শনিবার ● ১৭ অক্টোবর ২০২৬
‘বড় ভালো লোক ছিল’ প্রবীর মিত্র
প্রকাশ: সোমবার, ৬ জানুয়ারি, ২০২৫, ৮:৩৭ পিএম   (ভিজিট : ৯০২)
সিনেমায় চরিত্রাভিনেতা হিসেবে নিজেকে অনন্য জায়গায় নিয়ে গেছেন প্রবীর মিত্র। পজেটিভ অভিনয়ে দর্শক প্রশংসায় ভেসেছেন আমৃত্যু। একইভাবে বাস্তবেও ছিলেন একজন নিপাট ভদ্রলোক। এক কথায় যাবে বলা যায় ‘বল ভালো লোক ছিল’ প্রবীর মিত্র। সিনেমার নামটি যেন তার সঙ্গে সমার্থক। এ সিনেমাতে তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও অর্জন করেন। প্রথাগত অভিনয়ের বাইরে একজন দুর্দান্ত চরিত্রাভিনেতা। গতকাল সকল অর্জন আর ভালোবাসাকে বিসর্জন দিয়ে পরলোকে পাড়ি জমালেন। পেছনে কেবল রয়ে গেলো এক ‘নবাব’ এর আঁকুতি- ‘সবার ওপর মানুষ সত্য তাহার ওপর নাই।’ 

এই আপ্তবাক্যে আজীবন বিশ্বাসী প্রবীর মিত্র ছিলেন একজন উঁচুমাপের পাঠক। ঘরটিতে রয়েছে বিশাল বইয়ের সেলফ। সেগুলো থড়ে থড়ে সাজানো হয়েছে দেশ-বিদেশের বিখ্যাতদের বই। অবসরে বই ছিলো তার নিত্যসঙ্গী। যখনই অবসর তখনই বই। প্রিয়তমা স্ত্রীর বিয়োগে তিনি হয়ে উঠেছিলেন বইপ্রেমিক। আমৃত্যু তিনি এই প্রেমে মজেছিলেন। স্বল্পভাষী মানুষটি এর পাশাপাশি প্রচন্ড অভিনয় পাগল ছিলেন। সবসময় চাইতেন অভিনয় করতে। অনেককে অনুরোধও করেছেন ‘একটু সুযোগ দিতে’। কিন্তু গত এক দশকেও আর ফেরা হয়নি। 

পর্দায় নায়ক হিসেবে যেমন সফল হয়েছেন, তেমনি সিনিয়র চরিত্রেও তিনি আলো ছড়িয়েছেন সমানভাবে। অভিনয় নৈপুণ্যে নিজেকে নিয়ে গিয়েছিলেন অনন্য উচ্চতায়। 

তার সাবলীল অভিনয়, ভরাট কণ্ঠের সংলাপ দর্শকদের হৃদয়ে নিখাদ মুগ্ধতা ছড়িয়ে দেয়। বরেণ্য এই ১৯৪০ সালের ১৮ আগস্ট চাঁদপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তবে তার বেড়ে ওঠা পুরান ঢাকায়। পড়াশোনা করেছেন সেন্ট গ্রেগরি স্কুলে। এরপর স্নাতক সম্পন্ন করেছেন জগন্নাথ কলেজ থেকে।

থিয়েটারে অভিনয়ের মাধ্যমে সংস্কৃতির ভুবনে আসেন প্রবীর মিত্র। ‘লালকুটি’ থিয়েটারে কাজ করেছেন অনেক দিন। এরপর পরিচালক এইচ আকবরের হাত ধরে চলচ্চিত্রে আসেন তিনি। প্রবীর মিত্রের প্রথম সিনেমার নাম ‘জলছবি’।
ক্যারিয়ারের প্রথম দিকে নায়ক চরিত্রে অভিনয় করেছেন প্রবীর মিত্র। ‘তিতাস একটি নদীর নাম’, ‘চাবুক’-এর মতো সিনেমায় তিনি ছিলেন নায়ক। এছাড়া ‘রঙিন নবাব সিরাজউদ্দৌলা’ সিনেমাতেও তিনি ছিলেন মূখ্য চরিত্রে।

