ই-পেপার ফটোগ্যালারি আর্কাইভ  রোববার ● ১৬ মে ২০২১ ● ২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮
ই-পেপার  রোববার ● ১৬ মে ২০২১
শিরোনাম: শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসে ‘হাসিনা: এ ডটার’স টেল’       মহাকাশে সিনেমার শুটিং: প্রতিযোগিতা আমেরিকা-রাশিয়ার       গাজায় আল জাজিরা-এপির কার্যালয় ভবন গুঁড়িয়ে দিল ইসরায়েল       শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ২৩ মে খুলছে না       তিন দিনের রিমান্ডে জামায়াত নেতা শাহজাহান চৌধুরী       দুই মাসে সর্বনিম্ন শনাক্ত: মৃত্যু ২২        ঢাকামুখী জনস্রোতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে      
মিষ্টিমেয়ে কবরীকে সতীর্থদের কুর্ণিশ
আহমেদ তেপান্তর
Published : Saturday, 17 April, 2021 at 7:03 PM

কবরী

কবরী

বিষাদের বাতাস বইছে দেশের শোবিজ অঙ্গনে। চারদিকে মন খারাপের সুর। কিংবদন্তী অভিনেত্রী ও নির্মাতা সারাহ বেগম কবরীর চলে যাওয়ার খবর সবকিছুই যেন নিস্তব্ধ করে দিয়েছে।  প্রিয় মানুষকে ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় ছিলেন সবাই। কিন্তু যার চলে যাওয়ার সময় হয়, তাকে নাকি আঁকড়ে রাখা যায় না। রাখা গেল না কবরীকেও। মিষ্টি হাসির সেই মানুষটি নিলেন চিরবিদায়। এই চলে যাওয়ায় তাকে ঘিরে সতীর্থরা স্মৃতিচারণার ঝাঁপি মেলে দিলেন কুর্ণিশভরে-

ওর হাসি অভিনয়কে প্রাঞ্জল করেছেন: শবনম 
খুব বেশি মেশার সুযোগ হয়ে ওঠেনি। তবে যতটুকু পরখ করেছি তাতে কবরীর মাঝে বাঙালি নারীর অবয়ব চমৎকার ফুটে উঠেছে। এরসঙ্গে বাড়তি হচ্ছে ওর উচ্ছ্বাসভরা হাসি। মূলত এ কারণেই সকলের মধ্যমণি হয়ে থাকতে পারতেন। দর্শক ওকে গ্রহণ করলো তাদের প্রতিবেশী একজনভেবে। ওর  সাবলীল অভিনয় সমসাময়িকদের মাঝে অনুকরণীয়।

বাঙালি মধ্যবিত্তের প্রতিনিধি: নাদিম
আমরা দু’জনই সমসাময়িক। যদিও একসঙ্গে কাজ করা হয়নি। আলাদা ঘরানার সিনেমার কারণে। এমনও নয় খুব বেশি কথাবার্তা হয়েছে। ওনার যখন ব্যস্ততা শুরু আমি তখন পশ্চিম পাকিস্তানে চলে গেলাম। এরপর দু-একবার দেখা হলেও খুব বেশি কথা হয়নি। তবে ওনার সাবলীল অভিনয় দক্ষতা বাঙালির মধ্যবিত্ত পরিবাররের প্রতিভু। তখনকার আট থেকে আশি প্রায় সকল শ্রেণির দর্শক কবরীকে গ্রহণ করেছে এটা বিরাট ব্যাপার। তার আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি।

অভিনেত্রী কবরী সবাইকে প্রভাবিত করেছে: সোহেল রানা 
অভিনেতা হিসেবে মানুষের হৃদয়ের কাছে যেতে পারা, মানুষের ভালোবাসার পাত্র হতে পারাটাই কবরীর সবচেয়ে বড় অর্জন বলে মনে করেন কবরীর সমসাময়িক অভিনয় শিল্পী মাসুদ পারভেজ, যিনি সোহেল রানা হিসেবেই বেশি পরিচিত।
তার মতে, কবরী তার অভিনয় দিয়ে মানুষকে যতটা প্রভাবিত করতে পেরেছেন, তেমনটা আর কেউ পারেননি।

