
অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে সমালোচনার কেন্দ্রে থাকা গাজীপুর জেলা পরিষদ এখন প্রশাসনিক সংস্কার ও শুদ্ধি অভিযানের মধ্য দিয়ে নতুন গতিতে এগিয়ে চলেছে। একের পর এক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার বিদায়, প্রকল্প বাস্তবায়নে অস্বচ্ছতা, দাপ্তরিক শৃঙ্খলার অবক্ষয় এবং সেবাগ্রহীতাদের হয়রানির অভিযোগে আলোচিত এই প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে দৃশ্যমান পরিবর্তনের বার্তা দিচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো: নজরুল ইসলাম প্রশাসনে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় ধারাবাহিক ও কাঠামোগত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন।
অতীতে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে অস্বচ্ছতা, ফাইল প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা, অনিয়ম এবং কিছু অসাধু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনৈতিক সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ জেলা পরিষদের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। নির্ধারিত সময়ে সেবা না পেয়ে ভোগান্তির শিকার হন বহু সেবাগ্রহীতা। এতে সাধারণ মানুষের আস্থা কমে যায় এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাপনায় প্রতিষ্ঠানটির কার্যকারিতা নিয়ে সমালোচনা তীব্র আকার ধারণ করে।
এমন পরিস্থিতিতে নতুন দায়িত্ব গ্রহণ করে মো: নজরুল ইসলাম প্রশাসনিক শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় কঠোর অবস্থান নেন। তিনি নিজে বিভিন্ন প্রকল্প সরেজমিনে পরিদর্শন করছেন, দাপ্তরিক কার্যক্রম মনিটরিং করছেন এবং কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় সভা করছেন। অফিস নির্ধারিত সময়ে পরিচালনা, ফাইল নিষ্পত্তিতে গতি বৃদ্ধি, প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ এবং আর্থিক লেনদেনে সতর্কতা-এসব উদ্যোগ প্রশাসনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনছে বলে জানিয়েছেন একাধিক জনপ্রতিনিধি। যদিও অভ্যন্তরীণভাবে কিছু অসন্তোষ রয়েছে, তবে অনিয়মে অভ্যস্তদের জন্য এখন প্রশাসনিক পরিবেশ কঠোর-এমন মন্তব্যও শোনা যাচ্ছে।
বর্তমান প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বে কর্মচারীদের পরিচয়পত্র (আইডি কার্ড), ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের পরিচয় পত্র, অফিস ফাইল, অফিসিয়াল চিঠিপত্র, প্রধান খামসহ বিভিন্ন দাপ্তরিক নথিপত্রে কাঠামোগত পরিবর্তন আনা হয়েছে। এর ফলে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ও কার্যগত শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় দৃশ্যমান অগ্রগতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, জেলা পরিষদ চত্বরে নান্দনিক পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে সৌন্দর্যায়ন কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। ফুলের বাগান ও বাংলাদেশের মানচিত্র সংবলিত নকশা ও গাজীপুর জেলার নকশা প্রশাসনিক পরিবেশে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। অবকাঠামোগত উন্নয়নের অংশ হিসেবে শ্রীপুর ও কাপাসিয়া উপজেলার মধ্যবর্তী বানার নদীর পুরনো ঘাট পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেখানে ঘাট বাঁধানো, সংযোগ সড়ক নির্মাণ, জনসাধারণের জন্য শৌচাগার স্থাপন এবং একটি মিনি পার্ক নির্মাণের পরিকল্পনা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। পাশাপাশি জেলা প্রশাসক কার্যালয় সংলগ্ন ঐতিহ্যবাহী মাধব মন্দির এলাকার উন্নয়নেও প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। জেলার বিভিন্ন উপজেলায় রাস্তাঘাট ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন কাজও পর্যায়ক্রমে পরিদর্শন ও তদারকি করা হচ্ছে।
একান্ত সাক্ষাৎকারে মো: নজরুল ইসলাম বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি অনিয়ম ও দুর্নীতির বাস্তব চিত্র প্রত্যক্ষ করেছেন এবং তা বন্ধে দৃঢ় পদক্ষেপ নিয়েছেন। তার লক্ষ্য-জেলা পরিষদকে একটি পরিচ্ছন্ন, কর্মচঞ্চল ও জনবান্ধব প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা। তিনি জোর দিয়ে বলেন, কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর ফাঁকিবাজি কিংবা অনিয়ম বরদাস্ত করা হবে না এবং সেবাগ্রহীতাদের হয়রানি রোধে প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে। অতীতে কয়েকজন কর্মকর্তা সম্মান নিয়ে বিদায় নিতে পারেননি-এটিকে তিনি দুঃখজনক অধ্যায় হিসেবে উল্লেখ করেন।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ নাগরিকদের মতে, বর্তমান নেতৃত্বে প্রশাসনিক কার্যক্রমে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি বেড়েছে, ফাইল নিষ্পত্তিতে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সেবাগ্রহীতারা আগের তুলনায় দ্রুত সেবা পাচ্ছেন। তারা মনে করেন, এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে জেলার সার্বিক উন্নয়ন আরও ত্বরান্বিত হবে এবং জেলা পরিষদের প্রতি জনগণের আস্থা সুদৃঢ় হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিনের বিতর্কিত প্রশাসনিক সংস্কৃতি থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, আর্থিক ব্যবস্থাপনায় পূর্ণ স্বচ্ছতা এবং ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা অপরিহার্য। বর্তমান নেতৃত্বে যে পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে, তা যদি নীতিগত ও কাঠামোগতভাবে টেকসই হয়, তবে গাজীপুর জেলা পরিষদ স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাপনায় একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে সক্ষম হবে। এখন দেখার বিষয়-এই শুদ্ধি ও সংস্কার উদ্যোগ কতটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় এবং জনগণের প্রত্যাশা পূরণে কতটা সফল হয়।
কাওছার আল হাবীব/আজকালের খবর