এরপর ধীরে ধীরে প্রবীর মিত্র মনোযোগী হন চরিত্রভিত্তিক অভিনয়ে। তার অভিনীত উল্লেখযোগ্য সিনেমাগুলো হচ্ছে- ‘জীবন তৃষ্ণা’, ‘সীমার’, ‘তীর ভাঙা ঢেউ’, ‘মিন্টু আমার নাম’, ‘প্রতিজ্ঞা’, ‘অঙ্গার’, ‘পুত্রবধূ’, ‘নয়নের আলো’, ‘জয় পরাজয়’, ‘চাষীর মেয়ে’, ‘দুই পয়সার আলতা’, ‘আবদার’, ‘নেকাব্বরের মহাপ্রয়ান’, ‘দেহরক্ষী’, ‘অনেক সাধনার পরে’, ‘জজ ব্যারিস্টার পুলিশ কমিশনার’, ‘মাই নেম ইজ খান’, ‘মাই নেম ইজ সুলতান’, ‘জিদ্দি বউ’, ‘কুসুম কুসুম প্রেম’, ‘বস নাম্বার ওয়ান’, ‘ভালোবাসলেই ঘর বাঁধা যায় না’ ইত্যাদি।

নান্দনিক অভিনয়ের জন্য বরাবরই প্রশংসিত প্রবীর মিত্র। কিন্তু দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তার পুরস্কার ভাগ্য প্রসন্ন নয়। কেবল ‘বড় ভালো লোক ছিল’ সিনেমার জন্য শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব চরিত্রে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে তাকে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে আজীবন সম্মাননা দেওয়া হয়।

নিজের জানাজার দাওয়াত দিলেন ইলিয়াস কাঞ্চন
‘সবাইকে চলে যেতে হবে, এটাই নিয়ম। কিন্তু কে কীভাবে যাবে সেটাই হল তার ভাগ্য। আখেরাত যার সুন্দর হবে তিনি হলেন সবচেয়ে বেশি ভাগ্যবান। সেদিক দিয়ে আমাদের প্রবীরদা অনেক ভাগ্যবান। দীর্ঘ সময় তিনি অভিনয় থেকে দূরে ছিলেন। এই সময়টা তিনি ধর্মকর্ম নিয়ে ছিলেন। সহকর্মী হিসেবে আমরা তাকে দেখেছি। তিনি ছিলেন অত্যন্ত ভালো একজন মানুষ। আপনারা সবাই তার জন্য দোয়া করবেন।’

অভিনেতা প্রবীর মিত্রের শেষে বিদায়ে হাতেগোনা কয়েকজন ছাড়া আসেননি অনেক তারকাশিল্পী। বিষয়টি নিয়ে খানিকটা আক্ষেপের সুরে ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, ‘নিজেদের ব্যক্তিগত কাজে অনেকেই আসতে পারেননি। তারপরও অনেকেই এসেছেন। এটা নিয়ে তো আমার কিছু বলার নেই। যারা এসেছেন এবং যারা আসতে পারেননি সবাই যেন প্রবীর দাদার জন্য দোয়া করেন। আর এখানে যদি আমার জানাজা হয় তাহলে আপনারা সবাই আমার জানাজায় আসবেন। আমি আমন্ত্রণ জানালাম। সেই সঙ্গে আমাকে ক্ষমা করে দেবেন।’

প্রবীর মিত্রের মৃত্যুতে যা বলছেন সহকর্মীরা
এদিকে বর্ষীয়ান কিংবদন্তি এ অভিনেতার মৃত্যুতে তার সহকর্মীদের মাঝে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। চলচিত্র সংশ্লিষ্টরা তার মৃত্যুর পরপরই ফেসবুকের মাধ্যমে শোক জানিয়ে পোষ্ট দিয়েছেন।

গণমাধ্যমেও অভিনেতার প্রতি শ্রদ্ধা ও শোক জানিয়ে নিজেদের অনুভূতি প্রকাশ করেছেন অনেক তারকা।

প্রবীর মিত্রের মৃত্যুতে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে শিল্পী সমিতির সভাপতি খলনায়ক মিশা সওদাগর এ প্রতিবেদককে বলেন, আমরা আমাদের ফ্লিম ইন্ডাস্ট্রিজের একজন গুনী ব্যক্তিকে হারালাম। তার মৃত্যুতে আমাদের যে ক্ষতি হয়েছে সেটা কখোনো পূরণ হবার নয়। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি একজন সৎ, নির্লোভ, নিরঅহংকারী ব্যাক্তি ছিলেন। আমি দেশবাসীর কাছে তার জন্য দোয়া চাই আল্লাহ যেন তাকে জান্নাত দান করেন।

