
মাত্র ৬৫ বছর। এই অল্প সময়ে জীবন রেসের প্রতি বাঁকেবাঁকে রেখে গেছেন একেকটি স্বর্ণ ফলক। একাধারে ব্যবসায়ীদের নেতা, উদ্যোক্তা, টেলিভিশন উপস্থাপক ও জনপ্রতিনিধি। যে সকল অঙ্গনে তাঁর পদচারণা, সেখানেই নিজ মহিমায় দ্যুতি ছড়িয়েছেন। বিটিভির উপস্থাপক থেকে হয়েছেন মোহাম্মদী গ্রুপের চেয়ারম্যান, হয়েছেন জনপ্রিয় ব্যবসায়ী নেতা। তিনি সবার প্রিয়, পরিপূর্ণ আনিসুল হক।
২০০৫-০৬ সেশনে বিজিএমইএর সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন, ২০০৮ সালে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর সভাপতি নির্বাচিত হন । সার্ক চেম্বারের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন আনিসুল হক।১৯৫২ সালের ২৭ অক্টোবর নোয়াখালীর কবিরহাট উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তার শৈশবের বেশকিছু সময় কাটে নানা বাড়ি ফেনী জেলার সোনাগাজীর আমিরাবাদ ইউনিয়নের সোনাপুর গ্রামে। বাবা ছিলেন সরকারি চাকুরিজীবী। মা-বাবা ও চার ভাইবোন মিলে ছিল তাদের পরিবার। বাবার স্বল্প আয়ের সংগ্রামের সংসারেই মেয়র আনিসুল হকের বেড়ে ওঠা। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক সম্পন্ন করেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশুনা শেষ করার পর বেশ কয়েক বছর বেকার ছিলেন। এরপর বিটিভিতে কাজ শুরু করেন, পাশাপাশি চাকরি খুঁজতেন।
টিভি উপস্থাপক হিসেবে ৮০ ও ৯০ এর দশকে সুনাম ও পরিচিত ছড়িয়ে পড়েছিল । বিশেষ করে ৮০’র দশকে বিটিভিতে ‘বলা না বলা’ এবং ‘জানতে চাই’ নামের অনুষ্ঠান দু’টি উল্লেখযোগ্য। তবে ‘সবিনয়ে জানতে চাই’ নামের একটি এক পর্বের অনুষ্ঠান উপস্থাপনার মাধ্যমে উপস্থাপক হিসেবে আনিসুল হক তুমুল জনপ্রিয়তা পান। ১৯৯১ সালের সংসদ নির্বাচনের নির্বাচনের আগে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক নেতা বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা তার এই অনুষ্ঠানে প্রথম এবং শেষবারের মতো মুখোমুখি বসেন। আনিসুল হক সে সময় এই অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে সাধারণে গ্রহনযোগ্যতার শীর্ষে পৌঁছে যান।
বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন, 'তার উষ্ণতা, বলিষ্ঠতা দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছি। মানুষ এ নগরীকে যেভাবে দেখতে চায়, সে সেভাবেই কাজ করতে শুরু করেছিল। আনিসুল হাসতো প্রাণ খুলে। তার হাসি ছিল স্বর্গ-মর্ত্য মাতানো। একটা জাতির প্রতিভাবান ব্যক্তিরা সেই জাতির প্রিয় প্রতিপক্ষ হয়ে জন্মায়, আনিসুলও ছিল তাই। সে ছিল একটা স্টার'।
আনিসুল হকের স্ত্রী এইউডব্লিউ'র উপাচার্য ড. রুবানা হক স্বামী সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে গিয়ে বলেন, 'আনিস নতুন একটি দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করে গেছেন। ওর শিল্পী সত্ত্বা না থাকলে এমনটা হতো না। ও চেয়েছিল বীরের মতো যাবে, সেভাবেই হয়েছে। তারপরেও ও যায়নি। আমাদের ও নতুন আনন্দে জাগাতে শিখিয়ে গেছে। আনিস গেছে বিজয়ীর বেশে, আর আমি নিঃস হয়ে দাঁড়িয়ে আছি'।
আনিসুল হকের বন্ধু বিখ্যাত যাদুশিল্পী জুয়েল আইচ। বন্ধু সম্পর্কে তার মূল্যায়ন, 'একটা সময় ছিল যখন টিভি উপস্থাপক আর অতিথিরা অনেকটা শত্রুর মতো ছিল। আনিসুল হক হল প্রথম মানুষ, যিনি সমস্ত উপস্থাপকের বন্ধু হলেন। সে অনেক ভালো একজন বন্ধু ছিল। ও সবসময় অদ্ভুত কিছু করার চেষ্টা করতো, যা সবার থেকে আলাদা'।
সবার থেকে আলাদা হওয়ার ছাপ রেখে গেছেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে। উপরের তিনজনের মূল্যায়ন সত্যিই সৌভাগ্যের। একজন মানুষ সহপাঠী, বন্ধু মহল, স্ত্রী-পরিবার, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার মানুষ, জ্ঞানী গুনীজন তথা সর্ব মতের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায় না, পাওয়াটা বড়ই কঠিন। সেই কঠিন কাজ সহজে করেছিলেন তিনি। তার নাম শুনলে এখনও মানুষ ভালোলাগা নিয়ে নড়েচড়ে বসে।
সৌভাগ্যের বরপুত্র ক্ষনজন্মা আনিসুল হকের মৃত্যুবার্ষিকী আগামীকাল রবিবার ৩০ নভেম্বর। গভীর শ্রদ্ধা ও আত্মার শান্তি কামনা করছি আমরা।
লেখক: সাংগঠনিক সম্পাদক, বিএফইউজে ও প্ল্যানিং এডিটর, নাগরিক টেলিভিশন।