রবিবার ২৪ মে ২০২৬
বিশ্ব ঐতিহ্যে বাংলাদেশের মঙ্গল শোভাযাত্রা
প্রকাশ: শনিবার, ৬ এপ্রিল, ২০২৪, ৩:০৯ পিএম   (ভিজিট : ১৩৬৩)
পয়লা বৈশাখ বাংলা নববর্ষ। বাঙালির প্রাণের উৎসবের দিন। মঙ্গল শোভাযাত্রা প্রতিবছর বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনে আয়োজিত একটি তুলনামূলকভাবে নতুন বর্ষবরণ উৎসব। বিংশ শতাব্দীর শেষেভাগে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা শহরে মঙ্গল শোভাযাত্রার  প্রবর্তন হয়। একবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ উৎসব হিসেবে এটি সারাদেশে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের উদ্যোগে প্রতিবছর পয়লা বৈশাখে ঢাকা শহরের শাহবাগ, রমনা এলাকায় মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। এই শোভাযাত্রায় চারুকলা অনুষদের শিক্ষক শিক্ষার্থী ছাড়াও বিভিন্ন স্তরের বিভিন্ন বয়সের মানুষ অংশগ্রহণ করে। শোভাযাত্রায় বিভিন্ন ধরনের প্রতীকী শিল্পকর্ম বহন করা হয়। বাঙালি সংস্কৃতির পরিচয়বাহী বিভিন্ন উপকরণ, বিভিন্ন রঙের মুখোশ ও বিভিন্ন প্রাণির প্রতিকৃতি নিয়ে হাজার হাজার মানুষ জমায়েত হয় এই শোভাযাত্রায়। তবে একবিংশ শতকের দ্বিতীয় দশক থেকে প্রায় প্রতিটি জেলা সদরে এবং বেশকিছু উপজেলা সদরে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ আয়োজিত হওয়ায় ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ বাংলাদেশের নবতর সর্বজনীন সাংস্কৃতিক উৎসব হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে।

বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের আবেদন ক্রমে ২০১৬ খ্রিস্টাব্দের ৩০ নভেম্বর বাংলাদেশের ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ জাতিসংঘের শিক্ষা বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা ইউনেসকোর অধরা বা ইনট্যানজিবল সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান লাভ করে। ইথিওপিয়ার আদ্দিস আবাবা’য় অনুষ্ঠিত ইউনেসকোর এক আন্তর্জাতিক বৈঠকে বাংলাদেশের মঙ্গল শোভাযাত্রাকে বিশ্ব ঐতিহ্যের অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধিান্ত গৃহীত হয়; যা বাঙালিদের কাছে এক গৌরবের বিষয়।

প্রতি বছর বাংলা নববর্ষকে বরণ করে নিতে ঢাকার রমনা পার্কে ছায়ানট আয়োজিত প্রাদোষিক সঙ্গীতানুষ্ঠান এবং একে কেন্দ্র করে আয়োজিত অন্যান্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও মেলা মানুষকে নিবিড়ভাবে আকৃষ্ট করে থাকে এবং নাগরিক আবহে সার্বজনীন পয়লা বৈশাখ উদ্যাপনে নতুনমাত্রা যোগ হয়। ১৯৮০-এর দশকে স্বৈরচারী শাসনের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ঐক্য এবং একই সাথে শান্তির বিজয় ও অপশক্তির অবসান কামনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের উদ্যোগে ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে সর্বপ্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। সেই বছরই ঢাকা শহরের সর্বসাধারণের মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হয় এই আনন্দ শোভাযাত্রা। পয়লা বৈশাখ সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিক্ষক, শিক্ষার্থীগণ এই আনন্দ শোভাযাত্রা বের করার উদ্যোগ প্রতি বছর অব্যাহত রাখে।  শোভাযাত্রার অন্যতম আকর্ষণ বিশাল আকৃতির চারুকর্ম, যেমন-পুতুল, হাতি, কুমির, ঘোড়াসহ বিচিত্র মুখোশ ও সাজসজ্জাসহ বাদ্যযন্ত্র ও নৃত্য।

পয়লা বৈশাখ উদ্যাপন উপলক্ষে আনন্দ শোভাযাত্রা শুরু থেকেই জনপ্রিয়তা পেয়ে যায়। এর পরের বছরও একইভাবে চারুকলার সামনে থেকে আনন্দ শোভাযাত্রা বের করা হয়। তবে সংবাদপত্রের খবরাখবর থেকে জানা যায় যে, সে বছর চারুকলা অনুষদ বর্ণাঢ্য মিছিল বের করে। শুরু থেকে এই শোভাযাত্রার নাম ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ ছিল না। তখন এটি ছিল বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা। পত্রিকার খবর অনুযায়ী, ১৯৯৬ সাল থেকে নববর্ষের এই সম্মিলিত পদব্রজের অনুষ্ঠানটি মঙ্গল শোভাযাত্রা নামে অভিধা পেয়ে আসছে।