চলচিত্র পরিচালক গাজী মাহবুব জানান, শোক জানাবার ভাষা আর নেই। অঞ্জনা আপার মৃত্যুর শোক না যেতেই দাদার মৃত্যুর সংবাদ। আমরা সিনেমার বরেণ্য একজন শক্তিশালী বর্ষীয়ান অভিনেতাকে হারালাম। প্রবীরদা ছোট বড় সকলকে আপনি সম্ভোধন করতেন। এতো উঁচু মানের একজন অভিনেতার সদা হাস্যময়  বিনয়ী ব্যবহার ছিল সবার সাথে। প্রবীরদা ছিল অভিনয়ের একটি প্রতিষ্ঠান। প্রবীরদা একজন কালজয়ী অভিনেতা। চলচ্চিত্র শিল্পে উনার অবদান চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে। স্বাধীনতার পর বাংলা সিনেমাকে গণমানুষের কাছে জনপ্রিয় করার বর্ণিল ইতিহাসে প্রবীরদাও অংশীদার। উনার শুন্যতা কোনভাবেই পূরণ হবার নয়। দাদার প্রয়ানে আমরা গভীরভাবে শোকাহত।

চিত্রনায়িকা রুমানা ইসলাম মুক্তি জানান, প্রবীর মিত্র মামা আর নেই ভাবতেই খুব কষ্ট হবে। ওনার ছেলের সাথে কথা হয়েছিলো তাকে দেখতে যাবার ব্যাপারে। সে বলেছিলো বাবাকে নিয়ে বোর্ড মিটিং হবে আগামীকাল বিকেলে আসুন। কিন্তু তার সাথে আর শেষ দেখাটা হলোনা।

চিত্রনায়ক বাপ্পী চৌধুরী জানান, প্রথমে অঞ্জনা আপু পরবর্তীতে প্রবীর মিত্র দা তাদেরকে আমরা হারালাম। আমরা দিন দিন আমাদের অভিনয়ের শিক্ষকদের হারাচ্ছি। যেটা আমরা যারা ইয়াং জেনারেশন আছি কিংবা নতুন যারা আসছেন তাদের জন্য অনেক কষ্টের যে আমরা আমাদের শিক্ষক হারাচ্ছি। আমরা দুর্ভাগা যে আমরা সিনিয়রদের কাছ থেকে কিছুই শিখতে পারি নাই। 

চিত্রনায়িকা রিয়ানা পারভীন পলি বলেন, অঞ্জনা আপার মৃত্যুর দিন কাটতে না কাটতেই প্রবীর দাদার মৃত্যু। কিছুতেই আমরা মেনে নিতে পারছিনা। আমরা একের পর এক অভিবাবককে হারাচ্ছি। আমি শিল্পী সমিতির কাছে দাবী করছি আমাদের যারা প্রবীন এবং অসুস্থ শিল্পীরা আছেন তাদের খোঁজ খবর নিয়ে যথাসাধ্য তাদের পাশে দাঁড়ানো হোক। 

চিত্রনায়িকা সাবরিনা সুলতানা কেয়া বলেন, প্রবীর মিত্র দাদা খুবই ভালো এবং অমায়িক শান্ত ভদ্র মানুষ ছিলেন। সে বেশ কিছু ছবিতে আমার বাবার চরিত্রে অভিনয় করেছেন। সে আমাকে প্রচন্ড স্নেহ করতেন। তাকে হারিয়ে আমি একজন অভিবাবককে হারালাম। তিনি স্বর্গবাসী হোক স্রষ্টার কাছে এই দোয়া করছি।

