ডিজিটাল যুগে আমরা প্রতিদিন অসংখ্য স্ক্রল, নোটিফিকেশন আর পিক্সেলের আলোয় ডুবে যাই। তবুও বই এই ধুলো-গন্ধ-মিশে থাকা সাদামাটা কাগজের পুঁথি এখনো মানুষের জীবনে এমন এক জায়গা ধরে রেখেছে, যাকে পুরোপুরি পিছনে ফেলে দিতে পারেনি কোনো স্ক্রিন। বরং বলা চলে, ডিজিটাল ঝড়ের মধ্যেও বই পড়ার অভ্যাস এক অদ্ভুতভাবে টিকে আছে; অনেক সময় আবার ফিরে আসছে নতুন শক্তি নিয়ে। কেন? কীভাবে? এর পেছনে মানুষের মনস্তত্ত্ব থেকে শুরু করে সামাজিক বাস্তবতা সবকিছুরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে।
এই ছোট প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে তাকাতে হয় মানুষের পাঠ-সংস্কৃতি, স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ, মানসিক শান্তি, জ্ঞানলাভের ধরন এবং প্রযুক্তির জটিল সম্পর্কের দিকে। বই শুধুই তথ্যের উৎস নয়; বই এমন এক বন্ধুর মতো, যার সঙ্গে সময় কাটালে মস্তিষ্কের গভীরতম কোষগুলো আলো পায়, মন শান্ত হয় এবং মানুষ নিজের সত্তাকে নতুন করে আবিষ্কার করে। তাই ডিজিটাল ঢেউযতই শক্তিশালী হোক, বইকে পুরোপুরি ডুবিয়ে দিতে পারে না।
ডিজিটাল যুগ আমাদের অনেক সুবিধা দিয়েছে মাত্র কয়েক সেকেন্ডে আমরা জানতে পারছি পুরো পৃথিবীর খবর, পরের মুহূর্তে দেখছি শর্ট ভিডিও, তারপরই আবার দেখা হয়ে যাচ্ছে রিলসের নতুন কোন মজার কন্টেন্টের সঙ্গে। কিন্তু এতসব সুবিধা আর উত্তেজনার মাঝেও আমরা একটা জিনিস হারাচ্ছি মানসিক শান্তি।
যে স্ক্রিন আমাদের আনন্দ দেয়, সেই স্ক্রিনই আবার একসময় আমাদের মাথায় চাপ সৃষ্টি করে।২৪ ঘণ্টার নোটিফিকেশন, অন্তহীন স্ক্রলিং, চোখে আলো লাগা, মস্তিষ্কের ক্লান্তি সব মিলিয়ে মানুষ যখন একটু নীরবতা খোঁজে, তখন সে স্বাভাবিকভাবেই বইয়ের দিকে ফিরে আসে। বই পড়া এক ধরনের ধীর-গতির শান্ত অভ্যাস। স্ক্রিনের মতো দ্রুত বদলে যাওয়া উত্তেজনা নেই সেখানে। মানুষ যতই ডিজিটাল বিনোদন পাক, দিনশেষে তার মন চায় একটু স্থিরতা এটাই বইকে টিকে থাকার বড় কারণ। মানুষের মস্তিষ্ক গঠনের দিক থেকে গভীর মনোযোগ–এর জন্য তৈরি। আমরা যখন বই পড়ি, তখন আমরা পুরোপুরি মনোযোগটা একটা জায়গায় ফেলতে পারি। কিন্তু স্ক্রিনের সমস্যা হলো এটা একই সাথে আমাদের অনেকদিকে টেনে নিয়ে যায়।
