ই-পেপার ফটোগ্যালারি আর্কাইভ  রোববার ● ১৬ মে ২০২১ ● ২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮
ই-পেপার  রোববার ● ১৬ মে ২০২১
শিরোনাম: শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসে ‘হাসিনা: এ ডটার’স টেল’       মহাকাশে সিনেমার শুটিং: প্রতিযোগিতা আমেরিকা-রাশিয়ার       গাজায় আল জাজিরা-এপির কার্যালয় ভবন গুঁড়িয়ে দিল ইসরায়েল       শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ২৩ মে খুলছে না       তিন দিনের রিমান্ডে জামায়াত নেতা শাহজাহান চৌধুরী       দুই মাসে সর্বনিম্ন শনাক্ত: মৃত্যু ২২        ঢাকামুখী জনস্রোতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে      
মোটরসাইকেলে জীবনের গতি ঢাবি শিক্ষার্থী আবদুর রহমানের
নূরুজ্জামান মামুন
Published : Saturday, 17 April, 2021 at 4:57 PM

মোটর সাইকেলের চার পাশে শপিং ব্যাগ ঝুলানো। বাইকের পিছনে বিশাল একটি বড় ব্যাগ রশি দিয়ে বাঁধা। ব্যাগের সঙ্গেও ঝুলছে অসংখ্য শপিং ব্যাগ। আর মোটর সাইকেলের চালকের আসনে হেলমেট পরে বসে আসেন আছেন এক যুবক। গত সোমবার সচিবালয়ের গেটে হঠাৎ মোটরসাইকেলটি থামতেই অনেকের দৃষ্টি কাড়ে। উৎসুক পথচারী বাইকটি ঘিরে ধরেন। কাছে গিয়ে জানতে চাইলে বাইক চালক নিজের পরিচয় দিয়ে বলেন, আমার নাম মো. আব্দুর রহমান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের অধীনে ইংলিশ ল্যাংগুয়েজের অনার্স তৃতীয় বর্ষের ছাত্র।

কথা প্রসঙ্গে রহমান বলেন, কৃষক বাবার পক্ষে আমার পড়াশুনার খরচ চালানো দুষ্কর। করোনার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করা হলেও নিয়মিত অ্যাসাইমেন্ট দিচ্ছে। আবাসিক হল বন্ধ থাকায় ধানমন্ডির-১৫ নম্বরের একটি ছাত্রাবাসে উঠেছি। খরচ আরো বেড়ে গেছে। টাকার জন্য আগে পড়াশুনার ফাঁকে পাঠাও-উবারের মাধ্যমে রাইড শেয়ারিং করতাম। বর্তমানে রাইড শেয়ারিং বন্ধ থাকায় খরচ চালাতে চার দিন আগে পণ্য ডেলিভারির কাজ করছি। যশোরের কেশবপুরের কৃষক পরিবারে জন্ম রহমানের। দুই ভাই-বোনের মধ্যে সবার বড় তিনি। রহমান জানান, এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরে তার কৃষক বাবার পক্ষে লেখাপড়ার খরচ চালানো কঠিন হয়ে পরে। নিয়মিত খরচের টাকা পাঠাতে না পারায় লেখাপড়া বিঘ্নিত হয়। এক পর্যায়ে হতাশ হয়ে পড়েন তিনি। হতাশার মধ্যেই আব্দুর রহমান খুঁজে পান নিজের আয়ে লেখাপড়ার খরচ চালিয়ে নেওয়ার পথ।

জানতে চাইলে আব্দুর রহমান বলেন, হঠাৎ ভাবনায় এলো ঢাকা শহরে বাইক আয়ের একটি বড় মাধ্যম। কষ্ট করে একটি বাইক কিনে পাঠাও-উবারের মাধ্যমে দিনে দুই-তিনটি রাইড শেয়ার করলে দুই থেকে তিনশত টাকা আয় করা সম্ভব। ক্লাসের ফাঁকে কাজটি করতে তেমন কষ্ট হবে না বাবাকে বুঝিয়ে বলি। অনেক কষ্ট করে ২০১৯ সালের অক্টোবর মাসে বাইক কিনে দেন বাবা। বাইক কেনার পর থেকে বাড়ি থেকে আর টাকা আনতে হয়নি। নিজের খরচ চালিয়ে বাড়িতেও টাকা পাঠাই। এভাবেই বাইক কিনে আয়ের উৎস বের করেন রহমান।

রহমান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে থাকার সময়ে টাকার প্রয়োজন দিনে দু-তিনটি রাইড শেয়ার করতাম। আগে ইচ্ছেমতো কাজ করতাম। এখন সেটা সম্ভব হচ্ছে না। অফিসে সকাল ৯টার মধ্যে যেতে হয়। কল সেন্টার থেকে পার্শেল বুঝে নিতে হয়। আমাদের বেশিরভাগ প্রোডাক্ট ক্যাশ অন ডেলিভারি। টাকা পয়সার সব হিসাব বুঝিয়ে দিয়ে মেসে যেতে রাত হয়ে যায়। পণ্য ডেলিভারির কাজে কীভাবে যুক্ত হলেন জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই মেধাবী ছাত্র বলেন, বিক্রয় ডটকমে বিজ্ঞাপন দেখে আবেদন করি। ইন্টারভিউ দিলে নলেজ প্রোডাক্টস অ্যান্ড অনলাইন শপিং সেন্টার আমাকে কাজ দেয়।  
প্রতিদিন কত টাকা আয় হয় জানতে চাইলে রহমান বলেন, প্রতি পার্সেল ডেলিভারিতে ৮০টাকা দেয়। ১০ টাকা করে প্রভিডেন্ট ফান্ডের জন্য কেটে রাখে। প্রতিদিন ১৫-২০টি পার্সেল ডেলিভারি দিতে পারি। গড়ে দিনে এক হাজার টাকার বেশি আয় হয়। অফিস প্রতিদিনের কাজের টাকা প্রতিদিন দিয়ে দেয়।

ডেলিভারির কাজ করতে গিয়ে পড়াশুনা বিঘ্নিত হয় না দাবি করে রহমান বলেন, আমি বেশি সময় বাইরে কাটাই না। ডিপার্টমেন্টের চাপ আছে। ক্লাসে উপস্থিতির ক্ষেত্রে অনেক কড়াকড়ি। নিয়মিত উপস্থি না হলে পরীক্ষায় অংশ নিতে দেয় না। করোনার মধ্যেও আমাদের অ্যাসাইনমেন্ট দেয়। অফিসের কাজ শেষ করে রুমে ফিরে ফ্রেস হয়ে একটু ঘুমাই। তারপর উঠে পড়তে বসি। রাত ২-৩টা পর্যন্ত পড়াশুনা করি। 

করোনা কারনে বিশ্ববিদ্যালয়ের হল বন্ধ থাকায় বর্তমানে ধানমন্ডির-১৫ নম্বরে একটি মেসে থাকেন রহমান। বাসা ভাড়া তিন হাজার, বাইক পার্কিংয়ের জন্য ৫০০, খাওয়াসহ সব মিলিয়ে ছয় থেকে সাত হাজার টাকা খরচ হয়। সবই নিজের আয় থেকে খরচ করেন। কোন ধরনের নেশা তো দূরের কথা চা-ও পান করেন না রহমান। সব খরচ মিটিয়ে ভালোভাবে চলছে তার জীবন। প্রতি মাসে বাড়িতেও তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা পাঠান।

রহমান বলেন, টাকার দিকে ঝোক এসে গেলে পড়াশুনা ক্ষতি হবে। সাময়িক নিজে বাঁচার জন্য এ কাজ করি। আমার স্বপ্ন বিসিএস কর্মকর্তা হওয়া। জনগণের সেবা করা। 
রহমান বলেন, আগে রকমারি ডট কমের কল সেন্টারে সন্ধা ৬টা থেকে রাত ১০ পর্যন্ত কাজ করতাম। সেখানে তেমন টাকা পেতাম না। এই সময় সবাই বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে কাটায়। আর আমি চার ঘণ্টা কাজ করে ছয় হাজার টাকা পেতাম। ১০টার সময় কাজ শেষ করে ফ্রেস হয়ে পড়তে বসতাম। তখন আমার বাইক ছিল না।

ডেলিভারির কাজকে বেশ উপভোগ করছেন রহমান। তিনি বলেন, কোনো কাজকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। ঢাকা শহরে এ ধরনের কাজ অনেকে করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে মোটরসাইকেলে মানুষ টানি, পণ্য ডেলিভারির কাজ করি- এ নিয়ে একটুও ভাবি না। বরং ৬০ বছরের বেশি বয়স্ক বাবাকে কষ্ট না দিয়ে নিজের আয়ে চলি। পরিবারকে সহযোগিতা করি। পড়ালেখাও করছি।

তিনি আরো বলেন, ঢাকা শহরে একটা বাইক থাকলে নিজের পড়াশুনার খরচ নিজে চালানো সম্ভব। কাউকে না ঠকিয় সৎভাবে জীবন-যাপন করা সম্ভব। বাইড শেয়ারিং আসলে বেশি কষ্ট না। যদি কেউ হল থেকে বের হয়ে ট্রিপ নিয়ে গাবতলী যায় দেড়শত টাকা আয় করতে পারবে। গাবতলী থেকে নিউমার্কেট আসলে দেড়শত টাকা না হলেও ১০০ টাকা আয় হবে। দুটি ট্রিপ দিতে দুই ঘণ্টার বেশি লাগবে না। ৫০ টাকার তেল খরচ করে এই সময়ে কম হলেও ২৫০ টাকা আয় হবে। একজন ছাত্রের জন্য প্রতিদিন ২০০ টাকা হারে মাসে ছয় হাজার টাকার বেশি দরকার হয় না।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিষয়ে রহমান বলেন, আমি বিসিএস দেবো। এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছি। কাজ শেষে বাসায় গিয়ে ঘুমাই। ঘুম থেকে উঠে ক্লাসের পড়া শেষে বিসিএসসের জন্য অল্প অল্প করে পড়ি।

আজকালের খবর/এএসএস



সর্বশেষ সংবাদ
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি : গোলাম মোস্তফা || সম্পাদক : ফারুক আহমেদ তালুকদার
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয় : হাউস নং ৩৯ (৫ম তলা), রোড নং ১৭/এ, ব্লক: ই, বনানী, ঢাকা-১২১৩।
ফোন: +৮৮-০২-৪৮৮১১৮৩১-৪, বিজ্ঞাপন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৯, সার্কুলেশন : ০১৭০৯৯৯৭৪৯৮
ই-মেইল : বার্তা- [email protected] বিজ্ঞাপন- [email protected]
দৈনিক আজকালের খবর লিমিটেডের পক্ষে গোলাম মোস্তফা কর্তৃক বাড়ি নং-৫৯, রোড নং-২৭, ব্লক-কে, বনানী, ঢাকা-১২১৩ থেকে প্রকাশিত ও সোনালী প্রিন্টিং প্রেস, ১৬৭ ইনার সার্কুলার রোড (২/১/এ আরামবাগ), ইডেন কমপ্লেক্স, মতিঝিল, ঢাকা-১০০০ থেকে মুদ্রিত।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত দৈনিক আজকালের খবর
Web : www.ajkalerkhobor.com, www.eajkalerkhobor.com