বর্ষবরণ উপলক্ষে আনন্দ শোভাযাত্রা চারুকলায় ১৯৮৯ সালে হলেও এর ইতিহাস আরো কয়েক বছরের পুরনো। ১৯৮৬ সালে চারুপাঠ নামের এক প্রতিষ্ঠান যশোরে প্রথমবারের মতো নববর্ষ উপলক্ষে আনন্দ শোভাযাত্রার আয়োজন করে। যশোরে সেই শোভাযাত্রায় ছিল পাপেট, বাঘের প্রতিকৃতি, পুরনো বাদ্যসহ আরো অনেক শিল্পকর্ম। প্রথম বছরেই অনুষ্ঠানটি যশোরে আলোড়ন সৃষ্টি করে। পরবর্তীতে যশোরের সেই শোভাযাত্রার আলোকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে শুরু হয় বর্ষবরণ আনন্দ শোভাযাত্রা।

১৯৮৯ সালের প্রথম আনন্দ শোভাযাত্রায় ছিল পাপেট, ঘোড়া, হাতি। ১৯৯০ সালের আনন্দ শোভা যাত্রায় আরো নানা ধরনের শিল্পকর্ম ও প্রতিকৃতি স্থান পায়। ১৯৯১ সালে চারুকলার শোভাযাত্রা জনপ্রিয়তায় নতুন মাত্রা লাভ করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের উদ্যোগে হওয়ায় এই আনন্দ শোভাযাত্রায় ভাইস চ্যান্সেলর, বিশিষ্ট লেখক, সাংবাদিক, শিক্ষক, শিক্ষার্থীসহ সর্বস্তরের মানুষ এতে অংশগ্রহণ করে। শোভাযাত্রায় স্থান পায় বিশালকায় হাতি, বাঘের প্রতিকৃতি কারুকর্ম। কৃত্রিম ঢাক আর অসংখ্য মুখোশখচিত প্ল্যাকার্ডসহ মিছিলটি নেচে গেয়ে উৎফুল্ল পরিবেশের সৃষ্টি করে। ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে আনন্দ শোভাযাত্রার সম্মুখে রং-বেরঙের পোশাক পরিহিত ছাত্র-ছাত্রীদের কাঁধে ছিল বিরাট আকারের এক কুমির। বাঁশ আর বহু বর্ণের কাপড় দিয়ে তৈরি করা হয়েছিল এই কুমিরটি। ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দে ‘১৪০০ সাল উদ্যাপন কমিটি’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের সামনে থেকে এক বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা বের করে। এই শোভাযাত্রার আকর্ষণ ছিল বাঘ, হাতি, ময়ূর, ঘোড়া ও বিভিন্ন ধরনের মুখোশ। চারুকলার সামনে থেকে শোভাযাত্রাটি শুরু হয়ে শাহবাগ মোড় ঘুরে হাইকোর্ট শিশু একাডেমি হয়ে আবার চারুকলায় ফিরে আসে।

বছরের শেষ কয়েকটা দিন মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রস্তুতির জন্য প্রচণ্ড ব্যস্ত থাকতে হয় ঢাকা বিশ্ববিধ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থীদের। প্রতি বছর শোভাযাত্রাটি আলাদা আলাদা স্লোগান বহন করে; যা দীর্ঘদিন ধরে ঠিক করে দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক সৈয়দ আজিজুল হক। মঙ্গল শোভাযাত্রার একটি বিশেষ দিক হচ্ছে, এ আয়োজনে কোনো বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সাহায্য নেওয়া হয় না। ব্যয়ভার সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাই বহন করে থাকেন। বিভিন্ন চিত্র ও শিল্পকর্ম বিক্রির টাকা থেকে এর ব্যয় বহন করা হয়। এটি একটি সুসমন্বিত উদ্যোগ। যার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নিজেদের সৃজনশীলতা প্রকাশের পাশাপাশি দেশপ্রেম এবং দেশের সংস্কৃতিকে ভালোবাসা ও হৃদয়ে লালন করার প্রেরণা লাভ করে।

বাংলাদেশের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ২০১৪ সালে ইউনেসকোর প্যারিস সদর দপ্তরে পয়লা বৈশাখের মঙ্গল শোভাযাত্রাকে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে ঘোষণা করার জন্য আবেদন জানায়। সেই আবেদনের প্রেক্ষিতে, ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর  বাংলাদেশের ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ জাতিসংঘের শিক্ষা বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা ইউনেসকোর অধরা বা ইনট্যানজিবল সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। এ জন্য বাঙালি জাতি হিসেবে আমরা গর্বিত।

মঙ্গল শোভাযাত্রা অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শান্তি, গণতন্ত্র ও বাঙালি জাতিসত্তার ঐক্যের প্রতীক হিসেবে পরিগণিত। ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে প্রতি বাংলা বছরের প্রথম দিনে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’র মাধ্যমে অপশক্তির অবসান এবং বাংলাদেশের মানুষের কল্যাণময় ভবিষ্যতের প্রত্যাশা ব্যক্ত করে চলেছে। ইতোপূর্বে ২০০৮ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের বাউল গান এবং ২০১৩ খ্রিস্টাব্দে জামদানি বয়ন শিল্প ইউনেসকোর অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্তি লাভ করে।

আজকালের খবর/আরইউ







আরও খবর


Loading...
Loading...
Follow Us
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : রাপা প্লাজা( ৭ম তলা), রোড-২৭ (পুরাতন) ১৬ (নতুন), ধানমন্ডি, ঢাকা -১২০৯।
ফোন: ৪১০২১৯১৫-৬, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮, ই-মেইল : বার্তা বিভাগ- newsajkalerkhobor@gmail.com বিজ্ঞাপন- addajkalerkhobor@gmail.com
কপিরাইট © আজকালের খবর সর্বসত্ত্ব সংরক্ষিত | Developed By: i2soft