বই একেকটা শব্দ, বাক্য, অনুচ্ছেদ ধীরে ধীরে শোষণ করতে শেখায়। একে বলে উববঢ় জবধফরহম। ডিজিটাল কনটেন্টে এটা প্রায় অসম্ভব। পাঁচ সেকেন্ড পরপর স্ক্রিনে ভেসে ওঠা নতুন উত্তেজনা আমাদের মনোযোগ ভেঙে দেয়। তাই মানুষ যখন গভীরভাবে চিন্তা করতে চায়, নতুন কোনো ধারণা ধরতে চায়, মনে রাখতে চায় তখন বইয়ের কাছে ফিরে আসে। বিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরে দেখাচ্ছেন কাগজের বই পড়লে আমাদের মস্তিষ্কের কিছু অংশ বেশি সক্রিয় হয়, বিশেষ করে স্মৃতির অংশ।
স্ক্রিনে পড়লে আমরা অনেক সময় ংশরসসরহম করি মানে শুধু ওপর দিয়ে পড়ে যাই। কিন্তু বইতে চোখ যায় ধীরে, মনোযোগ স্থির হয় দীর্ঘসময়। এই গভীর পড়া মানুষের ভেতরে একটা সন্তুষ্টি তৈরি করে।যতই ডিজিটাল দুনিয়া বড় হোক, মানবমস্তিষ্কের গঠন তো রাতারাতি বদলায় না।তাই বই এখনো মানুষের চিন্তা-প্রক্রিয়ার সঙ্গে বেশি মানানসই।
স্ক্রিন গল্প দেখায় ঠিক আছে। কিন্তু বই গল্প গড়ে তোলে পাঠকের মাথার ভেতরে।
একটি চরিত্র কেমন দেখতে? তার হাঁটার ভঙ্গি কেমন? গ্রামের রাস্তার কুয়াশা কীভাবে নেমে এল? সবই পাঠক নিজের মতো তৈরি করে ফেলে। এই কল্পনার স্বাধীনতা বই ছাড়া কোথায়?
ডিজিটাল যুগ যতই ছবির জগতে মানুষকে অভ্যস্ত করুক, মানুষ কল্পনা হারাতে চায় না। আর কল্পনা চালু রাখার সবচেয়ে বড় মাধ্যমই বই।
আজ যে ভাইরাল ভিডিও, কালই ভুলে যাই।আজ যে ফেসবুকে আলোচনার পোস্ট, সপ্তাহ পরই আর কেউ মনে রাখে না।ডিজিটাল কনটেন্টের জীবন খুব ছোট।
কিন্তু বই—একবার লেখা হলে সেটা বহু বছর টিকে থাকে। একটা বই বারবার পড়া যায়। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে যায়।
স্থায়ী স্মৃতি তৈরি করতে পারে যে মাধ্যম, তার জায়গা অন্য কিছু সহজে নিতে পারে না।
স্ক্রিন আমাদের দ্রুতগতির দুনিয়ায় ছুড়ে ফেলে। বই আমাদের টেনে নেয় নিজের ভেতরে। একটা বই আমাদের সঙ্গে কথা বলে ধীরে ধীরে যেন নীরব শিক্ষক, নীরব সঙ্গী, নীরব আয়না। তাই ডিজিটাল যুগ যতই শক্তিশালী হোক, বইয়ের অভ্যাস কখনো পুরোপুরি কমে যাবে না। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বই সম্পর্কে মানুষের উপলব্ধি আরও গভীর হচ্ছে। ডিজিটাল যুগ বইয়ের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ এনেছে এটা ঠিক।কিন্তু চ্যালেঞ্জ মানেই পরাজয় নয়।
মানুষের মনস্তত্ত্ব, বুদ্ধিবৃত্তি, চিন্তার গভীরতা সবকিছুর সঙ্গে বইয়ের যে দীর্ঘ সম্পর্ক, সেটা ভেঙে দেওয়া সম্ভব নয়। স্ক্রিন মানুষের সময় দখল করতে পারে, কিন্তু আত্মাকে দখল করতে পারে না। তাই বই পড়ার কমতি বাড়ছে না বরং নতুন আকারে, নতুন সন্ধানে, নতুন পাঠসংস্কৃতিতে বই আবার জেগে উঠছে।