প্রবীর মিত্র ১৯৪৩ সালের ১৮ আগস্ট কুমিল্লার চান্দিনায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি পুরান ঢাকায় বেড়ে উঠেছেন। তার পুরো নাম প্রবীর কুমার মিত্র। দাম্পত্য জীবনে প্রবীর মিত্রের স্ত্রী অজন্তা মিত্র, তিন ছেলে মিঠুন মিত্র, সিফাত ইসলাম, সামিউল ইসলাম ও এক মেয়ে ফেরদৌস পারভীন । এর মধ্যে স্ত্রী অজন্তা মিত্র ২০০০ সালে এবং ছেলে সামিউল ২০১২ সালে প্রয়াত হয়েছেন। স্কুলজীবন থেকেই তিনি নাট্যচর্চায় যুক্ত হন। স্কুলের ছাত্রাবস্থায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ডাকঘর’ নাটকে অভিনয় করেছিলেন প্রবীর মিত্র। ১৯৬৯ সালে নির্মিত ‘জলছবি’ সিনেমায় অভিনয়ের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে তার যাত্রা শুরু হয়।

শাকিবের ওপর সহকর্মীদের ক্ষোভ
একের পর এক শিল্পী মারা গেলেও ঢাকাই সিনেমার শতাধিক সিনেমা হলের তারকা অভিনেতা শাকিব খানের দেখা মেলে না। গত ২০১৭ সাল থেকে এ চিত্র দেখতে দেখতে ক্লান্ত সহশিল্পীরা। সর্বশেষ প্রবীর মিত্রের জানাযা অনুষ্ঠানেও দেখা যায়নি ইন্ডাস্ট্রি ধ্বংসের অন্যতম এই কুশীলবকে। যে কারণে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন একাধিক সহশিল্পী। তাদের অভিযোগ একে একে সব সিনিয়ররা চলে যাচ্ছেন। একজন তারকা অভিনেতার দায় রয়েছে তাদের প্রতি। কিন্তু আমরা দেখলাম, এখানে লোক মারা যায় আর সে (শাকিব) এখানে সেখানে নিজের কাজেই তিনি ব্যস্ত। দেখেশুনে মনে হয় তার কোনো দায় নেই। অথচ যেকোনো ভাবেই বলি না কেন এদের অবদান রয়েছে তার ক্যারিয়ারে। আজ তিনি এসব ভুলে গেছেন। এমন দিন যেন না আসে যে তার মৃত্যুতে সহকর্মীতো দূরের কথা গণমাধ্যমও তাকে এড়িয়ে যায়।

চরিত্র অভিনেতাদের সর্বশেষ মশালের প্রস্থান
“‘জলছবি’, প্রবীর মিত্রের প্রথম ছবি। ফারুকেরও প্রথম ছবি। এই ছবিতে দুজন স্বনামধন্য অভিনেতার জন্ম। বিজ্ঞাপনে ফারুকের ছবি দেখা যাচ্ছে না, তবে তার নাম আছে। প্রবীর মিত্রের নামটিও নেই। জন্ম হোক যথাতথা কর্ম হোক ভাল। নিজের কাজ দিয়ে ইন্ডাস্ট্রিকে আলোকিত করেছেন, দেশের কোটি দর্শকের আশীর্বাদ পেয়েছেন প্রবীর মিত্র। ‘জলছবি’ ষাটের দশকের অত্যন্ত গুণী অভিনেতা কাজী খালেকের শেষ ছবি। বিজ্ঞাপনে সেটা লেখাও আছে। তোমার হল শুরু আমার হল সারা। একজন অভিনেতার অধ্যায় শেষ হল। তার মশালটি বয়ে চললেন আরেকজন। কাজী খালেকের পর এলেন প্রবীর মিত্র। কিন্তু তার জায়গা কে নেবেন? ২০২৫ সালে কি এমন কোনো অভিনেতার জন্ম হবে যিনি মারা গেলে আমরা বলতে পারব- 'বড় ভাল অভিনেতা ছিলেন?' আক্ষেপটা তো এই জায়গাতেই। পরিচালক সিবি জামান চলে গেলেন। তার মতো পরিচ্ছন্ন নির্মাতা কি আর আসবে? অঞ্জনার মতো সুপারস্টার কি আর সৃষ্টি হবে? প্রবীর মিত্রের অভাব পূরণ করতে পারবেন কেউ? এই যে চারদিক শূন্য হয়ে যাচ্ছে, এই অসীম শূন্যতা ভরবে কীভাবে!”- মাহফুজুর রহমান।

আজকালের খবর/আতে









Advertisement
Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রাপা প্লাজা( ৭ম তলা), রোড-২৭ (পুরাতন) ১৬ (নতুন), ধানমন্ডি, ঢাকা -১২০৯।
ফোন: ৪১০২১৯১৫-৬, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor$gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor$gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft