সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল আইন শহরের মরুভূমির বুকে এখন ফুটেছে টুকটুকে লাল কৃষ্ণচূড়া। গ্রীষ্মের দাবদাহের মাঝেও প্রকৃতি যেন রক্তিম ফুলে সেজে এক অনন্য সৌন্দর্যের আবহ তৈরি করেছে। দূর থেকে তাকালে মনে হয়, বৈশাখের প্রখর রোদ যেন সবুজ পাতার ফাঁকে আগুনরঙা ফুল হয়ে জ্বলে উঠেছে।
গীতিকার কবির বকুলের জনপ্রিয় গান ‘কৃষ্ণচূড়া লাল হয়েছে ফুলে ফুলে, তুমি আসবে বলে’—এর মতোই কৃষ্ণচূড়ার প্রতি মানুষের আবেগ ও ভালোবাসা যেন বাস্তব রূপ পেয়েছে আল আইনের পথে-প্রান্তরে। গ্রীষ্মের ক্লান্ত দুপুরে কৃষ্ণচূড়ার ছায়া যেমন পথচারীদের প্রশান্তি দেয়, তেমনি এর দৃষ্টিনন্দন রূপ মুগ্ধ করে স্থানীয় বাসিন্দা ও দর্শনার্থীদের।
সাধারণত কৃষ্ণচূড়া লাল রঙের হলেও উদ্ভিদবিদদের মতে, এ ফুল তিন রঙের হয়ে থাকে—লাল, হলুদ ও সাদা। তবে হলুদ ও সাদা কৃষ্ণচূড়া তুলনামূলকভাবে বিরল। গাছগুলো বেশ উঁচু হয় এবং বিস্তৃত শাখা-প্রশাখায় ছড়িয়ে পড়ে। বসন্তের শেষে ও গ্রীষ্মজুড়ে একই সময়ে তিন ধরনের কৃষ্ণচূড়াই ফুলে ভরে ওঠে।
স্থানীয়দের অনেকের ধারণা, রাধা ও কৃষ্ণের নামের সঙ্গে মিলিয়েই এ বৃক্ষের নাম হয়েছে কৃষ্ণচূড়া। তবে এর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো প্রচণ্ড গরমের মধ্যেও দৃষ্টিনন্দন ফুলে ভরে ওঠা, যা পথচারীদের থমকে দাঁড়িয়ে দেখতে বাধ্য করে।
কৃষ্ণচূড়ার আদি নিবাস পূর্ব আফ্রিকার মাদাগাস্কার। শুষ্ক ও লবণাক্ত পরিবেশেও এটি সহজে টিকে থাকতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশ, ভারত, ক্যারিবিয়ান অঞ্চল, আফ্রিকা, হংকং, তাইওয়ান, দক্ষিণ চীনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ বৃক্ষের দেখা মেলে। যুক্তরাষ্ট্রে এটি মূলত দক্ষিণ ফ্লোরিডা, দক্ষিণ-পশ্চিম ফ্লোরিডা এবং টেক্সাসের রিও গ্র্যান্ড উপত্যকায় জন্মে।
গাছটির বৈজ্ঞানিক নাম Delonix regia এবং এটি Fabaceae পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। বিভিন্ন গবেষণা ও জার্নালের তথ্য অনুযায়ী, সৌন্দর্যবর্ধনের পাশাপাশি উষ্ণ আবহাওয়ায় ছায়া দেওয়ার জন্যও কৃষ্ণচূড়া অত্যন্ত উপযোগী। গাছটির উচ্চতা সাধারণত সর্বোচ্চ ১২ মিটার হলেও এর শাখা-প্রশাখা অনেক বিস্তৃত হয়। ফুলের পাপড়িগুলো প্রায় ৮ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে এবং ফুলের ভেতরের অংশে হালকা হলুদ ও গাঢ় লাল রঙের সমন্বয় দেখা যায়।
কৃষ্ণচূড়ার পাতা জটিল ও উজ্জ্বল সবুজ। প্রতিটি পাতা ৩০ থেকে ৫০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা এবং এতে ২০ থেকে ৪০টি উপপত্র থাকে। শুষ্ক অঞ্চলে গ্রীষ্মে পাতা ঝরে গেলেও নাতিশীতোষ্ণ এলাকায় এটি চিরসবুজ থাকে।
বাংলাদেশে সাধারণত এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত কৃষ্ণচূড়া ফুলে ভরে ওঠে। তবে বিভিন্ন দেশে ফুল ফোটার সময় ভিন্ন। দক্ষিণ ফ্লোরিডায় জুনে, সংযুক্ত আরব আমিরাতে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর, ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে মে থেকে সেপ্টেম্বর, ভারতে এপ্রিল থেকে জুন এবং অস্ট্রেলিয়ায় ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এ ফুল ফোটে।
বাংলা সাহিত্য, সংস্কৃতি ও বিভিন্ন আন্দোলনের ইতিহাসেও কৃষ্ণচূড়ার বিশেষ স্থান রয়েছে। কবিতা, গান ও ছড়ায় বারবার উঠে এসেছে এর সৌন্দর্যের উপমা। গ্রাম থেকে শহর—সবখানেই সৌন্দর্যবর্ধক বৃক্ষ হিসেবে কৃষ্ণচূড়ার কদর রয়েছে। তবে কাঠের বাণিজ্যিক মূল্য তুলনামূলক কম হওয়ায় এ গাছের বাণিজ্যিক চাষ তেমন জনপ্রিয় হয়নি।
প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষায় বেশি বেশি কৃষ্ণচূড়া গাছ লাগানোর আহ্বান জানিয়েছেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের আল আইন সিটির লুলু ফ্যাশন হাউসের সিইও, কথাসাহিত্যিক ও ব্যবসায়ী মোহাম্মদ সাইফুল আলম সিদ্দিকী এবং টাইম টাইপিং সেন্টার ও ওয়ার্ল্ড টাইম কার্গোর চেয়ারম্যান, কবি ও আবৃত্তিকার মোহাম্মদ মনসুর আলীসহ প্রকৃতিপ্রেমীরা।
আজকালের খবর/এমকে