অভিনেত্রী কবরীকে মূল্যায়নের ধৃষ্টতা আমার নেই : আলমগীর
আলমগীর জানান, প্রায় ২৫টির মতো সিনেমায় একসঙ্গে অভিনয় করেছেন তারা। তাদের ‘লাভ ইন সিমলা’ সিনেমাটি প্রেমের সিনেমায় একটি মাইলস্টোন। আবেগী কণ্ঠে আলমগীর বলেন, ‘শবরী ম্যাডামের সঙ্গে আমার ৫০ বছরের স্মৃতি। কোনটা রেখে কোনটা বলবো! প্রতিদিনি ঝগড়া হতো দুই-তিন বার করে, আবার মিলেও যেতাম। এরকম একটা বন্ধুত্ব ছিল ওনার সঙ্গে। অত্যন্ত স্নেহ করতেন।’
শুটিংয়ের স্মৃতি জানিয়ে বলেন, “‘আমার জন্মভূমি’ সিনেমার শুটিংয়ের সময় আমাকে কোনো রুম দেয়া হয়নি। একটা বড় বারান্দা ছিল ওইটাতে খড় বিছিয়ে বিছানা করে ঘুমিয়েছিলাম। পরের দিন এটা উনি দেখলেন। দেখেই নিজে টাকা দিয়ে চকি, চাদর, বালিশ এনে ঘুমানোর ব্যবস্থা করে দিলেন। এগুলো অসাধারণ ব্যাপার। এমন স্মৃতি অনেক আছে।”

অভিনেত্রী সুজাতা লেখেন, ‘ভাবনার বাহিরে যা ঘটে আমরা তা মেনে নিতে পারি না! আকাশের উজ্জ্বল নক্ষত্রগুলো বুঝি এইভাবেই ঝরে যায়! এইসব নক্ষত্রগুলো বিশাল আকাশে আর জ্বলবে না, কোনও কালেই না! একসাথে কাজ করেছি, পথ চলেছি, জীবনের কত গল্পই না আছে আমাদের। ভালো থেক ওপারে। আমিন।’

গুণী অভিনেত্রী অঞ্জনা রহমান কবরীর সঙ্গে একটি ছবি পোস্ট করে ফেসবুকে লিখেন, আরেকটি নক্ষত্রের পতন। কবরী আপা নেই এটা মানতে পারছি না। ভাষা হারিয়ে ফেলেছি এতো বড় একটি শোক মেনে নেয়ার মতো না। বিনম্র শ্রদ্ধা সবসময় আপনার প্রতি। বাংলা চলচ্চিত্রের অন্যতম স্বর্ণ মুকুট হয়ে রয়ে যাবেন চিরজীবন।

বরেণ্য অভিনেত্রী সুবর্ণা মুস্তাফা লেখেন, ‘আপনার হাসি, আপনার অভিনয়, আপনার মিষ্টিমুখ সকল বয়সের মানুষকে মন্ত্রমুগ্ধ করেছে। রূপালি পর্দার সেরা অভিনেত্রী। আমি কীভাবে আপনাকে বিদায় জানাব! দমবন্ধ লাগছে! শান্তিতে থাকুন কবরী ফুপু।’

চঞ্চল চৌধুরী লেখেন, ‘কবরী আপা নেই। আমাদের স্বপের নায়িকা। কোন অনুষ্ঠানে প্রথম দেখা হয়েছিল মনে নেই। শেষ যে বার দেখা হয়েছিল তাঁর সাথে, আবদার করেছিলাম একটা ছবি তোলার। খুব স্পষ্ট মনে আছে, বলেছিলেন, চঞ্চল, আমি তোমার ‘মনপুরা’র ভক্ত। ভালো থাকবেন কবরী আপা। কয়েক দিন ধরেই আপনার সাথে তোলা ছবিগুলো খুঁজছিলাম। এখন পেলাম। যখন আপনি অনেক দুরে।’

অভিনেত্রী তারানা হালিম লেখেন, ‘বাংলা চলচ্চিত্রের বিখ্যাত অভিনেত্রী, নির্মাতা ও সাবেক এমপি সারাহ বেগম কবরী এর মৃত্যুতে-বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট এর পক্ষ থেকে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করছি। এদেশের চলচ্চিত্রে কবরী আপা এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। অভিনয়ের পাশাপাশি রাজনীতি ও সংস্কৃতি অঙ্গনে তার অবদান স্মরণীয় হয়ে থাকবে। মরহুমার আত্মার মাগফিরাত কামনা করে এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি।’

