিএনএ পরীক্ষায় কিশোরীর সন্তানের সঙ্গে তার কোনো জৈবিক সম্পর্ক না পাওয়ায় আদালত তাকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়।
বৃহস্পতিবার (১৪ মে) জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম সদস্য সচিব তারেক রেজা তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে মোজাফফরের সর্বশেষ অবস্থার বিষয়টি তুলে ধরেন।
তিনি লেখেন, 'ফেনীর মিথ্যা ধর্ষণ মামলার ভুক্তভোগী সেই ইমাম সাহেবের একটি জরুরি আপডেট জানাচ্ছি। আমরা আগেই জেনেছিলাম, জেলে থাকা অবস্থায় তিনি আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন এবং দেয়ালে মাথা ঠুকে আহত হয়েছিলেন। কিন্তু তিনি যে ভয়াবহ সাইকোসিস বা মানসিক ভারসাম্যহীনতার শিকার হয়েছেন, তা আমাদের জানা ছিল না।'
তারেক রেজা জানান, ওই রাতে থাকার জন্য মোজাফফরকে তার ছোট ভাই ইমনের বাসায় পাঠানো হয়। সেখানে পৌঁছানোর কিছুক্ষণ পরই তিনি হঠাৎ অত্যন্ত আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন। বাসার জিনিসপত্র ভাঙচুর করেন এবং ইফতি ও ইমনের ওপর চড়াও হয়ে মারধর ও কামড়ে আহত করেন। এমনকি পাশের ফ্ল্যাটের মালিকের বাসায় ঢুকেও তাকে আঘাত করার চেষ্টা করেন।
তারেক রেজা আরও বলেন, 'ইমন বিষয়টি জানালে আমি দ্রুত সেখানে উপস্থিত হই। একপর্যায়ে তিনি আমাকেও আঘাত করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে বাধ্য হয়ে আমরা তাকে বেঁধে ফেলি এবং ৯৯৯-এ কল করে পুলিশের সহায়তা চাই।'
পরে পুলিশের সহযোগিতায় মোজাফফরকে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং ইনজেকশন দেওয়ার প্রায় ঘণ্টাখানেক পর তিনি ঘুমিয়ে পড়েন বলে জানান তারেক রেজা।
তিনি বলেন, 'এই মুহূর্তে আমি তার অ্যাটেনডেন্ট হিসেবে হাসপাতালেই আছি। তবে তার জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকায় এবং আমি তার লিগ্যাল গার্ডিয়ান না হওয়ায় তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ভর্তি করানো যাচ্ছে না। ইতোমধ্যে ইমাম সাহেবের বাড়িতে যোগাযোগ করেছি। দ্রুততম সময়ের মধ্যে তার পরিবার এসে পৌঁছালে ইনশাআল্লাহ তাকে একটি ভালো হাসপাতালে ভর্তি করাবো।'
পোস্টে তারেক রেজা বিশেষভাবে কৃতজ্ঞতা জানান চিকিৎসক ডা. সাঈদুল আশরাফুল কুশালকে। তিনি লেখেন, 'রাত ৪টার সময় তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়েছে এবং তিনি ইমাম জুবায়েরকে সারাজীবন বিনামূল্যে চিকিৎসা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আল্লাহ তাকে এর উত্তম প্রতিদান দেবেন।'
মামলার পটভূমি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২৪ নভেম্বর স্থানীয় মক্তব শিক্ষক ও ইমাম মোজাফফর আহমদের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ এনে মামলা করে কিশোরীর পরিবার। গ্রেপ্তার হওয়ার পর তিনি টানা ৩২ দিন কারাভোগ করেন। শুধু কারাভোগই নয়, সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হওয়ার পাশাপাশি মসজিদের ইমামতি এবং ইসলামিক ফাউন্ডেশনের চাকরিও হারান তিনি।
তদন্তভার পাওয়ার পর পুলিশ আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির সহায়তা নেয়। সিআইডির ফরেনসিক পরীক্ষায় দেখা যায়, মোজাফফরের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। তদন্তের একপর্যায়ে কিশোরী স্বীকার করেন, তার বড় ভাই মোরশেদ দীর্ঘদিন ধরে তাকে যৌন নির্যাতন করে আসছিলেন। পরিবারের সম্মান রক্ষার জন্য এবং মূল ঘটনা আড়াল করতে পরিকল্পিতভাবে নিরপরাধ শিক্ষক মোজাফফরকে মামলায় ফাঁসানো হয়েছিল।
গত ১৭ এপ্রিল আদালতে মামলার চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয় পুলিশ। প্রতিবেদনে নিরপরাধ মোজাফফরকে মামলা থেকে অব্যাহতির সুপারিশ করা হয় এবং কিশোরীর ভাই মোরশেদকে প্রধান অভিযুক্ত করা হয়। ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করতে কিশোরীর সন্তানের সঙ্গে মোরশেদের ডিএনএ পরীক্ষা করা হলে শিশুটির সঙ্গে তার ডিএনএর ৯৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ মিল পাওয়া যায়, যা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করে মোরশেদই শিশুটির জৈবিক পিতা। পরে পুলিশ মোরশেদকে গ্রেপ্তার করে এবং বর্তমানে তিনি কারাগারে রয়েছেন।
আজকালের খবর/ এমকে