মালয়েশিয়ায় বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাশাপাশি স্থানীয় ভোক্তাদের মাঝে বাংলাদেশে উৎপাদিত বৈচিত্র্যময় পণ্যের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের পাশাপাশি কৃষি ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য মালয়েশিয়ার বাজারে সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনাও দেখাচ্ছে বাংলাদেশ। প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাশাপাশি স্থানীয় বাজারেও এসব পণ্যের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বিশেষ করে হালাল খাদ্যপণ্যের বিশাল বাজার বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সম্ভাবনা।
এরমধ্যে দেশবন্ধু ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেডের বিভিন্ন পণ্যের জনপ্রিয়তা কয়েকগুণ বেড়েছে। কোমল পানীয়, জুস ও অন্যান্য খাদ্যপণ্য ইতোমধ্যে বাজারে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে আগামী দিনে আরো বৈচিত্র্যময় পণ্য বাজারে আনার পরিকল্পনা করছে দেশবন্ধু ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেড।
এ লক্ষ্যে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠান দেশবন্ধু গ্রুপের চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফা বর্তমানে মালয়েশিয়া সফর করছেন। মূলত দেশবন্ধু গ্রুপের পণ্যের বাজার সম্প্রসারণ, বিক্রয় বৃদ্ধি এবং মালয়েশিয়ায় ব্র্যান্ডের অবস্থান আরো শক্তিশালী করার লক্ষ্য নিয়ে তিনি মালয়েশিয়ার বিভিন্ন পাইকারি ও খুচরা মার্কেট পরিদর্শন করেন। তিনি দেশবন্ধু গ্রুপের পণ্য বিক্রয়কেন্দ্র ও আউটলেট ঘুরে দেখেন এবং সরেজমিন পণ্যের ডিসপ্লে, গ্রাহকদের আগ্রহ, বাজারের চাহিদা ও বিক্রয় পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন। সফরকালে চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফা মালয়েশিয়ায় দেশবন্ধু পণ্যের আমদানিকারক, পরিবেশক ও ব্যবসায়িক অংশীদারদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক ও মতবিনিময় সভায় অংশ নেন। আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয় ছিল, কীভাবে মালয়েশিয়ার বাজারে দেশবন্ধুর পণ্যের বিক্রি আরো বাড়ানো যায় এবং স্থানীয় ভোক্তাদের কাছে ব্র্যান্ডটির গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি করা যায়। পাশাপাশি আধুনিক বিপণন কৌশল, ডিজিটাল মার্কেটিং, সুপারশপ ও খুচরা বাজারে পণ্যের উপস্থিতি বৃদ্ধি এবং নতুন নতুন বেভারেজ ও খাদ্যপণ্য বাজারে উন্মুক্ত করার বিষয়েও গুরুত্বারোপ করা হয়। একই সঙ্গে গ্রাহকদের রুচি ও চাহিদা বিবেচনায় এনে নতুন পণ্য উদ্ভাবনের পরামর্শও দেন।
মালয়েশিয়ায় দেশবন্ধু গ্রুপের পণ্যের আমদানিকারক মোহাম্মদ শামসু এবং কাউসার আহমেদের সঙ্গেও পৃথক বৈঠক করেন চেয়ারম্যান। এসব বৈঠকে আমদানি কার্যক্রম, বাজার পরিস্থিতি, ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ সম্ভাবনা এবং ব্যবসা সম্প্রসারণের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দেশবন্ধু ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেড থেকে বর্তমানে প্রতি মাসে প্রায় ১০ কন্টেইনার বিভিন্ন ধরনের বেভারেজ ও খাদ্যপণ্য মালয়েশিয়ায় রপ্তানি করা হচ্ছে। মালয়েশিয়ার বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের চাহিদা দিন দিন বাড়তে থাকায় প্রতিষ্ঠানটি এখন আরো বৃহৎ পরিসরে ব্যবসা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
জানা গেছে, মালয়েশিয়ার বাজারে বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি পণ্যের তালিকায় বৈচিত্র্য রয়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী রপ্তানি করা উল্লেখযোগ্য পণ্যসামগ্রীর মধ্যে রয়েছে তৈরি পোশাক (নিটওয়্যার ও ওভেন গার্মেন্টস), শাকসবজি ও আলু, ড্রাই ফুড, ময়দা ও দুধ থেকে তৈরি সামগ্রী, জুস/পানীয়, স্পিরিট এবং ভিনেগার, চামড়া ও চামড়া জাতপণ্য, রাবার/রাবার জাতপণ্য, মসলা ও ওষুধপণ্য। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত এই বাণিজ্যের প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। হাইকমিশনের সহায়তায় বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো মালয়েশিয়ান হালাল সার্টিফিকেশন এর আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণে কাজ করছে; যা ভবিষ্যতে রপ্তানি বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। ১৯৭২ সালের ৩১ জানুয়ারি কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার মধ্যদিয়ে যে সহযোগিতার ভিত্তি তৈরি হয়েছিল, তা সময়ের সঙ্গে আরো সুদৃঢ় হয়েছে। বর্তমানে এই সম্পর্ক শুধু আনুষ্ঠানিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নেই; বরং বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শ্রমবাজার এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে সম্প্রসারিত হয়েছে। দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বহুমুখীকরণে এবং অর্থনৈতিক সম্পর্কে গতিশীলতা আনতে কাজ করে চলেছে মালয়েশিয়াস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের পর মালয়েশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার হিসেবে উঠে এসেছে বাংলাদেশ। এই অর্জন দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের গভীরতা ও সম্ভাবনার প্রতিফলন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত মালয়েশিয়া বাংলাদেশে নবম বৃহত্তম বিনিয়োগকারী দেশ এবং বিনিয়োগের পরিমাণ ৭৫৫.৪৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। গত কয়েক বছরে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের ধারাবাহিক বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে; যা বাংলাদেশের জন্যও আশাব্যঞ্জক বার্তা বহন করছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ছিল প্রায় ২.৫৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মার্চ পর্যন্ত দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের প্রবণতা একই রকম লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মালয়েশিয়া থেকে বাংলাদেশে আমদানির পরিমাণ ছিল ২.২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশ হতে মালয়েশিয়ায় রপ্তানির পরিমাণ ২৩৪.৩৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। মালয়েশিয়ার বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের চাহিদা ক্রমশ বাড়ছে, নতুন পণ্য রপ্তানির তালিকায় যুক্ত হচ্ছে এবং রপ্তানি সক্ষমতা শক্তিশালী হচ্ছে।
এছাড়া হাইকমিশন বাংলাদেশি রপ্তানিকারক ও মালয়েশিয়ান আমদানিকারকদের মধ্যে বিজনেস ম্যাচমেকিং ও নেটওয়ার্কিং আয়োজন এবং বাংলাদেশের রপ্তানি সম্ভাবনাময় পণ্যের বাজার সম্প্রসারণে নিয়মিতভাবে বাণিজ্য মেলায় অংশগ্রহণ করে থাকে। ২০২৪ ও ২০২৫ সালে হালাল অর্থনীতি, পর্যটন, খাদ্য ও পানীয়, উপহার সামগ্রী এবং যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ হাইকমিশন মালয়েশিয়ায় ১৪টি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলায় অংশগ্রহণ করেছে। এই মেলাগুলোয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে রপ্তানিপণ্যের বহুমুখীকরণসহ মালয়েশিয়া তথা আসিয়ান অঞ্চলে বাংলাদেশের পণ্যের বাজার তৈরি ও সম্প্রসারণের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ২০২৬ সালে সেমিকন্ডাক্টর, ওষুধশিল্প, তৈরি পোশাক, হালাল অর্থনীতি, খাদ্য ও পানীয় ও পর্যটন বিষয়ে অন্তত ছয়টি মেলায় অংশগ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে হাইকমিশনের। তবে ইতিবাচক প্রবণতার পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বাণিজ্য ভারসাম্যের অসামঞ্জস্য, পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ, পরিবহন ও লজিস্টিকস ব্যয় বৃদ্ধি এবং বাজারে প্রবেশের সীমাবদ্ধতা। এসব সমস্যা সমাধানে হাইকমিশন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় জোরদার করছে এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে কাজ করছে।
দেশবন্ধু ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেডের চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফা বলেন, বাংলাদেশ সরকারের এই উদ্যোগ মালয়েশিয়ার বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের অবস্থান আরো সুদৃঢ় করবে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি বাড়ানোর মাধ্যমে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। তিনি আরো বলেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাজার হিসেবে মালয়েশিয়া বর্তমানে বাংলাদেশি খাদ্য ও বেভারেজ পণ্যের জন্য সম্ভাবনাময় গন্তব্যে পরিণত হয়েছে।
মালয়েশিয়ার বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের অবস্থান আরো সুদৃঢ় করতে দেশবন্ধু গ্রুপ যে উদ্যোগ নিয়েছে তার সঠিক পরিকল্পনা, মানসম্পন্ন পণ্য ও কার্যকর বিপণন কৌশলের মাধ্যমে দেশবন্ধু গ্রুপ ভবিষ্যতে এ বাজারে আরো শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে বলে আশা করেন দেশবন্ধু গ্রুপের চেয়ারম্যান গোলাম মোস্তফা।
আজকালের খবর/কাওছার আল হাবীব