জয়া আহসান লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের চলচ্চিত্র যে খুব প্রশস্ত একটা রাজপথে উঠে গেছে, তা তো নয়। তবু আমরা যারা এর বন্ধুর পথ ধরে হাঁটছি, সেটি যাঁদের কষ্টে তৈরি হয়েছে কবরী তাদের একজন। কোত্থেকে এসে সারা দেশের চিত্ত জয় করেছিলেন নিমেষে।
পাকিস্তান আমলের উর্দু ছবির রাজত্বে তিনি আর রাজ্জাক বাংলা ছবিকে কী জনপ্রিয়ই না করে তুলেছিলেন। তার চরিত্রের মধ্যে বাঙালি মেয়ের সজল প্রতিচ্ছবি পেয়েছিলেন দর্শকেরা। কবরী আমাদের প্রথম যুগের বড় তারকা। আকাশে জ্বলজ্বল করবেন সব সময়।’

গণমাধ্যমকর্মীদের দৃষ্টিতে কবরী
সিনেমার পর্দায় বাংলাদেশি সাধারণ মেয়ে হিসেবে কবরীকে যেভাবে দেখা যেত, বাস্তবের গ্রামীণ নারী বা শহুরে মধ্যবিত্তের ঘরের মেয়ের চরিত্রটা ঠিক সেরকম ছিল। অভিনয় শিল্পী হিসেবে নিজস্ব স্বকীয়তা ও সহজাত প্রবৃত্তি কবরীকে অন্যদের চেয়ে আলাদা অবস্থান দিয়েছে বলে মনে করেন সত্তর আশির দশকের চলচ্চিত্র সাংবাদিক মাহমুদা চৌধুরী।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের পূর্ববর্তী সময়ে বা যুদ্ধ পরবর্তী উত্তাল সময়গুলোতে রাজ্জাক-কবরী জুটি তৎকালীন প্রেক্ষাপটে সমাজের সাধারণ মানুষের চিন্তাধারার প্রতিনিধিত্ব করতো এবং মানুষকে মানসিকভাবে স্বস্তি দিয়েছিল বলে এই জুটি মানুষের মধ্যে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে - এমন মনে করেন বাংলাদেশের একজন সিনেমা গবেষক অনুপম হায়াৎ।

কবরীর যত সিনেমা
১৯৬৪ সালে সুভাষ দত্তের পরিচালনায় ‘সুতরাং’ ছবির নায়িকা হিসেবে চলচ্চিত্রে পা রাখেন কবরী। তারপর আর তাকে ফিরে তাকাতে হয়নি। একের পর এক জনপ্রিয় সিনেমা উপহার দিয়ে দর্শকদের মনে শক্ত অবস্থান করে নিয়েছেন এই অভিনেত্রী। অভিনয় জীবনে নায়িকা হিসেবে কবরী শতাধিক সিনেমা করেছেন।

কবরী অভিনীত উল্লেখযোগ্য সিনেমাগুলো হলো- জলছবি (১৯৬৫), সাত ভাই চম্পা (১৯৬৫), বাহানা (১৯৬৮), আবির্ভাব (১৯৬৮), বাঁশরি (১৯৬৮), যে আগুনে পুড়ি (১৯৬৮), দ্বীপ নেভে নাই (১৯৭০), দর্প চূর্ণ (১৯৬৮), ক খ গ ঘ ঙ (১৯৬৮), বিনিময় (১৯৬৮), লালন ফকির (১৯৭৩) তিতাস একটি নদীর নাম (১৯৭৩), রংবাজ (১৯৭৩) মাসুদ রানা (১৯৭৪) সবিতা (১৯৭৪), সুজন সখী (১৯৭৫), সাধারণ মেয়ে (১৯৭৫), গুন্ডা (১৯৭৬) নীল আকাশের নিচে (১৯৭৬) ময়নামতি (১৯৭৬) আগন্তুক (১৯৭৬), আঁকাবাঁকা (১৯৭৬), কত যে মিনতি (১৯৭৬), অধিকার (১৯৭৬), স্মৃতিটুকু থাক (১৯৭৬), সারেং বৌ (১৯৭৮), বধূ বিদায় (১৯৭৮), আরাধনা (১৯৭৯), বেইমান (১৯৭৯), অবাক পৃথিবী (১৯৭৯), কাঁচ কাঁটা হীরা (১৯৭৯), উপহার (১৯৭৯),  আমাদের সন্তান (১৯৭৯), মতিমহল (১৯৭৯), পারুলের সংসার (১৯৭৯), অরুণ বরুণ কিরণমালা (১৯৭৯), হীরামন (১৯৭৯), দেবদাস (১৯৭৯),আমার জন্মভূমি (১৯৭৯) এবং দুই জীবন (১৯৮৭)।

এর মধ্যে ১৯৭৩ সালে বিশ্বখ্যাত পরিচালক ঋত্বিক ঘটক পরিচালিত ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ ছবিতে অভিনয় করেন বেশ আলোচিত হন। এছাড়া নায়ক রাজ্জাকের সঙ্গে ‘রংবাজ’ বেশ জনপ্রিয়তা পায়। ১৯৭৫ সালে নায়ক ফারুকের সঙ্গে ‘সুজন সখী’ ছাড়িয়ে যায় আগের সব জনপ্রিয়তাকে। এরপর কেবলই এগিয়ে চলা সামনের দিকে। তার অন্যান্য জনপ্রিয় ছবিগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘আগন্তুক’, ‘নীল আকাশের নিচে’, ‘ময়নামতি’, ‘সারেং বৌ’, ‘দেবদাস’, ‘হীরামন’, ‘চোরাবালি’, ‘পারুলের সংসার’। ৫০ বছরের বেশি সময় চলচ্চিত্রে রাজ্জাক, ফারুক, সোহেল রানা, উজ্জ্বল, জাফর ইকবাল ও বুলবুল আহমেদের মতো অভিনেতাদের সঙ্গে কাজ করেছেন তিনি। ঢাকার চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম জনপ্রিয় জুটি ছিলেন রাজ্জাক-কবরী।
অভিনয়ের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, জাতীয় চলচ্চিত্র আজীবন পুরস্কার, পাঁচবার বাচসাস পুরস্কার, আজীবন বাচসাস পুরস্কার পেয়েছেন। 

পরিচালক পরিচয়ে কবরী
অভিনেত্রী কবরী পরিচালনায় নাম লিখিয়েছিলেন ২০০৮ সালে।নির্মাণ করেছিলেন ‘আয়না’ নামের সিনেমা। এরপর সর্বশেষ হাত দিয়েছিলেন আরও একটি সিনেমার কাজে। সরকারি অনুদানের এই সিনেমার নাম ‘এই তুমি সেই তুমি’।
ছবির বেশ কিছু অংশের শুটিং শেষ করেছিলেন। সাবিনা ইয়াসমিনকে দিয়ে তৈরি করিয়েছিলেন গানও। কিন্তু সেই সিনেমা অসম্পূর্ণ রেখেই চিরবিদায় নিলেন কবরী। অসম্পূর্ণ থেকে গেল কিংবদন্তি অভিনেত্রীর অনেক স্বপ্নও।

আজকালের খবর/আতে


সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : হাউস নং ৩৯ (৫ম তলা), রোড নং ১৭/এ, ব্লক: ই, বনানী, ঢাকা-১২১৩।
ফোন: +৮৮-০২-৪৮৮১১৮৩১-৪, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮
ই-মেইল : বার্তা- [email protected] বিজ্ঞাপন- [email protected]
দৈনিক আজকালের খবর লিমিটেডের পক্ষে গোলাম মোস্তফা কর্তৃক বাড়ি নং-৫৯, রোড নং-২৭, ব্লক-কে, বনানী, ঢাকা-১২১৩ থেকে প্রকাশিত ও সোনালী প্রিন্টিং প্রেস, ১৬৭ ইনার সার্কুলার রোড (২/১/এ আরামবাগ), ইডেন কমপ্লেক্স, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক আজকালের খবর
Web : www.ajkalerkhobor.com, www.eajkalerkhobor.com